× UCB Sticker Card
বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

ফেসবুক


ইউটিউব


টিকটক

Rupali Bangladesh

ইনস্টাগ্রাম

Rupali Bangladesh

এক্স

Rupali Bangladesh


লিংকডইন

Rupali Bangladesh

পিন্টারেস্ট

Rupali Bangladesh

গুগল নিউজ

Rupali Bangladesh


হোয়াটস অ্যাপ

Rupali Bangladesh

টেলিগ্রাম

Rupali Bangladesh

মেসেঞ্জার গ্রুপ

Rupali Bangladesh


En Bn

আহসান হাবিব বরুন

প্রকাশিত: মে ১৫, ২০২৬, ০৮:৫৩ পিএম

পানির নিচের দুর্নীতি রোধের উপায় কী?

আহসান হাবিব বরুন

প্রকাশিত: মে ১৫, ২০২৬, ০৮:৫৩ পিএম

ছবি- এআই দিয়ে তৈরি

ছবি- এআই দিয়ে তৈরি

নদীমাতৃক দেশ—বাংলাদেশ। আমরা ছোটবেলা থেকেই এ কথা শুনে আসছি। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, আমরা কি সত্যিই এখনো নদীর দেশ আছি, নাকি নদী ধ্বংসের এক নীরব প্রজাতন্ত্রে পরিণত হয়েছি? কারণ, যেসব নদী একসময় সভ্যতা, কৃষি, ব্যবসা-বাণিজ্য ও মানুষের জীবনধারার প্রাণ ছিল, সেগুলোর অনেকই এখন মৃতপ্রায়। কোথাও কচুরিপানায় ভরাট, কোথাও দখলে, কোথাও দূষণে, আবার কোথাও উন্নয়নের নামে লুটপাটের শিকার। আর এই লুটপাটের সবচেয়ে ভয়ংকর দিক হলো—এটি পানির নিচে ঘটে। ফলে সাধারণ মানুষের চোখে ধরা পড়ে না।

স্থলভাগের দুর্নীতি অন্তত মানুষ দেখতে পায়। একটি সেতু ভেঙে পড়লে, রাস্তা দেবে গেলে, ভবন ধসে পড়লে মানুষ বুঝতে পারে কোথাও দুর্নীতি হয়েছে। কিন্তু নদী খনন, ড্রেজিং কিংবা নাব্যতা বৃদ্ধির নামে যে হাজার হাজার কোটি টাকা লুটপাট হয়, তার অধিকাংশই পানির নিচে চাপা পড়ে থাকে। এখানে দুর্নীতির প্রমাণও পানির স্রোতের সঙ্গে হারিয়ে যায়। আর এ কারণেই পানির নিচের দুর্নীতি বাংলাদেশের সবচেয়ে গভীর, সবচেয়ে বিপজ্জনক এবং সবচেয়ে কম আলোচিত দুর্নীতিগুলোর একটি।

বাংলাদেশে গত এক যুগে নদী খনন, ড্রেজিং ও নাব্যতা বৃদ্ধির নামে হাজার হাজার কোটি টাকার প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। রাষ্ট্রের অর্থ ব্যয় হয়েছে জনগণের করের টাকা থেকে। বলা হয়েছে—নদীর প্রবাহ ফিরবে, বন্যা কমবে, কৃষিতে সেচসুবিধা বাড়বে, নৌপথ সচল হবে। কিন্তু বাস্তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দেখা গেছে, প্রকল্প শেষ হওয়ার কিছুদিন পরই নদী আবার আগের অবস্থায় ফিরে গেছে। কোথাও নদী আরও সংকুচিত হয়েছে, কোথাও খননের কোনো চিহ্নই নেই।

এই দুর্নীতির কৌশল অত্যন্ত সুসংগঠিত। যেখানে তিন ফুট খননের কথা, সেখানে হয়তো ছয় ইঞ্চি কাটা হয়। যেখানে পাঁচ ফুট গভীর করার কথা, সেখানে এক ফুটও খনন হয় না। আবার অনেক ক্ষেত্রে ড্রেজার না নামিয়েই কাগজে-কলমে পুরো কাজ শেষ দেখিয়ে বিল তুলে নেওয়া হয়। সংশ্লিষ্ট ঠিকাদার, কিছু দুর্নীতিগ্রস্ত কর্মকর্তা, রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষক এবং তদারকি সংস্থার অসাধু অংশ—সবাই মিলে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে তোলে। জনগণের টাকা ভাগাভাগি হয়ে যায়, কিন্তু নদী ফিরে পায় না তার প্রাণ।

ফরিদপুরের কুমার নদ তার একটি নির্মম উদাহরণ। একসময় এই নদ ওই অঞ্চলের মানুষের জীবন ও অর্থনীতির অন্যতম প্রধান উৎস ছিল। কিন্তু আজ সেই নদ কচুরিপানায় ভরা, দুর্গন্ধময়, মৃতপ্রায় জলাশয়ে পরিণত হয়েছে। ২০১৮ সালে পানি উন্নয়ন বোর্ড প্রায় ২৫১ কোটি টাকা ব্যয়ে কুমার নদ পুনঃখননের উদ্যোগ নিয়েছিল। প্রকল্পের লক্ষ্য ছিল ১০ কোটি ঘনমিটার পানিপ্রবাহ সৃষ্টি এবং হাজার হাজার হেক্টর জমিতে সেচসুবিধা নিশ্চিত করা। কিন্তু বাস্তবে কী হয়েছে? নদে পানিপ্রবাহ বাড়েনি, দূষণ কমেনি; বরং কচুরিপানা ও বর্জ্যে পুরো নদ ভরে গেছে।

স্থানীয় মানুষের অভিযোগ—প্রকল্পের কাজ যথাযথভাবে হয়নি। নদীর উৎসমুখে সঠিক খনন হয়নি। নদীর দুই পাড়ের অবৈধ দখল উচ্ছেদ করা হয়নি। শহরের ড্রেন, বাজারের ময়লা ও পয়োবর্জ্য প্রতিনিয়ত নদীতে পড়ছে। অথচ প্রকল্পের কাগজে নিশ্চয়ই সব কাজ শতভাগ সফল দেখানো হয়েছে। এখানেই প্রশ্ন ওঠে—তাহলে সেই শত শত কোটি টাকা গেল কোথায়?

বাংলাদেশে পানি উন্নয়ন ও ড্রেজিং প্রকল্পগুলোর সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো স্বচ্ছতার অভাব। সাধারণ মানুষ জানেই না কোন নদীতে কত টাকা বরাদ্দ হলো, কত ঘনমিটার মাটি কাটার কথা, আর প্রকৃতপক্ষে কতটুকু কাজ হলো। তদারকির নামে যে সংস্থাগুলো রয়েছে, তারাই অনেক সময় এই দুর্নীতির অংশ হয়ে যায়। ফলে জনগণের সামনে একটি ভুয়া উন্নয়নের গল্প তুলে ধরা হয়, কিন্তু বাস্তবে নদীগুলো মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যায়।

আরেকটি ভয়ংকর বাস্তবতা হলো—এই দুর্নীতির দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব। একটি নদী শুধু পানি বহন করে না; এটি একটি অঞ্চলের পরিবেশ, কৃষি, জীববৈচিত্র্য, অর্থনীতি এবং মানুষের সংস্কৃতির অংশ। নদী মরে গেলে কৃষি ক্ষতিগ্রস্ত হয়, মাছ কমে যায়, ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নেমে যায়, বন্যার ঝুঁকি বাড়ে। ফলে পানির নিচের দুর্নীতি কেবল অর্থ লুটপাট নয়; এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের অস্তিত্বের বিরুদ্ধে এক ধরনের নীরব ও ভয়ংকর মরণখেলা।

বিশ্বের অনেক দেশ নদী ব্যবস্থাপনায় আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করছে। স্যাটেলাইট মনিটরিং, জিপিএস ম্যাপিং, ড্রোন জরিপ ও ডিজিটাল ডেটা ব্যবস্থার মাধ্যমে প্রতিটি খননকাজ পর্যবেক্ষণ করা হয়। কোথায় কত গভীর খনন হয়েছে, কত মাটি অপসারণ হয়েছে—সব তথ্য জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত থাকে। কিন্তু বাংলাদেশে এখনো অধিকাংশ প্রকল্প পরিচালিত হয় কাগুজে হিসাব আর রাজনৈতিক প্রভাবের ভিত্তিতে। ফলে দুর্নীতির সুযোগ অবারিত থাকে।

এই পরিস্থিতি থেকে বের হতে হলে প্রথমেই দরকার রাজনৈতিক সদিচ্ছা। কারণ, দুর্নীতির এই সিন্ডিকেট ভাঙতে হলে শুধু প্রশাসনিক নির্দেশনা যথেষ্ট নয়। রাষ্ট্রকে স্পষ্ট বার্তা দিতে হবে—নদী খননের নামে লুটপাট আর চলবে না। প্রতিটি প্রকল্পের জন্য স্বাধীন অডিট বাধ্যতামূলক করতে হবে। কোন নদীতে কত গভীর খনন হলো, সেটি ডিজিটাল ম্যাপ আকারে জনগণের সামনে প্রকাশ করতে হবে।

দ্বিতীয়ত, স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করতে হবে। নদীর পাশে বসবাসকারী মানুষ সবচেয়ে ভালো জানে নদীর প্রকৃত অবস্থা। তাদের মতামত ও পর্যবেক্ষণকে গুরুত্ব না দিলে প্রকল্পের বাস্তব চিত্র জানা সম্ভব নয়। নাগরিক সমাজ, পরিবেশবাদী সংগঠন এবং স্থানীয় গণমাধ্যমকে তদারকির সুযোগ দিতে হবে।

তৃতীয়ত, দুর্নীতির সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। বাংলাদেশে বড় দুর্নীতির অনেক ঘটনা আলোচনায় আসে, কিন্তু শাস্তির নজির খুব কম। ফলে দুর্নীতিবাজদের মধ্যে ভয়ের সংস্কৃতি তৈরি হয় না। নদী খননের নামে যারা রাষ্ট্রের হাজার হাজার কোটি টাকা লুটপাট করেছে, তাদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা না নিলে এই চক্র কখনো ভাঙবে না।

সবচেয়ে বড় কথা, আমাদের মানসিকতার পরিবর্তন দরকার। নদীকে আমরা এখনো অনেক ক্ষেত্রে “অবহেলিত সম্পদ” হিসেবে দেখি। অথচ নদী বাঁচলে বাংলাদেশ বাঁচবে। নদী মরে গেলে এই দেশের কৃষি, অর্থনীতি ও পরিবেশ একসময় ভয়াবহ সংকটে পড়বে। তাই নদী রক্ষার প্রশ্নটি কেবল পরিবেশগত বিষয় নয়; এটি জাতীয় নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ অস্তিত্বের প্রশ্ন।

পরিশেষে বলা যায়, ফরিদপুরের কুমার নদ আজ বাংলাদেশের শত শত নদীর প্রতিচ্ছবি। কোটি কোটি টাকা ব্যয়ের পরও যদি নদীতে পানি না থাকে, যদি মানুষ দুর্গন্ধে পাশে দাঁড়াতে না পারে, যদি কচুরিপানায় নদী ঢেকে যায়—তাহলে বুঝতে হবে, সমস্যাটি শুধু প্রশাসনিক ব্যর্থতা নয়; এটি একটি সংগঠিত লুটপাটের চিত্র। পানির নিচের দুর্নীতি তাই এখন আর অদৃশ্য কোনো বিষয় নয়। এটি রাষ্ট্রের অর্থনীতি, পরিবেশ ও ভবিষ্যতের বিরুদ্ধে এক নীরব যুদ্ধ। এই যুদ্ধ থামাতে না পারলে একদিন হয়তো বাংলাদেশের নদীগুলো শুধু মানচিত্রে থাকবে, বাস্তবে নয়। সুতরাং নদী ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে বাঁচাতে পানির নিচের দুর্নীতি বন্ধে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। এর কোনো বিকল্প নেই।

Link copied!