ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

ওয়াদা রক্ষা ও ভঙ্গ: ইসলামের দৃষ্টিতে পুরস্কার ও শাস্তি

রূপালী প্রতিবেদক
প্রকাশিত: এপ্রিল ১, ২০২৬, ১১:৪৮ এএম
ওয়াদা রক্ষার পুরস্কার ও ভঙ্গের ভয়াবহ শাস্তি। ছবি : সংগৃহীত

ইসলামি শরিয়তে ওয়াদা রক্ষা বা প্রতিশ্রুতি পালন করা কেবল একটি নৈতিক গুণ নয়, বরং এটি ঈমানের অন্যতম দাবি। মানবচরিত্রের ভূষণ হলো সত্যবাদিতা ও প্রতিশ্রুতি রক্ষা। ইসলামি জীবনদর্শনে ওয়াদা রক্ষা করাকে মুমিনের অপরিহার্য বৈশিষ্ট্য এবং ওয়াদা ভঙ্গ করাকে মোনাফেকির লক্ষণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় জীবনে বিশৃঙ্খলা রোধে ইসলামের এই বিধান অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী।

ওয়াদা রক্ষার গুরুত্ব: কুরআনের নির্দেশনা
আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে মুমিনদের প্রতিশ্রুতি পালনের ব্যাপারে কঠোর নির্দেশ দিয়েছেন। সূরা আল-ইসরা’র ৩৪ নম্বর আয়াতে ইরশাদ হয়েছে: “আর তোমরা প্রতিশ্রুতি পালন করো। নিশ্চয়ই প্রতিশ্রুতি সম্পর্কে (কিয়ামতের দিন) কৈফিয়ত তলব করা হবে।” অন্যত্র সফল মুমিনদের পরিচয় দিতে গিয়ে আল্লাহ বলেন, “আর যারা নিজেদের আমানত ও অঙ্গীকার রক্ষা করে।” (সূরা মুমিনুন, আয়াত: ৮)

ওয়াদা রক্ষার পুরস্কার ও ফজিলত
ওয়াদা পালনকারীর জন্য ইসলামে ইহকাল ও পরকালে বিশেষ পুরস্কারের ঘোষণা রয়েছে:
১. আল্লাহর ভালোবাসা লাভ: যারা ওয়াদা রক্ষা করে, আল্লাহ তাদের ভালোবাসেন। এটি তাকওয়ার বহিঃপ্রকাশ।
২. জান্নাতের নিশ্চয়তা: রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “তোমরা যদি আমাকে ছয়টি বিষয়ের নিশ্চয়তা দাও, তবে আমি তোমাদের জান্নাতের নিশ্চয়তা দেব। তার মধ্যে একটি হলো— ওয়াদা করলে তা পূর্ণ করা।” (মুসনাদে আহমাদ)
৩. নবিদের আদর্শ: সব নবি-রাসুলই ছিলেন পরম ওয়াদা রক্ষাকারী। বিশেষ করে হযরত ইসমাইল (আ.)-এর ব্যাপারে কুরআনে বলা হয়েছে, “তিনি ছিলেন প্রতিশ্রুতি পালনে সত্যনিষ্ঠ।” (সূরা মারিয়াম, আয়াত: ৫৪)

ওয়াদা ভঙ্গের শাস্তি ও ভয়াবহতা
ইসলামে ওয়াদা ভঙ্গ করাকে অত্যন্ত ঘৃণিত কাজ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। এর পরিণাম অত্যন্ত ভয়াবহ:

মুনাফিকের আলামত: হাদিস শরিফে এসেছে, “মুনাফিকের চিহ্ন তিনটি— যখন কথা বলে মিথ্যা বলে, যখন ওয়াদা করে তা ভঙ্গ করে এবং যখন তার কাছে আমানত রাখা হয় তা খেয়ানত করে।” (বুখারি ও মুসলিম)

আল্লাহর লানত বা অভিশাপ: যারা ওয়াদা ভঙ্গ করে, তাদের ওপর আল্লাহর লানত বর্ষিত হয়। সূরা আর-রা’দ-এ বলা হয়েছে, যারা আল্লাহর অঙ্গীকার দৃঢ় করার পর তা ভঙ্গ করে, তাদের জন্য রয়েছে লানত এবং মন্দ আবাস।

কিয়ামতের দিন অপমান: রাসুলুল্লাহ (সা.) এরশাদ করেছেন, “কিয়ামতের দিন প্রত্যেক ওয়াদা ভঙ্গকারীর জন্য একটি করে পতাকা উত্তোলন করা হবে এবং ঘোষণা করা হবে যে, এটি অমুকের পুত্র অমুকের প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের নিদর্শন।” (মুসলিম)

কখন ওয়াদা ভঙ্গ করা যায়?
ইসলামি বিধান অনুযায়ী, যদি কেউ এমন কোনো কাজের ওয়াদা করে যা শরিয়ত বিরোধী বা গুনাহের কাজ, তবে সেই ওয়াদা ভঙ্গ করা ওয়াজিব। এছাড়া কোনো অনিবার্য বা নিয়ন্ত্রণহীন কারণে ওয়াদা রক্ষা করতে না পারলে দ্রুত ক্ষমা চেয়ে নেওয়া এবং অপারগতা প্রকাশ করা জরুরি।

ব্যক্তিগত সম্পর্ক থেকে শুরু করে ব্যবসায়িক লেনদেন ও রাষ্ট্রীয় চুক্তি— সব ক্ষেত্রেই ওয়াদা রক্ষা করা ইবাদতের শামিল। একটি সুন্দর ও আস্থাশীল সমাজ গঠনে ইসলামের এই মহান শিক্ষার কোনো বিকল্প নেই। আল্লাহ আমাদের সবাইকে প্রতিশ্রুতি রক্ষাকারী হিসেবে কবুল করুন।