ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

গিলাফ ছাড়া কাবা শরিফ দেখতে কেমন

রূপালী প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ডিসেম্বর ২২, ২০২৫, ০৭:৫২ পিএম
১৯৪০ সালে, কাবার কিসওয়া দিয়ে সাজানোর আগে এর লাল ইটের বাইরের অংশের একটি বিরল ছবি তোলা হয়েছিল। ছবি- সংগৃহীত

মক্কার কাবা ঘরের আচ্ছাদন তথা মুখোশ—যা কিসওয়া নামেও পরিচিত—ইসলামি ঐতিহ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক। প্রতি বছর হিজরি ক্যালেন্ডারের জিলহজ মাসের ৯ তারিখে কাবার কিসওয়া পরিবর্তন করা হয়। এটি শুধু একটি আচ্ছাদন নয়, বরং ইসলামি ইতিহাস, ঐতিহ্য এবং সৌন্দর্যের এক অমর প্রতীক। কিসওয়া প্রতিস্থাপনের সময়, পুরাতন কিসওয়া সরিয়ে নতুনটি স্থাপন করা হয়, যা আছরের নামাজ পর্যন্ত চলে। পরে পুরাতন কিসওয়া নিরাপদে সংরক্ষণে কারখানায় ফেরানো হয়।

সৌদি আরবের পবিত্র কাবার কিসওয়াহ কারখানা ২৪০ জনেরও বেশি কর্মী এবং প্রশাসনিক কর্মী নিয়ে পরিচালিত হয়। এখানে বিশেষায়িত যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে কিসওয়া তৈরির প্রতিটি ধাপ সম্পন্ন হয়। বিশ্বের বৃহত্তম ১৬ মিটার উচ্চতার সেলাই মেশিন, উন্নত জ্যাকার্ড মেশিন এবং অন্যান্য সহায়ক বিভাগ যেমন পরীক্ষাগার, প্রশাসনিক সেবা ও স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা এই কারখানার অংশ।

কিসওয়া তৈরির জন্য ব্যবহৃত হয় প্রায় ৬৭০ কেজি খাঁটি রেশম, এর মধ্যে রয়েছে ১০ কেজি সোনা ও রুপা মিশ্রিত সুতা। এটি মোট ৪৭টি রোল দিয়ে তৈরি হয়, প্রতিটির দৈর্ঘ্য ১৪ মিটার এবং প্রস্থ ৯৫ সেন্টিমিটার। বেল্টের নিচে কুরআনের আয়াত লেখা থাকে, যা সূক্ষ্ম সূচিকর্মে সোনা ও রুপা দিয়ে সজ্জিত করা হয়।

ইতিহাস অনুযায়ী, নবি মুহাম্মদ (সা.) এবং তাঁর সাহাবিরা প্রথম কাবা ঢেকে রাখার প্রথা শুরু করেন। নবম হিজরিতে মক্কা বিজয়ের পর নবি তাঁর বিদায়ী হজে ইয়েমেনি কাপড় ব্যবহার করে কাবাকে ঢেকে দিয়েছিলেন। এরপর আবু বকর, উমর, উসমান (র.) ও অন্যান্য খলিফারা এটি বিভিন্ন রঙের কাপড় দিয়ে ঢেকে রাখতেন।

আব্বাসীয় যুগে কাবার কিসওয়া প্রায় সবসময় কালো ব্রোকেড করা হত। মক্কার ইতিহাস কেন্দ্রের পরিচালক ড. ফাওয়াজ আল-দাহাস জানান, বিভিন্ন যুগে কাবার আচ্ছাদনের রং মূলত আর্থিক সামর্থ্য ও কাপড়ের প্রাপ্যতার ওপর নির্ভর করত। সাদা ও লাল রঙের কিসওয়া ব্যবহার করা হতো, তবে কালো রং দীর্ঘস্থায়ী হওয়ায় এটি টেকসই ও দর্শনার্থীদের স্পর্শ সহ্য করতে সক্ষম ছিল।

সৌদি যুগে কিসওয়া তৈরির কাজ আরও আধুনিক আকার গ্রহণ করে। সৌদি বাদশাহ আব্দুল আজিজ প্রথমবার মক্কায় কিসওয়া তৈরির কারখানা স্থাপন করেন। বর্তমানে এটি কাবার কিসওয়ার জন্য কিং আব্দুল আজিজ কমপ্লেক্স নামে পরিচিত। এখানে ব্যবহৃত প্রযুক্তি অত্যাধুনিক। রেশম ধোয়া ও রঞ্জন প্রক্রিয়ায় কালো ও সবুজ রং প্রয়োগ করা হয়। জ্যাকার্ড মেশিনে বোনা হয় কুরআনের আয়াত, এরপর সূচিকর্মের মাধ্যমে সোনা ও রূপা দিয়ে মোটিফ ও আয়াত প্রিন্ট করা হয়। কাবার বেল্ট, কোনা এবং দরজার আচ্ছাদন সম্পন্ন হয় ১৬টি বিশেষ টুকরোতে ভাগ করে।

প্রতিটি কিসওয়া তৈরিতে ১০ মাসের কঠোর পরিশ্রম লাগে এবং এর খরচ প্রায় ২২ মিলিয়ন রিয়াল। মেশিন টেক্সটাইল এবং সূচিকর্ম বিশেষজ্ঞরা মিলে প্রতিটি সুতা ও কাপড়ের মান পরীক্ষা করে, যাতে কিসওয়া দীর্ঘস্থায়ী ও দৃঢ় হয়। কিসওয়া তৈরি প্রক্রিয়ায় প্রতিটি ধাপেই ইসলামি ঐতিহ্য এবং সৌন্দর্যের মিশ্রণ লক্ষ করা যায়

কাবার আচ্ছাদনের ইতিহাসে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ যে, নবি মুহাম্মদ (সা.) কাবাকে ইয়েমেনি কাপড় দিয়ে ঢেকে রাখার পর থেকে বিভিন্ন যুগে মুসলিম শাসকরা এটি আরও সৌন্দর্যমণ্ডিত ও টেকসই করার জন্য কাজ চালিয়েছেন। প্রাক-ইসলামিক যুগেও কাবাকে ঢেকে রাখার প্রথা শুরু হয়েছিল। ইয়েমেনের রাজা তুব্বা আল-হুমাইরির সময় কাবাকে মোটা কাপড় দিয়ে ঢেকে রাখা হতো, পরে এটি মাফির, মিলা এবং ওয়াসায়েলসহ বিভিন্ন স্তরে আচ্ছাদিত হতো।