ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে স্বাক্ষরিত সিন্ধু জল চুক্তি (আইডব্লিউটি) একতরফাভাবে বাতিল বা পরিবর্তন করা যাবে না বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন পাকিস্তানের তথ্যমন্ত্রী আতাউল্লাহ তারার। তিনি বলেছেন, কার্যকর থাকা এই ‘আইনত বলবৎযোগ্য চুক্তি’ অনুযায়ী পাকিস্তানের জনগণের সিন্ধু নদীর পানির ওপর অধিকার রয়েছে।
সোমবার (২৯ জুন) ইসলামাবাদে জলবায়ু পরিবর্তনমন্ত্রী মুসাদিক মালিককে সঙ্গে নিয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে এ কথা বলেন তিনি।
তারারের এই বক্তব্য এমন এক সময়ে এসেছে, যখন ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে পানি ও সিন্ধু জল চুক্তি নিয়ে উত্তেজনা চলছে। ২০২৫ সালের মে মাসে দুই দেশের মধ্যে স্বল্পমেয়াদি সামরিক উত্তেজনার পর ভারত একতরফাভাবে চুক্তির কার্যক্রম স্থগিত করার ঘোষণা দেয়। এর পর থেকেই বিষয়টি নিয়ে বিরোধ তীব্র হয়েছে।
সম্প্রতি ভারতের পানিসম্পদমন্ত্রী সি আর পাটিল বলেছেন, ভারত এমনভাবে কাজ করছে যাতে ‘এক ফোঁটা পানিও’ পাকিস্তানে না যায়। অন্যদিকে পাকিস্তান জানিয়েছে, আন্তঃসীমান্ত নদীর পানির প্রবাহ পরিবর্তনের যেকোনো চেষ্টা ‘যুদ্ধাপরাধ’ হিসেবে বিবেচিত হবে।
সংবাদ সম্মেলনে আতাউল্লাহ তারার বলেন, ‘বিশ্ব স্বীকার করেছে যে পাকিস্তানের জন্য পানি নিরাপত্তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং এর ওপর দেশটির অধিকার রয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘আইনগতভাবে পাকিস্তানের অবস্থান আন্তর্জাতিক সমর্থন পেয়েছে, কারণ সিন্ধু জল চুক্তি একতরফাভাবে প্রত্যাহার, বাতিল বা সংশোধন করা যায় না।’
তারারের ভাষ্য, চুক্তিটি একটি সুস্পষ্ট কাঠামো তৈরি করেছে, যা এখনো কার্যকর রয়েছে এবং মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়িত হচ্ছে।
তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরীফ এবং সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির একাধিকবার বলেছেন, ‘পানি আমাদের জীবনরেখা এবং একই সঙ্গে আমাদের রেড লাইন।’
পাকিস্তানের তথ্যমন্ত্রী বলেন, ‘আমাদের জনগণের পানির অধিকার একটি আইনত কার্যকর চুক্তির মাধ্যমে নিশ্চিত হয়েছে, যা উভয় দেশ স্বীকৃতি দিয়েছে এবং এখনো বাস্তবায়িত হচ্ছে।’
তিনি দাবি করেন, সিন্ধু জল চুক্তির বিষয়ে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফোরামে পাকিস্তানের অবস্থান গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে।
তিনি জানান, মঙ্গলবার (৩০ জুন) ইসলামাবাদে একটি সেমিনার অনুষ্ঠিত হবে, যেখানে পানি ও আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞরা অংশ নেবেন এবং চুক্তির অধীনে পাকিস্তানের অধিকার নিয়ে আলোচনা করবেন।
সিন্ধু জল চুক্তির ইতিহাস
১৯৬০ সালে বিশ্বব্যাংকের মধ্যস্থতায় ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে সিন্ধু জল চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এই চুক্তি অনুযায়ী, সিন্ধু নদী ব্যবস্থার পানি বণ্টন নির্ধারণ করা হয়।
চুক্তি অনুযায়ী, পূর্বাঞ্চলের নদী—রাভি, বিয়াস ও শতদ্রু (সুতলজ)—ভারতের জন্য বরাদ্দ করা হয়। আর পশ্চিমাঞ্চলের নদী—সিন্ধু, ঝিলম ও চেনাব—এর অধিকাংশ পানি পাকিস্তানের ব্যবহারের জন্য নির্ধারিত হয়।
দুই দেশের মধ্যে যুদ্ধ ও রাজনৈতিক উত্তেজনা থাকা সত্ত্বেও দীর্ঘদিন ধরে এই চুক্তি টিকে ছিল এবং এটি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আন্তঃসীমান্ত পানি চুক্তি হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে।
তবে ২০২৫ সালে ভারত চুক্তির কার্যক্রম স্থগিত রাখার ঘোষণা দেওয়ার পর এটি নতুন সংকটে পড়ে।
২০২৫ সালের জুনে পার্মানেন্ট কোর্ট অব আরবিট্রেশন (পিসিএ) জানায়, ভারত একতরফাভাবে সিন্ধু জল চুক্তি স্থগিত রাখতে পারে না।
ভারত অবশ্য জানিয়েছে, পাকিস্তান আন্তঃসীমান্ত সন্ত্রাসবাদে কথিত সমর্থন বন্ধ না করা পর্যন্ত তারা চুক্তি স্থগিত রাখার অবস্থানে থাকবে। পাকিস্তান এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
সম্প্রতি পাকিস্তান দাবি করেছে, পিসিএর আরেকটি সম্পূরক সিদ্ধান্ত তাদের অবস্থানকে সমর্থন করেছে এবং পশ্চিমাঞ্চলের নদীগুলোর ওপর ভারতের পানি নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতার সীমাবদ্ধতা নির্ধারণ করেছে।
এই বিরোধের কেন্দ্রে রয়েছে ভারতের কিষেনগঙ্গা ও রাতলে জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের নকশা এবং জলাধারের সর্বোচ্চ ধারণক্ষমতা সংক্রান্ত বিষয়।
চেনাব-বিয়াস প্রকল্প নিয়ে বিরোধ
সম্প্রতি ভারতের চেনাব নদীর পানি বিয়াস নদীর অববাহিকায় নেওয়ার পরিকল্পনা নিয়েও পাকিস্তান আপত্তি জানিয়েছে।
পাকিস্তানের পররাষ্ট্র দপ্তরের মুখপাত্র তাহির আন্দ্রাবি বলেছেন, চেনাব থেকে বিয়াসে পানি স্থানান্তরের এই ধরনের আন্তঃঅববাহিকা প্রকল্প সিন্ধু জল চুক্তি এবং আন্তর্জাতিক জল আইনের গুরুতর লঙ্ঘন।
তিনি বলেন, ‘চেনাবের পানি বিয়াস ব্যবস্থায় স্থানান্তর শুধু সিন্ধু জল চুক্তির নয়, বরং আন্তর্জাতিক পানি আইন ও চুক্তি আইনের মূলনীতিরও লঙ্ঘন।’
তিনি আরও উল্লেখ করেন, এ ধরনের পদক্ষেপ ১৯৭৭ সালের জাতিসংঘ জলধারা কনভেনশনে প্রতিফলিত আন্তর্জাতিক নীতির বিরোধী।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন