দীর্ঘ প্রায় সাত বছরের বিরতির পর উত্তর কোরিয়া সফরে যাচ্ছেন চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। সোমবার পিয়ংইয়ংয়ে উত্তর কোরিয়ার সর্বোচ্চ নেতা কিম জং উনের সঙ্গে তার বৈঠককে ঘিরে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। পর্যবেক্ষকদের মতে, এই সফর কেবল দুই নেতার আনুষ্ঠানিক সাক্ষাৎ নয়; বরং পূর্ব এশিয়ার পরিবর্তিত ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় চীনের অবস্থান আরও দৃঢ় করার একটি কৌশলগত উদ্যোগ।
এর আগে ২০১৯ সালে সর্বশেষ উত্তর কোরিয়া সফর করেছিলেন শি জিনপিং। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিদেশ সফর উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে দেওয়ায় তার এই সফর বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। সাধারণত বিদেশি নেতারাই বেইজিংয়ে গিয়ে চীনা প্রেসিডেন্টের সঙ্গে বৈঠক করেন। ফলে শির পিয়ংইয়ং যাত্রা বিষয়টির প্রতি বেইজিংয়ের বিশেষ মনোযোগের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
বিশ্লেষকদের ধারণা, রাশিয়া ও উত্তর কোরিয়ার ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের দ্রুত অগ্রগতি চীনের জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে। ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর থেকে পিয়ংইয়ং মস্কোকে অস্ত্র, গোলাবারুদ এবং জনবল সহায়তা দিয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এর বিপরীতে রাশিয়ার কাছ থেকে আর্থিক সুবিধার পাশাপাশি সামরিক প্রযুক্তিগত সহযোগিতাও পেয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
দক্ষিণ কোরিয়ার একটি নিরাপত্তা গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সাম্প্রতিক মূল্যায়নে বলা হয়েছে, ২০২৩ সাল থেকে রাশিয়া উত্তর কোরিয়াকে প্রায় ১৪.৪ বিলিয়ন ডলারের সমপরিমাণ সহায়তা দিয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এর একটি বড় অংশ উন্নত সামরিক প্রযুক্তি ও গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশের মাধ্যমে সরবরাহ করা হয়ে থাকতে পারে।
চীনের আশঙ্কা, রাশিয়ার সঙ্গে উত্তর কোরিয়ার সম্পর্ক আরও গভীর হলে দেশটিতে বেইজিংয়ের ঐতিহ্যগত প্রভাব দুর্বল হতে পারে। তাই শি জিনপিংয়ের এই সফরের মাধ্যমে দুই দেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক নতুন করে শক্তিশালী করার প্রচেষ্টা দেখা যেতে পারে।
একই সময়ে উত্তর কোরিয়ার সামরিক সক্ষমতার দ্রুত উন্নয়নও চীনের নজরে রয়েছে। চলতি বছর দেশটি একাধিক ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা চালিয়েছে। সম্প্রতি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তিনির্ভর একটি নতুন ট্যাকটিক্যাল ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রও উন্মোচন করেছে তারা। পাশাপাশি কিম জং উন একটি নতুন পারমাণবিক উপাদান উৎপাদন কেন্দ্র পরিদর্শন করেছেন, যা দেশটির পারমাণবিক কর্মসূচি আরও সম্প্রসারণে ভূমিকা রাখবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
কোরীয় উপদ্বীপের অস্থির নিরাপত্তা পরিস্থিতিও এই সফরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রেক্ষাপট। ১৯৫০ সালের কোরিয়া যুদ্ধের অবসান হলেও উত্তর ও দক্ষিণ কোরিয়ার মধ্যে এখনো আনুষ্ঠানিক শান্তিচুক্তি হয়নি। গত বছর কিম জং উন কোরীয় পুনঃএকত্রীকরণের নীতি থেকে সরে আসার ঘোষণা দেওয়ার পর দুই দেশের সম্পর্ক আরও উত্তেজনাপূর্ণ হয়ে ওঠে।
দক্ষিণ কোরিয়া আশা করছে, শি জিনপিংয়ের এই সফর আঞ্চলিক উত্তেজনা কমাতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, শি ও কিমের আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে ভবিষ্যতে সম্ভাব্য সংলাপের বিষয়ও স্থান পেতে পারে।
এদিকে পূর্ব এশিয়ায় নিরাপত্তা সমীকরণ আরও জটিল করে তুলেছে দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানের সম্ভাব্য সামরিক ও লজিস্টিক সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা। জাপানের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং সিউল-টোকিওর ক্রমবর্ধমান ঘনিষ্ঠতাও চীনের কৌশলগত হিসাব-নিকাশে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
সবকিছু মিলিয়ে, শি জিনপিংয়ের উত্তর কোরিয়া সফরকে শুধু দ্বিপাক্ষিক কূটনৈতিক কর্মসূচি হিসেবে দেখা হচ্ছে না। বরং রাশিয়ার বাড়তে থাকা প্রভাব, উত্তর কোরিয়ার সামরিক অগ্রগতি এবং পূর্ব এশিয়ার নতুন ভূরাজনৈতিক বাস্তবতার মধ্যে চীনের স্বার্থ ও প্রভাব বজায় রাখার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবেই এটিকে মূল্যায়ন করছেন বিশ্লেষকরা।
সূত্র: আল জাজিরা

