তিস্তা বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের মানুষের জীবন-জীবিকা, কৃষি উৎপাদন, পরিবেশগত ভারসাম্য এবং আঞ্চলিক অর্থনীতির অন্যতম ভিত্তি। একবিংশ শতাব্দীতে এটি শুধু একটি নদী নয়; বরং দেশের পানি ও খাদ্য নিরাপত্তা এবং আঞ্চলিক আর্থরাজনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদানে পরিণত হয়েছে। শুষ্ক মৌসুমে পানির সংকট ও বর্ষায় অতিরিক্ত প্রবাহ উত্তরাঞ্চলের টেকসই উন্নয়নের বড় বাধা হওয়ায় তিস্তা প্রকল্পের গুরুত্ব দিন দিন বেড়েছে। এ প্রেক্ষাপটে প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরের সময় তিস্তা প্রকল্পে সহযোগিতার বিষয়ে চীনের ইতিবাচক আগ্রহ ও নীতিগত সমর্থন বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক অগ্রগতি হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। এ উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে উত্তরাঞ্চলের পানি ব্যবস্থাপনা, কৃষি, পরিবেশ ও আঞ্চলিক অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হবে। তবে প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে জাতীয় স্বার্থ, অর্থনৈতিক যৌক্তিকতা, পরিবেশগত ভারসাম্য এবং বাংলাদেশের সার্বভৌম সিদ্ধান্ত গ্রহণের অধিকার সর্বোচ্চ গুরুত্ব পেতে হবে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, দেশের উল্লেখযোগ্য আবাদযোগ্য জমি উত্তরাঞ্চলে অবস্থিত। কৃষিপণ্য উৎপাদনের বিপুল সম্ভাবনা থাকলেও সেচের পানির অভাবে উৎপাদনশীলতা কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে পৌঁছায়নি। এ বাস্তবতায় তিস্তা ব্যারেজ প্রকল্পের লক্ষ্য ছিল পানি সংরক্ষণ, সেচ সম্প্রসারণ, বন্যা নিয়ন্ত্রণ এবং উত্তরাঞ্চলের অর্থনৈতিক উন্নয়ন। সময়ের সঙ্গে এটি একটি প্রকৌশল প্রকল্পের সীমা ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক নদী ব্যবস্থাপনা, কূটনীতি ও আঞ্চলিক আর্থরাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে পরিণত হয়েছে। যথার্থই বলা হয়, “একটি নদী শুধু পানির প্রবাহ নয়; এটি মানুষের জীবন, রাষ্ট্রের অর্থনীতি এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কেরও প্রবাহ বহন করে।”
স্বাধীনতার পর দোয়ানীতে তিস্তা ব্যারেজ নির্মাণ করে প্রায় সাড়ে ৭ লাখ হেক্টর জমিতে সেচের পরিকল্পনা নেওয়া হলেও উজানে ভারতের গজলডোবা ব্যারেজ এবং শুষ্ক মৌসুমে পানিপ্রবাহ কমে যাওয়ায় সেই লক্ষ্য পূর্ণমাত্রায় বাস্তবায়িত হয়নি। ভারতের কাছে এটি কৃষি উন্নয়নের প্রকল্প হলেও বাংলাদেশের জন্য এর প্রভাব পড়েছে কৃষি, নদীর নাব্যতা ও পরিবেশে। ফলে তিস্তা আজ শুধু উন্নয়ন নয়, পানি নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক কৌশলগত রাজনীতিরও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। ফারাক্কা বাঁধের অভিজ্ঞতাও দেখিয়েছে যে অভিন্ন নদীর পানি রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ককে গভীরভাবে প্রভাবিত করতে পারে।
আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী, কোনো রাষ্ট্র তার ভূখণ্ডের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত নদীর পানি ব্যবহার করতে পারে, তবে ভাটির দেশের উল্লেখযোগ্য ক্ষতি করা যাবে না। “ন্যায্য ও যুক্তিসঙ্গত ব্যবহার” এবং “উল্লেখযোগ্য ক্ষতি না করা” আন্তর্জাতিক পানি আইনের মৌলিক নীতি। নীল, মেকং ও টাইগ্রিস-ইউফ্রেটিস নদীর অভিজ্ঞতা প্রমাণ করে, আন্তঃসীমান্ত নদীর দীর্ঘমেয়াদি সমাধান একতরফা পদক্ষেপে নয়; বরং সহযোগিতা, তথ্য বিনিময় ও কূটনৈতিক সংলাপের মাধ্যমেই সম্ভব। তিস্তার ক্ষেত্রেও বাংলাদেশের লক্ষ্য হওয়া উচিত ন্যায্য পানির অধিকার নিশ্চিত করার পাশাপাশি আঞ্চলিক সহযোগিতাকে আরও শক্তিশালী করা।
বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে তিস্তার পানি বণ্টন নিয়ে দীর্ঘদিন আলোচনা চললেও ২০১১ সালের অন্তর্বর্তীকালীন চুক্তির খসড়া আজও বাস্তবায়িত হয়নি। ফলে তিস্তা অববাহিকার পানি ব্যবস্থাপনা অনিশ্চিত রয়ে গেছে। এ অবস্থায় বাংলাদেশ তিস্তা ব্যারেজের আধুনিকায়ন ও বৃহত্তর তিস্তা প্রকল্প নিয়ে ভাবছে, কারণ খাদ্য নিরাপত্তা ও কৃষি অর্থনীতি দীর্ঘদিন অন্য দেশের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরশীল থাকলে তা কৌশলগত ঝুঁকিতে পরিণত হয়। তাই তিস্তা ব্যারেজকে পানি চুক্তির বিকল্প নয়, বরং বৈজ্ঞানিক পানি সংরক্ষণ, বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও দেশের নিজস্ব পানি ব্যবস্থাপনা সক্ষমতা বৃদ্ধির একটি কৌশলগত উদ্যোগ হিসেবে দেখা উচিত।
অভিন্ন ৫৪টি নদীর নিম্ন অববাহিকার দেশ হিসেবে ভারতের সঙ্গে সহযোগিতা বাংলাদেশের জন্য অপরিহার্য। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের আপত্তির কারণে তিস্তা চুক্তি বাস্তবায়িত না হওয়া প্রমাণ করে যে আন্তঃরাষ্ট্রীয় সম্পর্কেও অভ্যন্তরীণ রাজনীতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এ বাস্তবতা বাংলাদেশের জন্য একটি শিক্ষা—চুক্তির অপেক্ষার পাশাপাশি নিজস্ব পানি ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করতে হবে। একই সঙ্গে ভারতকেও উপলব্ধি করতে হবে যে অভিন্ন নদীর ন্যায্য ব্যবহার নিশ্চিত করা আন্তর্জাতিক আইনের দাবি এবং দীর্ঘমেয়াদি সুসম্পর্কের পূর্বশর্ত।
তিস্তা ব্যারেজের সবচেয়ে বড় সম্ভাবনা উত্তরাঞ্চলের কৃষি অর্থনীতিতে। রংপুর, নীলফামারী, লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম ও গাইবান্ধার কৃষি তিস্তার পানির ওপর নির্ভরশীল হলেও শুষ্ক মৌসুমে পানির সংকট ও বর্ষায় অতিরিক্ত প্রবাহের কারণে উৎপাদন সম্ভাবনার তুলনায় পিছিয়ে রয়েছে। তিস্তার পানি সুষ্ঠুভাবে ব্যবস্থাপনা করা গেলে সেচ সম্প্রসারণের মাধ্যমে কৃষি উৎপাদন, কৃষকের আয়, কর্মসংস্থান এবং উত্তরাঞ্চলের সামগ্রিক অর্থনীতি উল্লেখযোগ্যভাবে শক্তিশালী হতে পারে।
তিস্তা ব্যারেজের গুরুত্ব কৃষির গণ্ডি ছাড়িয়ে উত্তরাঞ্চলের সামগ্রিক অর্থনৈতিক, সামাজিক ও পরিবেশগত উন্নয়নের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। সমন্বিত নদী ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে নির্ভরযোগ্য সেচ নিশ্চিত হলে ধান, গম, ভুট্টা, আলু, সবজি ও উচ্চমূল্যের কৃষিপণ্যের উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেতে পারে। একই সঙ্গে বন্যা ও নদীভাঙন নিয়ন্ত্রণ, নদীর নাব্যতা রক্ষা এবং ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ কমানোর মাধ্যমে পানি নিরাপত্তা ও পরিবেশগত ভারসাম্য সুদৃঢ় হবে।
এর পাশাপাশি নদীকেন্দ্রিক মৎস্যসম্পদের পুনরুদ্ধার, আধুনিক মৎস্যচাষ, ফল ও বনজ বৃক্ষের বনায়ন, নদীতীর সংরক্ষণ, পরিকল্পিত বসতি গড়ে তোলা, জলাধারভিত্তিক পর্যটন, নৌপর্যটন, ইকো-ট্যুরিজম এবং কৃষিভিত্তিক ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের বিকাশের নতুন সুযোগ সৃষ্টি হবে। এসব উদ্যোগ তিস্তা অববাহিকাকে উত্তরাঞ্চলের একটি সমন্বিত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অঞ্চলে পরিণত করতে পারে এবং স্থানীয় অর্থনীতিতে নতুন গতি সঞ্চার করবে।
এসব উন্নয়ন কার্যক্রম দেশের খাদ্য নিরাপত্তা জোরদার, কৃষকের আয় ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, গ্রামীণ অর্থনীতির বিকাশ, আঞ্চলিক বৈষম্য হ্রাস এবং দীর্ঘমেয়াদি টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে। একই সঙ্গে উন্নত পানি ব্যবস্থাপনা জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবিলায় সহায়ক হবে। তবে এই সম্ভাবনার পূর্ণ সুফল অর্জনের জন্য পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ, স্থানীয় জনগণের পুনর্বাসন এবং সুশাসনকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। তাই তিস্তা ব্যারেজকে শুধু একটি বাঁধ নয়, বরং বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের পানি নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক অর্থনৈতিক রূপান্তরের একটি কৌশলগত বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচনা করা উচিত।
তবে এই সম্ভাবনা বাস্তবায়নের জন্য অর্থায়ন ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতার প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ। পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল ও কর্ণফুলী টানেল বাংলাদেশের সক্ষমতার পরিচয় দিলেও তিস্তার মতো প্রকল্পে দীর্ঘমেয়াদি পানি ব্যবস্থাপনা, পরিবেশ সংরক্ষণ, গবেষণা ও রক্ষণাবেক্ষণের বিষয় যুক্ত থাকায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাস্তবসম্মত বিকল্প। এ ক্ষেত্রে চীনের নদী প্রকৌশল ও অবকাঠামো নির্মাণের অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের জন্য সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে। তবে ঋণের শর্ত, সুদের হার, পরিশোধ সক্ষমতা, প্রকল্পের অর্থনৈতিক লাভজনকতা এবং জাতীয় স্বার্থ অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে মূল্যায়ন করতে হবে। শ্রীলঙ্কার হাম্বানটোটা বন্দরের অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে যে দুর্বল প্রকল্প পরিকল্পনা ও ঋণ ব্যবস্থাপনা দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। তবে অনেক গবেষকের মতে, এটিকে শুধু ‘ঋণ ফাঁদ’ বলে ব্যাখ্যা না করে প্রকল্প নির্বাচন, অর্থনৈতিক সক্ষমতা ও সুশাসনের প্রশ্নও সমান গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বিচক্ষণ কৌশল হবে কোনো একটি দেশের ওপর অতিরিক্ত নির্ভর না করে বহুমুখী অর্থায়ন ও অংশীদারিত্বের পথ অনুসরণ করা। চীনের পাশাপাশি বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক, জাপানসহ অন্যান্য উন্নয়ন অংশীদারের সহযোগিতাও বিবেচনা করা যেতে পারে। তবে প্রকল্পের মালিকানা, পরিচালনা ও নীতিগত নিয়ন্ত্রণ অবশ্যই বাংলাদেশের হাতেই থাকতে হবে, যাতে জাতীয় সার্বভৌমত্ব ও অর্থনৈতিক স্বার্থ অক্ষুণ্ন থাকে। যথার্থই অর্থনীতিবিদরা বলেন, “উন্নয়ন প্রকল্পের সাফল্য অর্থের উৎসে নয়; বরং তা দেশের উৎপাদনশীলতা ও দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক সক্ষমতা কতটা বাড়ায়, তার ওপর নির্ভর করে।”
তিস্তা প্রকল্পের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক এর আর্থরাজনৈতিক প্রভাব। বাংলাদেশকে ভারত ও চীনের মতো দুই আঞ্চলিক শক্তির সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রেখে প্রকল্পটিকে ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতার নয়, বরং সহযোগিতার প্ল্যাটফর্মে পরিণত করতে হবে। ভারতের অংশগ্রহণ সম্ভব হলে তা পারস্পরিক আস্থা, পানি সহযোগিতা ও দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্ককে আরও শক্তিশালী করতে পারে। তবে এই সহযোগিতা অবশ্যই বাংলাদেশের ন্যায্য পানির অধিকার, জাতীয় স্বার্থ ও সার্বভৌম সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে। অন্যদিকে, ভারত অংশগ্রহণ না করলে প্রকল্পটিকে পানি নিরাপত্তা, জলবায়ু অভিযোজন, কৃষি উন্নয়ন ও টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির একটি জাতীয় উন্নয়ন উদ্যোগ হিসেবেই উপস্থাপন করা উচিত।
আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতাও একই শিক্ষা দেয়। নীল নদের GERD, মেকং নদী কমিশন এবং ইউরোপের রাইন ও দানিউব নদীর উদাহরণ দেখায় যে আন্তঃসীমান্ত নদীর দীর্ঘমেয়াদি সমাধান একতরফা পদক্ষেপে নয়; বরং সংলাপ, তথ্য বিনিময়, প্রাতিষ্ঠানিক সহযোগিতা ও যৌথ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে সম্ভব। তিস্তার ক্ষেত্রেও এই অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা হতে পারে।
এসব অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা বহন করে। তিস্তাকে শুধু পানি বণ্টনের সমস্যা হিসেবে নয়, সমন্বিত নদী অববাহিকা ব্যবস্থাপনার অংশ হিসেবে দেখতে হবে। নদীর পানি কৃষি, শিল্প, মৎস্য, পর্যটন ও পরিবেশ সংরক্ষণের সমন্বিত সম্পদ হিসেবে ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে এবং উন্নয়ন ও পরিবেশের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখতে হবে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে পানি নিরাপত্তা ক্রমেই কৌশলগত ইস্যু হয়ে উঠছে; তাই তিস্তা প্রকল্পের লক্ষ্য শুধু ব্যারেজ নির্মাণ নয়, বরং একটি আধুনিক, টেকসই ও সহযোগিতাভিত্তিক নদী ব্যবস্থাপনা মডেল গড়ে তোলা।
তবে এই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে আবেগ নয়, বৈজ্ঞানিক গবেষণা, অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ ও ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতির ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। প্রকল্প বাস্তবায়নের আগে পূর্ণাঙ্গ অর্থনৈতিক, সামাজিক ও পরিবেশগত সম্ভাব্যতা সমীক্ষা প্রয়োজন, যাতে নির্মাণ ব্যয়ের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি রক্ষণাবেক্ষণ, কৃষি উৎপাদন, পরিবেশগত প্রভাব, পুনর্বাসন এবং অর্থনৈতিক প্রত্যাবর্তন যথাযথভাবে মূল্যায়িত হয়। একই সঙ্গে ভারতের সঙ্গে তিস্তা পানি চুক্তির আলোচনা অব্যাহত রাখার পাশাপাশি বাংলাদেশের নিজস্ব পানি ব্যবস্থাপনা সক্ষমতাও শক্তিশালী করতে হবে।
তিস্তা একটি অভিন্ন নদী হওয়ায় যৌথ উদ্যোগের সম্ভাবনা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা যেতে পারে। তবে সহযোগিতা অবশ্যই বাংলাদেশের ন্যায্য পানির অধিকার, জাতীয় স্বার্থ ও সার্বভৌম সিদ্ধান্ত গ্রহণের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে। বিদেশি অর্থায়নের ক্ষেত্রে কোনো একটি দেশের ওপর অতিরিক্ত নির্ভর না করে বহুমুখী অংশীদারিত্বের নীতি অনুসরণ করা উচিত। বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক, জাপান, চীনসহ বিভিন্ন উন্নয়ন অংশীদারের সহযোগিতা বিবেচনা করা যেতে পারে, তবে ঋণের শর্ত, পরিশোধ সক্ষমতা, অর্থনৈতিক লাভজনকতা ও জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। একই সঙ্গে স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ, পুনর্বাসন ও জীবিকা সুরক্ষাও নিশ্চিত করতে হবে, কারণ উন্নয়ন তখনই অর্থবহ হয়, যখন তার সুফল মানুষের কাছে পৌঁছে।
সবশেষে বলা যায়, তিস্তা ব্যারেজ শুধু একটি অবকাঠামো প্রকল্প নয়; এটি বাংলাদেশের পানি নিরাপত্তা, কৃষি উন্নয়ন, আঞ্চলিক অর্থনীতি এবং আর্থরাজনৈতিক ভবিষ্যতের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। তাই একে ভারত-বাংলাদেশ পানি চুক্তির বিকল্প নয়, বরং বাংলাদেশের নিজস্ব পানি ব্যবস্থাপনা ও উন্নয়ন সক্ষমতা বৃদ্ধির একটি কৌশলগত উদ্যোগ হিসেবে দেখা উচিত। তবে এ প্রকল্প বাস্তবায়নে অর্থনৈতিক লাভের পাশাপাশি পরিবেশগত ভারসাম্য, স্থানীয় জনগণের স্বার্থ এবং জাতীয় সার্বভৌমত্ব সমান গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় রাখতে হবে। একই সঙ্গে ভারতের সঙ্গে গঠনমূলক সহযোগিতা অব্যাহত রেখে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সম্পৃক্ত করে এমন একটি ভারসাম্যপূর্ণ নীতি গ্রহণ করতে হবে, যা বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেয়। পরিকল্পিত বাস্তবায়ন, দক্ষ কূটনীতি এবং বৈজ্ঞানিক পানি ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে তিস্তা ব্যারেজ উত্তরাঞ্চলের উন্নয়নের পাশাপাশি দক্ষিণ এশিয়ায় সহযোগিতাভিত্তিক নদী ব্যবস্থাপনার একটি ইতিবাচক দৃষ্টান্ত হয়ে উঠতে পারে।
লেখক: ড. মো. মিজানুর রহমান, অর্থনীতিবিদ, গবেষক ও কলামিস্ট।

