× UCB Sticker Card
বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

ফেসবুক


ইউটিউব


টিকটক

Rupali Bangladesh

ইনস্টাগ্রাম

Rupali Bangladesh

এক্স

Rupali Bangladesh


লিংকডইন

Rupali Bangladesh

পিন্টারেস্ট

Rupali Bangladesh

গুগল নিউজ

Rupali Bangladesh


হোয়াটস অ্যাপ

Rupali Bangladesh

টেলিগ্রাম

Rupali Bangladesh

মেসেঞ্জার গ্রুপ

Rupali Bangladesh


En Bn

এ এইচ এম ফারুক

প্রকাশিত: ডিসেম্বর ১৩, ২০২৫, ০৯:২৩ পিএম

মতামত

তপশিল ঘোষণার পর হাদিকে গুলি: রাজনৈতিক অস্থিরতা বৃদ্ধি! 

এ এইচ এম ফারুক

প্রকাশিত: ডিসেম্বর ১৩, ২০২৫, ০৯:২৩ পিএম

ছবি- সংগৃহীত

ছবি- সংগৃহীত

নির্বাচন কমিশন কর্তৃক আসন্ন ১২ ফেব্রুয়ারির (২০২৬খ্রি.) ভোটগ্রহণ সামনে রেখে তপশিল ঘোষণার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ এক নতুন রাজনৈতিক মোড়ে এসে দাঁড়িয়েছে। একদিকে সংবিধান রক্ষার তাগিদ, অন্যদিকে বিদ্যমান রাজনৈতিক দলগুলোর ভিন্ন ভিন্ন মেরুতে অবস্থানের ফলে টানাপোড়েনে দেশের রাজনীতিতে এক গভীর অস্থিরতা বিরাজ করছে। এই অস্থিরতা কেবল কথার যুদ্ধে সীমাবদ্ধ নেই, বরং তপশিল ঘোষণার পরপরই ঢাকা ৮ আসনের সম্ভাব্য এমপি প্রার্থী ও জুলাই আন্দোলনের নেতা ওসমান হাদিকে গুলি করে হত্যার চেষ্টা এবং একাধিক ককটেল হামলার মতো সহিংস ঘটনায় তা প্রকট আকার ধারণ করেছে।

এমন এক পরিস্থিতিতে, নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করা এবং আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। এই নিবন্ধে, চলমান রাজনৈতিক অস্থিরতা, সাম্প্রতিক সহিংসতা এবং ফেব্রুয়ারির নির্বাচনকে ঘিরে তৈরি হওয়া জটিল সমীকরণটি গভীরভাবে বিশ্লেষণ করব।

উপমহাদেশের নির্বাচনকালীন সহিংসতার ইতিহাস নতুন নয়। ভারতের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধী বা পাকিস্তানের বেনজির ভুট্টোর ওপর হামলার মতো ঘটনাগুলো স্মরণ করিয়ে দেয়, সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কতটা জরুরি। এই কারণে, বর্তমান পরিস্থিতিতে সামরিক বাহিনীর অংশগ্রহণ এই নির্বাচনকে তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল, নিরাপদ ও আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য করে তোলার জন্য একটি অপরিহার্য কৌশলগত পদক্ষেপ।

বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়া দীর্ঘদিন ধরে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন এবং তাঁর শারীরিক অবস্থা 'সংকটাপন্ন' অবস্থায় রয়েছে। দলের প্রধানের এই অনুপস্থিতি ও শারীরিক দুর্বলতা স্বাভাবিকভাবেই দলের সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড ও রাজনৈতিক কৌশল নির্ধারণে এক বড় শূন্যতা তৈরি করেছে। 

বিএনপি মহাসচিব ঘোষণা দিলেও, দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের দেশে ফিরে আসা পর্যন্ত আসা-না আসা নিয়ে সৃষ্ট জটিলতা কাটবে না। তাঁর বিরুদ্ধে থাকা একাধিক মামলা, জাতীয় পরিচয়পত্র এবং পাসপোর্ট সংক্রান্ত সমস্যা, পাশাপাশি তাঁর জীবনের নিরাপত্তাঝুঁকি এই ফেরার প্রক্রিয়া নিয়ে সন্দেহ সংশয়কে অনিশ্চিত করে তুলেছে। শীর্ষ নেতৃত্বের এমন অনুপস্থিতি কেবল নির্বাচন নয়, বরং পুরো রাজনীতিকে একটি কঠিন পরিস্থিতিতে ফেলেছে। নেতৃত্বের এমন পরিস্থিতি তৃণমূল কর্মী এবং সাধারণ ভোটারদের মধ্যে দ্বিধা ও হতাশা সৃষ্টি করে, যা যেকোনো আন্দোলনের গতিকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করতে পারে এবং নির্বাচনের অংশগ্রহণমূলক চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারে।

নির্বাচনী প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার পরপরই যে সুপরিকল্পিত হামলা শুরু হয়েছে, তা কেবল সাধারণ আইন-শৃঙ্খলার অবনতি নয়, বরং নির্বাচন বানচালের একটি স্পষ্ট ইঙ্গিত। 

ঢাকা ৮ আসনের সম্ভাব্য এমপি প্রার্থী ও জুলাই আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক ওসমান হাদিকে গুলি করে হত্যার চেষ্টা একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। একজন সক্রিয় রাজনৈতিক নেতাকে লক্ষ্য করে এই হামলা সরাসরি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে চ্যালেঞ্জ জানানো এবং বিরোধী মতকে স্তব্ধ করে দেওয়ার চরম প্রচেষ্টা। এই ঘটনা জনমনে এই বার্তা দেয় যে, ভিন্নমতের রাজনীতিকদের কোনো নিরাপত্তা আগেও যেমন ছিল না, এখনও নেই।

তপশিল ঘোষণার পর পরই রাজধানীতে একাধিক স্থানে ককটেল হামলার ঘটনা প্রমাণ করে যে, এই অস্থিরতা কেবল নেতৃত্বের কোন্দল নয়, বরং এটি জনগণের মধ্যে ভীতি ও আতঙ্ক সৃষ্টির একটি কৌশল। এর লক্ষ্য হলো ভোটারদের নিরুৎসাহিত করা এবং নির্বাচনী পরিবেশকে ইচ্ছাকৃতভাবে অস্থিতিশীল করা।

যেহেতু ইতিপূর্বে প্রকাশ্যেই নির্বাচন হতে না দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়েছে, তাই এসব হামলার পেছনে দেশি বা আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র থাকতে পারে এমন আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। সরকারের উচিত নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে মূল হোতা ও ষড়যন্ত্রের দিকটি খতিয়ে দেখা এবং জনগণকে উস্কানি থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানানো।

নির্বাচনকে ঘিরে এই মূহুর্তে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি সামাল দেওয়া সরকারের জন্য প্রধান চ্যালেঞ্জ। 'জুলাই গণআন্দোলনের প্রেক্ষিতে’ সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতা নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জকে আরও জটিল করে তুলেছে। সাম্প্রতিক গণআন্দোলনের প্রেক্ষিতে পুলিশ বাহিনীর মনোবল দুর্বল হয়েছে এবং তাদের নিরপেক্ষতা নিয়ে জনমনে ব্যাপক সংশয় তৈরি হয়েছে।

এমন পরিস্থিতিতে কাঠামোগতভাবে ভেঙেপড়া পুলিশ বাহিনীর পক্ষে পরিস্থিতি সামাল দেয়া কতটা সম্ভব তা নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠেছে আগেই। তাই নিরাপত্তা ঝুঁকি এড়াতে এবং নির্বাচন নির্বিঘ্ন করতে সেনাবাহিনীর উপস্থিতি এখন কেবল একটি বিকল্প নয়, বরং একটি অপরিহার্য চাহিদা।

এই পরিস্থিতিতে কেবল বেসামরিক প্রশাসন দিয়ে জনগণের আস্থা ফেরানো সম্ভব নয়। সেনাবাহিনীকে সাধারণ জনগণ একটি নিরপেক্ষ, সুশৃঙ্খল এবং অরাজনৈতিক শক্তি হিসেবে দেখে। তাদের উপস্থিতি ভোটারদের ভয়মুক্ত করে কেন্দ্রে আসতে উৎসাহিত করবে।

নির্বাচনকালীন সময়ে প্রায়শই প্রশাসন পক্ষপাতিত্বের অভিযোগে অভিযুক্ত হয়। সেনাবাহিনীর উপস্থিতি একটি নিরপেক্ষ তদারকি ব্যবস্থা নিশ্চিত করে এবং সকল দলের জন্য একটি সমান ক্ষেত্র (Level Playing Field) তৈরি করতে সাহায্য করে। সেনাবাহিনীকে বেসামরিক বাহিনীর পরিপূরক হিসেবে নয়, বরং স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসেবে প্রয়োজন।

বড় ধরনের নাশকতা, অস্ত্রধারীদের আক্রমণ এবং বৃহৎ পরিসরের সহিংসতা মোকাবেলা করার জন্য সেনাবাহিনীর বিশেষ প্রশিক্ষণ, উন্নত অস্ত্র এবং সুসংগঠিত কমান্ড কাঠামো অপরিহার্য। বেসামরিক বাহিনী যা নিয়ন্ত্রণ করতে ব্যর্থ হতে পারে, সেনাবাহিনী তা দক্ষতার সাথে সামাল দিতে পারে। কেবল ভোটকেন্দ্র নয়, বিদ্যুৎ কেন্দ্র, যোগাযোগ ব্যবস্থা, সরকারি স্থাপনা এবং সংবেদনশীল এলাকাগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সেনাবাহিনীর দীর্ঘমেয়াদী মোতায়েন জরুরি।

এই অস্থির পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সরকার ও প্রশাসন কিছু দৃশ্যমান পদক্ষেপ নিতে শুরু করেছে। যৌথ বাহিনীর অভিযান এবং ব্যাপক সংখ্যক ব্যক্তিকে আটক করার মতো কঠোর পদক্ষেপের উদ্দেশ্য হলো দ্রুত অপরাধীদের দমন করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা। প্রধান উপদেষ্টার পক্ষ থেকে আসা 'কঠোর বার্তা' সরকারের শূন্য সহনশীলতা (Zero Tolerance) নীতিরই প্রতিফলন, যা নির্দেশ করে যে তারা কোনো ধরনের নাশকতা বা আইনভঙ্গ মেনে নেবে না। সরকার গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা, নির্বাচনী কেন্দ্র এবং রাজনৈতিক সমাবেশগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিশেষ কৌশল (যেমন: টহল বৃদ্ধি, গোয়েন্দা নজরদারি এবং স্ট্রাইকিং ফোর্সের প্রস্তুতি) গ্রহণ করেছে। তবে, এই কঠোরতা যেন নিরপেক্ষতার সাথে বজায় থাকে, তা নিশ্চিত করা অত্যাবশ্যক।

আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা সরকারের জন্য তাৎক্ষণিক চ্যালেঞ্জ হলেও, দীর্ঘমেয়াদী সমাধানে রাজনৈতিক ঐক্যের বিকল্প নেই। নির্বাচনী প্রক্রিয়াকে অর্থবহ ও অংশগ্রহণমূলক করতে হলে, কেবল বলপ্রয়োগ নয়, বরং সংলাপ ও আস্থার পরিবেশ তৈরি করা জরুরি। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অনাস্থা দূর না হলে সহিংসতা থামানো সম্ভব নয়।

চলমান অস্থিরতা এবং একনায়কতান্ত্রিক প্রবণতা থেকে গণতন্ত্রকে রক্ষা করতে হলে ফ্যাসিবাদ-বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে বৃহত্তর ঐক্য প্রতিষ্ঠা করা সময়ের দাবি। এই ঐক্য জনগণের মৌলিক অধিকার ও ভোটের অধিকার নিশ্চিত করার জন্য একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক ভিত্তি তৈরি করবে। 

ফেব্রুয়ারির নির্বাচনকে সামনে রেখে সরকার প্রশাসনিকভাবে প্রস্তুত বলে মনে হচ্ছে, সামরিক বাহিনীর অংশগ্রহণ জনগণের আস্থা ফেরাতে সহায়ক। তবে, প্রধান প্রতিদ্বন্ধি দলগুলোর নেতৃত্ব সংকট, নির্বাচন বানচালের সহিংস প্রচেষ্টা এবং দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অনাস্থা সব মিলিয়ে এক জটিল সমীকরণ তৈরি করেছে।

এই নির্বাচনকে সফল করতে হলে, প্রশাসনকে অবশ্যই তার নিরপেক্ষতা বজায় রাখতে হবে এবং সকল নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। শুধু দমন-পীড়ন নয়, বরং সংলাপ ও রাজনৈতিক ঐক্যের মাধ্যমে পরিবেশ শান্ত করাই হবে একটি সফল, অংশগ্রহণমূলক এবং আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের চাবিকাঠি। সরকারকে অবশ্যই এই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় আরও বেশি কৌশলগত, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং দূরদর্শী হতে হবে।

সাংবাদিক, লেখক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক।

Link copied!