ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

একের পর এক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় তৎপর সরকার

এম. আব্দুল্লাহ আল মামুন খান
প্রকাশিত: মে ১১, ২০২৬, ০৮:১৫ পিএম
বাংলাদেশ সরকারের লোগো। ছবি- সংগৃহীত

শুরুতেই স্বস্তিদায়ক কোনো অর্থনীতি পায়নি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার। উল্টো সাবেক প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকার রেখে গেছে অর্থনীতির বহুমুখী চ্যালেঞ্জ। গণঅভ্যুত্থানে পতন হওয়া সরকার ও অন্তর্বর্তী সরকারের ঋণের ভারে ন্যুব্জ প্রায় তিন মাস বয়সি নতুন সরকার। এরই মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত অর্থনীতিতে জন্ম দেয় অনিশ্চয়তার। বিঘ্নিত হয় বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের সরবরাহ। বিশ্বের সব দেশ জ্বালানি তেলের দাম বাড়ালেও সাধারণের ভোগান্তির কথা চিন্তা করে অনেক দেরিতে দাম বাড়িয়ে সংকটের সমাধান করা হয়। গত এপ্রিলে মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের ঘর ছাড়িয়ে যায়। জীবনযাত্রার খরচ বেড়ে যাওয়ায় সীমিত ও মধ্য আয়ের মানুষের কষ্ট বেড়েছে। নতুন সরকারের একজন প্রধানমন্ত্রীর জন্য এসব যেন বড় ধরনের পরীক্ষা।

চরম সংকটেও ধীরস্থির, শান্ত, কোমল-কঠোর এক তারেক রহমানকে দেখেছে দেশের মানুষ। দুর্নীতির বিরুদ্ধে শূন্য সহিষ্ণুতার নীতি গ্রহণ করেছেন। শুরু থেকেই উৎপাদন বৃদ্ধি থেকে শুরু করে নতুন নতুন কর্মসংস্থান তৈরি, রাজস্ব বৃদ্ধি ও বিনিয়োগ বাড়ানোর মাধ্যমে খাদে পড়া অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করতে উদ্যোগ নিয়েছেন। বিপুল প্রত্যাশা মাথায় নিয়ে অর্থনীতির বন্ধুর পথ পাড়ি দিচ্ছেন। রাষ্ট্র মেরামতে পূর্ণোদ্যমে কাজ করছেন। দিন-রাত ১৬ ঘণ্টা কঠোর পরিশ্রম করছেন। সামগ্রিক পরিস্থিতি মোকাবিলায় দ্রুত, সমন্বিত ও বহুমাত্রিক কৌশল বা পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন। শিল্পোদ্যোক্তাদের সঙ্গে কয়েক দফা বৈঠক করেছেন, যার মাধ্যমে কৃষি থেকে শিল্প, জ্বালানি ও প্রযুক্তি—সব বিষয়েই সমন্বিত অগ্রগতির রূপরেখা মিলেছে। রপ্তানি আয় স্থিতিশীল রেখে নিয়ন্ত্রণে রেখেছেন আমদানি ব্যয়। অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে গোটা দেশবাসী প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ওপর আস্থা রেখেছেন। সবার বিশ্বাস তার ম্যাজিক নেতৃত্বেই বিপর্যস্ত অর্থনীতিতে নতুন গতির সঞ্চার হবে। ২০৩৪ সালের মধ্যে তিনি বাংলাদেশকে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে উন্নীত করার লক্ষ্যে পৌঁছতে সক্ষম হবেন।

সাধারণ মানুষের প্রত্যাশার মধ্যেই আশার খবর দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। শুক্রবার (৮ মে) বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান জানিয়েছেন, দেশে বৈদেশিক মুদ্রার মোট রিজার্ভ বেড়ে এখন ৩৫ দশমিক ৬১ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে দাঁড়িয়েছে। এই রিজার্ভের মধ্যে বৈদেশিক মুদ্রায় গঠিত বিভিন্ন তহবিলও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) হিসাব পদ্ধতি বিপিএম-৬ অনুযায়ী প্রকৃত ব্যবহারযোগ্য রিজার্ভের পরিমাণ ৩০ দশমিক ৯৬ বিলিয়ন ডলার। প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্সে জোরালো উল্লম্ফনেই মূলত দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বেড়েছে। ব্যাংকিং চ্যানেলে রেমিট্যান্স পাঠানোর প্রবণতা বাড়ায় আগের বছরের তুলনায় যা ১৩.৬ শতাংশ বেশি। দেশীয় মুদ্রায় প্রবাসী আয় প্রায় ৩৮ হাজার ৩৮৪ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। ব্যাংক খাত ও ডলারের বাজারও ক্রমশ স্থিতিশীল হয়ে ওঠেছে। বিশেষ করে ডলারের বাজার মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।

চলতি বছরের ১২ ফেব্রুয়ারির ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠনের পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দেশের অর্থনীতিতে আস্থা ফেরাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে চলেছেন। ভঙ্গুর অর্থনীতিকে ঘুরে দাঁড় করাতে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বিদেশি বিনিয়োগকারী, বাণিজ্য অংশীদার ও উন্নয়ন সহযোগীদের বাংলাদেশ প্রসঙ্গে আগ্রহ বাড়াচ্ছে। পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সহযোগিতা ও আস্থার ভিত্তিতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করতেও তার সরকার দৃঢ় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। ঝানু কূটনীতিকের মতোই বেশ সতর্কতার সঙ্গেই বন্ধুপ্রতীম দেশগুলোর সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক রক্ষা করে ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতি দক্ষতার সঙ্গে সামাল দিয়েছেন। ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতিকে ঊর্ধ্বে তুলে ধরেছেন। দেশ পরিচালনায় সরকারপ্রধান নিজের নেতৃত্বে নতুন দর্শনকে প্রতিফলিত করেছেন। একের পর এক ইতিবাচক ও ব্যতিক্রমী পদক্ষেপের মাধ্যমে প্রশাসন ও রাজনীতিতে এক নতুন সংস্কৃতির সূচনা করেছেন। বিশ্লেষকরাও বলছেন, নতুন বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক পথযাত্রায় পাহাড়সম সব চ্যালেঞ্জের মধ্যেও শক্ত হাতে দেশের হাল ধরেছেন তারেক রহমান। তার শুরুটা অবশ্যই ভালো হয়েছে, যা সুন্দর আগামীর পথনকশা প্রস্তুত করবে।

একটি আধুনিক বাংলাদেশ বিনির্মাণে জনমুখী নির্বাচনি ইশতেহারের মাধ্যমে ভোটারদের মন জয় করেছিল বিএনপি। কথার সঙ্গে মিল রেখে নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি মোতাবেক ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, খাল খনন কর্মসূচির বাস্তবায়ন শুরু করেছেন। সচিবালয়ে নিয়মিত অফিস করার পাশাপাশি দিন-রাত একাকার করে সারা দেশ চষে বেড়াচ্ছেন। প্রায় ১২ লাখ ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকের ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত ঋণ সুদসহ মওকুফ করেছেন। প্রথম দু’মাসেই ৬০টি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ বাস্তবায়ন করেছেন। এসব মহৎ কর্মযজ্ঞ বাস্তবায়নের মাধ্যমে আগামী অর্থবছরের মধ্যে প্রায় ১ কোটি ২০ লাখ মানুষকে সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতায় আনার সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা গ্রহণ করেছেন। সরকার শক্তিশালী করতে চায় এই সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী। দরিদ্র ও অসহায় জনগোষ্ঠীকে নগদ অর্থ দেওয়ার বিভিন্ন কর্মসূচির আওতায়, উপকারভোগীদের সংখ্যা বাড়ানো হচ্ছে। বাড়বে ভাতার পরিমাণও।

বর্তমান সরকারের এসব উদ্যোগ প্রশংসা কুড়াচ্ছে। শুধু তাই নয়, এবার প্রথমবারের মতো তিন লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাচ্ছে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) আকার। আগামী অর্থবছরে এডিপির আকার দাঁড়াচ্ছে ৩ লাখ ৮ হাজার ৯২৫ কোটি টাকা। চলমান এডিপির চেয়ে আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের আকার বাড়ছে এক লাখ কোটি টাকা। শনিবার (৯ মে) অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে পরিকল্পনা কমিশনের এক বর্ধিত সভায় এডিপি প্রস্তাবের প্রাথমিক অনুমোদন দিয়েছে পরিকল্পনা কমিশন।

‘সবার আগে বাংলাদেশ’ স্লোগানকে ধারণ করে শনিবার (৯ মে) রাজধানীর ফার্মগেটে কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন বাংলাদেশ (কেআইবি) মিলনায়তনে বিএনপি, যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল ও ছাত্রদলের সঙ্গে এক মতবিনিময় সভায় ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে জনগণকে দেওয়া নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে ‘নতুন সংগ্রামে’ নামার বার্তা দিয়েছেন বিএনপি চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সরকারপ্রধান নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের পাশাপাশি প্রশাসনিক গতিশীলতা ফেরানোর অপূর্ব সমন্বয় ঘটানোর মাধ্যমে দল ও সরকারকে একে অন্যের পরিপূরক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চান।

এজন্যই তিনি তৃণমূল নেতাদের সঙ্গে বসেছেন, মতবিনিময় সভা করেছেন। তার মূল লক্ষ্য কেবল ক্ষমতায় থাকা নয় দেশের মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন ঘটানো। এজন্য নির্বাচনি ইশতেহারের পূর্ণ বাস্তবায়ন এবং সরকারি সেবা জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়ার দৃঢ় অঙ্গীকার করেছেন। তিনি নতুন এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় দলীয় নেতাকর্মীদের সর্বাত্মক সহযোগিতা চেয়ে বলেছেন, ‘দলের সমর্থন ও সমন্বয় ছাড়া সরকার সফল হতে পারবে না। তাই নির্বাচনের আগে জনগণের কাছে করা সব প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের জন্য আমাদের ‘নতুন সংগ্রামে’ নামতে হবে।’

লেখক : পেশাদার গণমাধ্যমকর্মী ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক