ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

যেভাবে ইরানের গণতন্ত্র ধ্বংস করেছিল আমেরিকা ও ব্রিটেন

রূপালী প্রতিবেদক
প্রকাশিত: জানুয়ারি ১৩, ২০২৬, ০৮:৪১ পিএম
১৯৫৩ সালের আগস্টে ইরানের রাজধানী তেহরানে ছড়িয়ে পড়ে একটি সরকারবিরোধী বিক্ষোভ, যার মূল ক্রীড়নক ছিল মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ। ছবি: সংগৃহীত

মধ্যপ্রাচ্যের দেশ ইরান যখনই কোনো রাজনৈতিক সংকটে পড়ে তখন পশ্চিমা দেশগুলো, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যকে গণতন্ত্রের জন্য সবচেয়ে বেশি উচ্চকণ্ঠ হতে দেখা যায়। এমনকি গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের দোহাই দিয়ে তারা প্রায়ই অর্থনৈতিক অবরোধ বা যুদ্ধের হুমকি দেয়। কিন্তু ইতিহাসের পাতা উল্টালে দেখা যায় এক চরম পরিহাস— আজ যারা ইরানের গণতন্ত্র নিয়ে বিলাপ করছে তারাই সাত দশক আগে নিজেদের স্বার্থে দেশটির উদীয়মান গণতন্ত্রকে গলা টিপে হত্যা করেছিল। এই ষড়যন্ত্রের নাম ছিল ‘অপারেশন আইজ্যাক্স’।

মোসাদ্দেক যুগ ও জাতীয়তাবাদের উত্থান ১৯৫০-এর দশকের শুরুতে ইরান মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর মধ্যে গণতন্ত্রের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে উঠেছিল। ১৯৫১ সালে জনপ্রিয় নেতা মোহাম্মদ মোসাদ্দেক গণতান্ত্রিকভাবে প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন। তিনি ছিলেন আধুনিক ও দেশপ্রেমিক। ক্ষমতা গ্রহণের পর তিনি ইরানের জাতীয় সম্পদ— ‘তেল শিল্প’র ওপর জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেন। তৎকালীন ব্রিটিশ মালিকানাধীন ‘অ্যাংলো-ইরানিয়ান অয়েল কোম্পানি’ (বর্তমানে যা বিপি নামে পরিচিত) দীর্ঘকাল ধরে ইরানের সম্পদ লুটে নিচ্ছিল। মোসাদ্দেক তেল সম্পদ জাতীয়করণ করে সেই শোষণের অবসান ঘটান।

এর ফলে ব্রিটিশরা তাদের মুনাফা হারানোর ভয়ে ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে এবং যুক্তরাষ্ট্রকে সঙ্গে নিয়ে ষড়যন্ত্র শুরু করে। দীর্ঘ ৬০ বছর গোপনীয়তা বজায় রাখার পর, ২০১৩ সালের ১৯ আগস্ট সিআইএ’র নিজস্ব ওয়েবসাইটের আর্কাইভে (CIA FOIA Archive) অবমুক্ত করা নথিতে এই ষড়যন্ত্রের কথা আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার করা হয়। 

সিআইএ’র ওই সময়কার নথিতে সরাসরি উল্লেখ করা হয়েছে, ‘সামরিক অভ্যুত্থানটি মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ’র নির্দেশনায় মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে পরিচালিত হয়েছিল।’

যুক্তরাজ্যের প্রভাবশালী গণমাধ্যম ‘দ্য গার্ডিয়ান’ ২০১৩ সালের ২০ আগস্ট প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে জানায় যে, কীভাবে ব্রিটিশ গোয়েন্দা সংস্থা MI6 এবং সিআইএ মিলে ইরানের সংবাদমাধ্যমগুলোকে অর্থের বিনিময়ে হাত করেছিল। 

গার্ডিয়ানের ওই প্রতিবেদন অনুযায়ী, মোসাদ্দেকের বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তুলতে তৎকালীন গোয়েন্দারা বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় করে ভাড়াটে দাঙ্গাবাজ রাস্তায় নামিয়েছিল।

ঐতিহাসিক তথ্য অনুযায়ী, ১৯৫৩ সালের ১৯ আগস্ট এক রক্তক্ষয়ী অভ্যুত্থানের মাধ্যমে মোসাদ্দেককে ক্ষমতাচ্যুত করে কারারুদ্ধ করা হয়। এর ফলে ধ্বংস হয়ে যায় একটি সম্ভাবনাময় গণতান্ত্রিক সরকার। এরপর পশ্চিমারা তাদের অনুগত শাসক শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভীকে ক্ষমতায় বসায়। শাহর পরবর্তী ২৫ বছরের শাসনামলে ইরানে কোনো কার্যকর গণতন্ত্র ছিল না। ভিন্নমতাবলম্বীদের দমনের জন্য তৈরি হয়েছিল কুখ্যাত গোপন পুলিশ বাহিনী ‘সাভাক’।

২০০০ সালে তৎকালীন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মেডেলিন অলব্রাইট এবং ২০০৯ সালে সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা তাদের বক্তব্যে স্বীকার করেছিলেন যে, মোসাদ্দেককে হঠাতে যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ ছিল ইরানের জন্য একটি বড় ধাক্কা।

আজকে ইরানের যে কট্টরপন্থি শাসন চলছে তার বীজ বপন করে দিয়েছিল ১৯৫৩ সালের সেই অভ্যুত্থানই। শাহের স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে জমে থাকা ক্ষোভই শেষ পর্যন্ত ১৯৭৯ সালে ইসলামিক বিপ্লবের পথ প্রশস্ত করে। ফলে আজ যখন ওয়াশিংটন বা লন্ডন থেকে ইরানের গণতন্ত্র নিয়ে নসিহত আসে, তখন সাধারণ ইরানিদের কাছে তা স্রেফ ঐতিহাসিক ‘ভণ্ডামি’ বা ‘দ্বিচারিতা’ ছাড়া আর কিছু মনে হয় না। 

সূত্র: সিআইএ নথি, দ্য গার্ডিয়ান, আল জাজিরা ও বিবিসি