বাংলাদেশের অর্থনীতির মানচিত্রে চামড়া শিল্প এমন এক অমূল্য সম্পদ, যাকে আমার বিভিন্ন লেখায় 'অবহেলায় পড়ে থাকা হিরক খণ্ড' হিসেবে অভিহিত করেছি। প্রাকৃতিকভাবেই এ দেশের গবাদি পশুর চামড়ার গুণগত মান বিশ্বসেরা। বিশেষ করে প্রায় ১৮ কোটি মানুষের এই জনপদে ৯২ শতাংশ ইসলাম ধর্মাবলম্বী। ঈদুল আজহা বা কোরবানির মৌসুমে এ দেশের পশুর চামড়ার যে বিপুল যোগান আসে, তা বিশ্বের খুব কম দেশেই দেখা যায়। কোরবানির চামড়া কেবল একটি অর্থনৈতিক পণ্যই নয়, এর সাথে জড়িয়ে আছে এ দেশের মানুষের ধর্মীয় আবেগ, ত্যাগের মহিমা এবং আর্তমানবতার সেবার এক মহান ঐতিহ্য। তবে দীর্ঘদিন ধরে সঠিক ব্যবস্থাপনা, দক্ষ জনবল এবং প্রয়োজনীয় অর্থায়নের অভাবে এই অমূল্য জাতীয় সম্পদ অপচয় হয়ে আসছিল।
ইতিপূর্বে গত ২২ এপ্রিল দৈনিক রূপালী বাংলাদেশ এবং দৈনিক যায়যায় দিন পত্রিকায় প্রকাশিত দুটি নিবন্ধে এই শিল্পের সংকট ও উত্তরণের দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছিলাম। অত্যন্ত আশার কথা হলো, আসন্ন ২০২৬ সালের ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার এই খাতকে পুনরুজ্জীবিত করতে যে সমন্বিত ও যুগান্তকারী উদ্যোগ গ্রহণ করেছে, তা আমার সেই প্রবন্ধগুলোর দীর্ঘমেয়াদী দাবিরই বাস্তব প্রতিফলন।
একটি দেশের অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড শক্ত করতে হলে তার দেশজ কাঁচামালের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা অপরিহার্য। বাংলাদেশের চামড়া বিশ্বের অন্যতম সেরা গুণমানসম্পন্ন। বিশেষ করে এ দেশের 'লাইট ওয়েট' বা হালকা ওজনের চামড়ার আন্তর্জাতিক বাজারে বিশেষ কদর রয়েছে। কিন্তু বিগত বছরগুলোতে আমরা দেখেছি, সঠিক সংরক্ষণের অভাবে এবং সিন্ডিকেটের থাবায় এই মূল্যবান সম্পদ রাজপথে পচে নষ্ট হয়েছে। গত কয়েক বছর ধরে চামড়ার ন্যায্য দাম না পেয়ে ক্ষোভে-দুঃখে মানুষ চামড়া মাটির নিচে পুঁতে ফেলেছে। এই জাতীয় অবক্ষয় রোধে এবার সরকার অত্যন্ত কঠোর এবং বাস্তবমুখী অবস্থান নিয়েছে। জাতীয় সম্পদ হিসেবে চামড়াকে রক্ষা করতে এবং পাচার রোধে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও জেলা প্রশাসনকে একযোগে কাজ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
চামড়া শিল্পের সবচেয়ে বড় প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জ হলো তৃণমূল পর্যায়ে দক্ষ জনবলের অভাব। প্রতি বছর দেখা যায়, অপেশাদার কসাইদের মাধ্যমে চামড়া ছাড়ানোর ফলে তাতে অসংখ্য কাটা দাগ পড়ে। আন্তর্জাতিক বাজারে চামড়ার গ্রেড বা মান নির্ধারণের ক্ষেত্রে এই কাটা দাগগুলো বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়, যা চামড়ার বাজারমূল্য বহুলাংশে কমিয়ে দেয়। এবারই প্রথম সরকার জাতীয় পর্যায়ে ব্যাপকভিত্তিক প্রশিক্ষণের উদ্যোগ নিয়েছে। সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, সারাদেশে কসাই, মৌসুমি ব্যবসায়ী এবং বিশেষ করে মাদরাসা ও এতিমখানার সংশ্লিষ্টদের বিজ্ঞানসম্মত উপায়ে পশু কোরবানি এবং চামড়া ছাড়ানোর কৌশল শেখানো হচ্ছে। এর পাশাপাশি চামড়া ছাড়ানোর পরপরই সঠিক পরিমাণে লবণ দিয়ে সংরক্ষণের প্রাথমিক পাঠ বা 'কিউরিং' পদ্ধতি শেখানো হচ্ছে। এই দক্ষ জনবল তৈরির প্রক্রিয়াটি চামড়ার অপচয় রোধে এক কালজয়ী বিপ্লব ঘটাবে বলে আশা করা যায়।
প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, এবারের কোরবানিতে পশুর কোনো সংকট হওয়ার আশঙ্কা নেই। চাহিদার তুলনায় প্রায় ২২ লাখ বেশি পশুর জোগান নিশ্চিত করা হয়েছে। পরিসংখ্যানে দেখা যায়, বাংলাদেশে বছরে প্রায় ১ কোটি ৮০ লাখ থেকে ২ কোটি গবাদি পশু জবাই করা হয়, যার প্রায় ৬০ শতাংশই আসে কোরবানির তিন দিনে। পশুর এই বিপুল যোগান যেমন ধর্মীয় উৎসবকে নির্বিঘ্ন করবে, তেমনি চামড়া শিল্পের কাঁচামালের সরবরাহকেও শক্তিশালী করবে। চাহিদার চেয়ে জোগান বেশি থাকায় বাজারে কোনো কৃত্রিম সংকট তৈরির সুযোগ থাকবে না এবং চামড়ার বাজারে একটি স্থিতিশীল ভারসাম্য বজায় থাকবে।
চামড়া শিল্পের সংকটের মূলে বরাবরই ছিল প্রান্তিক ব্যবসায়ীদের হাতে নগদ টাকার অভাব। আগে দেখা যেত, ব্যাংক ঋণের জটিল শর্তের কারণে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা সঠিক সময়ে চামড়া কিনতে পারতেন না। সরকার এবার বাংলাদেশ ব্যাংকের মাধ্যমে ঋণ গ্রহণের শর্ত ব্যাপক শিথিল করেছে। এর ফলে তৃণমূল পর্যায়ের ব্যবসায়ীরা সরাসরি ব্যাংক থেকে সহজ শর্তে ঋণ সুবিধা পাচ্ছেন। তবে এবারের সবচেয়ে বড় চমক ও প্রশংসনীয় উদ্যোগ হলো বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের জন্য অর্থ বিভাগের ২০ কোটি টাকার বিশেষ বরাদ্দ। গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, এই তহবিল মূলত ব্যয় করা হবে প্রান্তিক পর্যায়ে বিনামূল্যে লবণ সরবরাহ এবং সচেতনতামূলক প্রচারণায়। জেলা প্রশাসকদের মাধ্যমে দেশের সকল গুরুত্বপূর্ণ এতিমখানা ও মাদরাসায় বিনামূল্যে লবণ পৌঁছে দেওয়া হবে যাতে লবণের অভাবে একটি চামড়াও নষ্ট না হয়। এই সহজ অর্থপ্রবাহ এবং সরাসরি উপকরণ সহায়তা মাঠ পর্যায়ে চামড়ার ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করতে সহায়তা করবে।
বাংলাদেশের চামড়া শিল্পের আন্তর্জাতিক বাজার সম্প্রসারণের পথে সবচেয়ে বড় বাধা হলো সাভারের চামড়া শিল্পনগরীর কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার বা সিইটিপি’র অকার্যকারিতা। এলডব্লিউজি সার্টিফিকেট না থাকায় ইউরোপ ও আমেরিকার বড় ক্রেতারা সরাসরি আমাদের থেকে চামড়া কিনতে পারে না। বর্তমান সরকার এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সিইটিপি-র আমূল সংস্কার ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা সক্ষমতা বাড়ানোর জন্য কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছে। পরিবেশ দূষণ রোধে আধুনিক প্রযুক্তি স্থাপনের ফলে এখন আমাদের চামড়া শিল্প কেবল অভ্যন্তরীণ নয়, বরং বৈশ্বিক মানদণ্ড অর্জনের পথে অনেক দূর এগিয়ে যাবে। এটি এক বিলিয়ন ডলারের বেশি অতিরিক্ত রপ্তানি আয় নিশ্চিত করার পথে একটি বড় মাইলফলক হিসেবে কাজ করবে।
চামড়া শিল্পের বিপর্যয়ের সবচেয়ে বড় শিকার হয়েছে দেশের কওমি মাদরাসা ও এতিমখানাগুলো। বাংলাদেশের সমাজকাঠামোয় একটি চমৎকার জনকল্যাণমূলক ব্যবস্থা ছিল কোরবানির চামড়া। এই প্রতিষ্ঠানগুলো মূলত চামড়া বিক্রির টাকায় তাদের 'লিল্লাহ বোর্ডিং' পরিচালনা করে হাজার হাজার এতিম ও দুস্থ শিশুর অন্ন-বস্ত্র ও শিক্ষার যোগান দেয়। চামড়ার দাম অস্বাভাবিকভাবে কমে যাওয়ার ফলে এই এতিমখানাগুলো আজ চরম অর্থনৈতিক সংকটে পড়েছে। সরকারের বর্তমান উদ্যোগ, বিশেষ করে সরাসরি লবণ সরবরাহ এবং ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করার পরিকল্পনাটি এই এতিম শিশুদের মুখে হাসি ফোটাবে। এটি কেবল একটি ব্যবসায়িক সিদ্ধান্ত নয়, বরং সামাজিক বৈষম্য দূর করার একটি অনন্য উদাহরণ।
তৈরি পোশাক শিল্পের পর চামড়া শিল্পই বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী খাত হওয়ার সম্ভাবনা রাখে। বর্তমান সরকারের সমন্বিত উদ্যোগ—যাতে যুক্ত হয়েছে আর্থিক প্রণোদনা, দক্ষ জনবল তৈরি এবং অবকাঠামোগত উন্নয়ন—তা এই খাতের হারানো গৌরব ফিরিয়ে আনতে সক্ষম। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সরাসরি তত্ত্বাবধানে চামড়া শিল্প উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ গঠনের পরিকল্পনা এই খাতের প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতা ও গতিশীলতা বৃদ্ধি করবে। আধুনিক বিশ্বে চামড়াজাত পণ্যের বাজার যখন ক্রমবর্ধমান, তখন সরকারের এই সময়োপযোগী হস্তক্ষেপ জাতীয় সম্পদ রক্ষায় একটি অভেদ্য প্রাচীর হিসেবে কাজ করবে।
পরিশেষে বলা যায়, চামড়া কেবল একটি প্রাণীর শরীরের অংশ নয়; এটি আমাদের জাতীয় অর্থনীতির এক গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ। আসন্ন ঈদুল আজহা যেন কেবল ত্যাগের উৎসবই না হয়, বরং এটি যেন বাংলাদেশের চামড়া শিল্পের পুনর্জন্মের এক নতুন অধ্যায় হয়ে ওঠে। সরকারের যুগান্তকারী পরিকল্পনাগুলো যদি মাঠ পর্যায়ে সফলভাবে বাস্তবায়িত হয়, তবে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম আমাদের এই দূরদর্শী পদক্ষেপের জন্য কৃতজ্ঞ থাকবে। রাষ্ট্রকে অবশ্যই কঠোর হাতে বাজার সিন্ডিকেট গুঁড়িয়ে দিতে হবে এবং চামড়া পাচার রোধে সীমান্তে সজাগ থাকতে হবে। তবেই আমাদের জাতীয় সম্পদ 'হিরক খণ্ড' তার প্রকৃত দীপ্তি ছড়িয়ে দেশের অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করবে।
তথ্যসূত্র:
১. "কুরবানির চামড়া সুরক্ষায় কঠোর নজরদারির উদ্যোগ: ২০ কোটি টাকার বিশেষ বরাদ্দ", দৈনিক যুগান্তর, ১২ মে ২০২৬।
২. "সম্ভাবনাময় চামড়াশিল্প: উত্তরণে চাই দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা", দৈনিক রূপালী বাংলাদেশ, ২২ এপ্রিল ২০২৬। দৈনিক যায়যায় দিন, ২২ এপ্রিল ২০২৬।
লেখক: এ এইচ এম ফারুক।
সাংবাদিক, কলামিস্ট, গবেষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক।


সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন