ধর্মীয় রাজনীতির উত্থান এখন শুধু ভারত বা বাংলাদেশের আলাদা কোনো ঘটনা নয়; এটি পুরো দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক বাস্তবতাকে বদলে দিচ্ছে। ভারতের পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির ক্ষমতায় আসা এবং বাংলাদেশে ইসলামপন্থি রাজনীতির শক্তিশালী হয়ে ওঠার পর একটি প্রশ্ন ক্রমশ বেশি শোনা যাচ্ছে- ‘জামায়াতে ইসলামী কি বাংলাদেশের বিজেপি?’
আপাতদৃষ্টিতে তুলনাটা খুব অস্বাভাবিক মনে হয় না। দুই দলই ধর্মীয় পরিচয়কে রাজনৈতিক শক্তিতে রূপ দেয়। দুই দলই সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠীর আবেগকে ব্যবহার করে রাজনৈতিক বৈধতা তৈরি করতে চায়। আবার দুই দলকেই অভিযুক্ত করা হয় গণতান্ত্রিক কাঠামোর ভেতরে থেকেও ডানপন্থায় প্রবর বিশ্বাসী।
কিন্তু এই তুলনা যতটা সহজ মনে হয়, বাস্তবে বিষয়টা ততটা সরল নয়। কারণ বিজেপি এবং জামায়াত- দুটোই ধর্মভিত্তিক রাজনীতি করলেও তাদের আদর্শিক প্রকৃতি, রাষ্ট্রচিন্তা এবং সামাজিক লক্ষ্য এক নয়।
ধর্মীয় জাতীয়তাবাদ বনাম ধর্মীয় সমাজ পুনর্গঠন
বিজেপির রাজনীতি মূলত হিন্দু জাতীয়তাবাদের ওপর দাঁড়িয়ে। কিন্তু হিন্দুধর্ম নিজেই ঐতিহাসিকভাবে একটি বহুত্ববাদী এবং বিকেন্দ্রীভূত ধর্মীয় ঐতিহ্য। এখানে ইসলামের শরিয়াহর মতো একক আইন নেই, একক ধর্মীয় কর্তৃত্ব নেই, এমনকি একক সামাজিক রূপরেখাও নেই।
ফলে বিজেপির রাজনীতি যতই আক্রমণাত্মক হোক, ভারতের সমাজ পুরোপুরি একরৈখিক হয়ে যায়নি। বলিউড, বাজার অর্থনীতি, ফ্যাশন, শিল্প-সাহিত্য কিংবা নারীর কর্মক্ষেত্রে অংশগ্রহণ- এসব এখনো বহাল আছে। বিজেপির রাজনীতি অনেকাংশে বর্জনমূলক, কিন্তু সমাজের প্রতিটি স্তরকে একক ধর্মীয় নিয়মে পুনর্গঠন করার চেষ্টা এখনো করেনি তবে চেষ্টা চলছে।
অন্যদিকে ইসলামপন্থি রাজনীতির একটি বড় অংশের লক্ষ্যই হলো- সমাজকে একটি একক নৈতিক ও ধর্মীয় কাঠামোর অধীনে নিয়ে আসা। এখানে ধর্ম শুধু ব্যক্তিগত বিশ্বাস নয়; রাষ্ট্র, আইন, সংস্কৃতি, শিক্ষা এবং সামাজিক আচরণের ভিত্তি হিসেবেও কাজ করতে চায়।
এই কারণেই ইরান, আফগানিস্তান বা তালেবান শাসনের উদাহরণে দেখা যায়- রাজনৈতিক ইসলাম যখন পূর্ণ রাষ্ট্রক্ষমতা পায়, তখন পরিবর্তন শুধু সরকারে সীমাবদ্ধ থাকে না; পুরো সমাজকেই পুনর্গঠন করার চেষ্টা শুরু হয়।
বাংলাদেশের জন্য ঝুঁকি কেন আলাদা?
ভারত এবং বাংলাদেশের অর্থনৈতিক বাস্তবতাও এক নয়। ভারত একটি বিশাল অর্থনীতি এবং বৈশ্বিক বাজারে তার অবস্থান তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী। তাই রাজনৈতিক উত্তেজনা বা ধর্মীয় মেরুকরণ সত্ত্বেও ভারতের অর্থনৈতিক কাঠামো পুরোপুরি ভেঙে পড়ে না।
কিন্তু বাংলাদেশের অর্থনীতি অনেক বেশি সংবেদনশীল। দেশের রপ্তানি-নির্ভর অর্থনীতি, বিশেষ করে গার্মেন্টস শিল্প, মূলত নারীর ব্যাপক শ্রম অংশগ্রহণ এবং আন্তর্জাতিক বাজারের ওপর নির্ভরশীল।
যদি কোনো রাজনৈতিক প্রকল্প নারীর চলাফেরা, কর্মক্ষেত্রে উপস্থিতি বা সামাজিক দৃশ্যমানতাকে সীমাবদ্ধ করতে চায়, তাহলে সেটি শুধু সামাজিক সমস্যা হবে না; সেটি সরাসরি অর্থনৈতিক সংকটে রূপ নিতে পারে।
বাংলাদেশের জন্য এ কারণেই ধর্মীয় কট্টরপন্থার প্রভাব শুধু সাংস্কৃতিক নয়, অর্থনৈতিকভাবেও অনেক বেশি গভীর হতে পারে।
বিভক্ত বাংলার রাজনীতি
দুই বাংলার ধর্মীয় রাজনীতির শিকড় নতুন নয়। ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ থেকে শুরু করে ১৯৪৭ সালের দেশভাগ পর্যন্ত, বাংলার ইতিহাসে ধর্মীয় বিভাজন বারবার রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে।
ব্রিটিশদের ‘ডিভাইড অ্যান্ড রুল’ নীতি হিন্দু ও মুসলমানের মধ্যে রাজনৈতিক দূরত্ব বাড়িয়েছিল। পরে সেই বিভাজন দেশভাগের মাধ্যমে স্থায়ী রূপ পায়।
তবে একইসঙ্গে বাংলার আরেকটি ঐতিহ্যও ছিল- যেখানে ‘বাঙালি’ পরিচয় ধর্মীয় পরিচয়ের চেয়ে বড় ছিল। লালন, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং কাজী নজরুল ইসলামের মতো চিন্তাবিদরা ধর্মীয় সম্প্রীতি এবং মানবিক পরিচয়কে গুরুত্ব দিয়েছিলেন।
আজকের রাজনৈতিক বাস্তবতায় সেই ‘অংশীদারত্বমূলক বাঙালি পরিচয়’ ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়ছে।
পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশের সাম্প্রতিক পরিবর্তন
পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির উত্থান অনেক বিশ্লেষকের মতে শুধু হিন্দুত্বের বিজয় নয়; বরং দীর্ঘদিনের তৃণমূলবিরোধী ক্ষোভেরও বহিঃপ্রকাশ। কিন্তু ক্ষমতায় আসার পর বিজেপি ধীরে ধীরে পশ্চিমবঙ্গেও ধর্মীয় পরিচয়ভিত্তিক রাজনীতিকে শক্তিশালী করার চেষ্টা করছে।
অন্যদিকে বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে মূলধারার রাজনৈতিক দলগুলোও ধর্মকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করেছে। মাদ্রাসা সম্প্রসারণ, ধর্মীয় তোষণ, পাঠ্যপুস্তকে পরিবর্তন কিংবা ইসলামপন্থিদের সঙ্গে সমঝোতা- এসবের মাধ্যমে রাজনৈতিক শক্তিগুলো স্বল্পমেয়াদি সুবিধা নিতে চেয়েছে।
কিন্তু সমালোচকদের মতে, এই তোষণ নীতিই শেষ পর্যন্ত কট্টরপন্থি রাজনীতিকে আরও শক্তিশালী করেছে।
তাহলে ‘জামায়াত বাংলাদেশের বিজেপি’ বলা কতটা সঠিক?
এই তুলনা পুরোপুরি ভুল নয়, কারণ দুই দলই ধর্মীয় পরিচয়কে রাজনৈতিক শক্তিতে রূপ দেয়। কিন্তু তাদের চূড়ান্ত রাজনৈতিক লক্ষ্য এবং রাষ্ট্রচিন্তা একই নয়।
বিজেপির প্রকল্প মূলত একটি সংখ্যাগরিষ্ঠতাবাদী জাতীয়তাবাদী রাষ্ট্র নির্মাণের দিকে ঝোঁকে। অন্যদিকে জামায়াতের আদর্শিক ভিত্তি সমাজকে ধর্মীয় নৈতিকতার ভিত্তিতে পুনর্গঠনের ধারণার সঙ্গে যুক্ত।
অর্থাৎ একদিকে আছে বর্জনমূলক জাতীয়তাবাদ, অন্যদিকে আছে সমাজব্যাপী নৈতিক পুনর্গঠনের রাজনৈতিক প্রকল্প।
এই পার্থক্য না বুঝলে দুই বাস্তবতাকে এক করে ফেলার ঝুঁকি তৈরি হয়।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন