মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে জন্মগ্রহণকারী প্রায় সব শিশুর জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব পাওয়ার সাংবিধানিক অধিকার বহাল রেখেছে দেশটির সুপ্রিম কোর্ট। এর ফলে যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে জন্ম নেওয়া ব্যক্তিদের নাগরিকত্বের দীর্ঘদিনের সাংবিধানিক ব্যাখ্যা অপরিবর্তিত থাকল এবং প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের এ নীতি পরিবর্তনের উদ্যোগ কার্যকর হলো না।
আদালত ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের প্রথম দিন জারি করা নির্বাহী আদেশকে অবৈধ ঘোষণা করেছে। ওই আদেশে বলা হয়েছিল, অবৈধভাবে যুক্তরাষ্ট্রে থাকা অভিবাসী কিংবা সাময়িক ভিসায় অবস্থানরত বিদেশিদের সন্তানরা আর জন্মসূত্রে স্বয়ংক্রিয়ভাবে মার্কিন নাগরিকত্ব পাবে না।
এটি চলতি বছরে ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য সুপ্রিম কোর্টের দ্বিতীয় বড় ধাক্কা হিসেবে দেখা হচ্ছে। এর আগে ফেব্রুয়ারিতে আদালত বিশ্বব্যাপী আমদানির ওপর ট্রাম্প প্রশাসনের আরোপিত বিস্তৃত শুল্কনীতিও বাতিল করে দিয়েছিল।
সাম্প্রতিক রায়ে প্রধান বিচারপতি জন রবার্টস, বিচারপতি অ্যামি কোনি ব্যারেট এবং তিনজন উদারপন্থী বিচারপতিসহ মোট পাঁচ বিচারপতি মত দেন যে মার্কিন সংবিধান জন্মসূত্রে নাগরিকত্বের নিশ্চয়তা প্রদান করে। অন্যদিকে বিচারপতি ব্রেট কাভানো সাংবিধানিক ব্যাখ্যায় ভিন্ন অবস্থান নিলেও ট্রাম্পের নির্বাহী আদেশকে ফেডারেল আইনের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ বলে অবৈধ ঘোষণা করার পক্ষে মত দেন।
রায়ে প্রধান বিচারপতি রবার্টস ট্রাম্প প্রশাসনের সেই যুক্তি প্রত্যাখ্যান করেন, যেখানে দাবি করা হয়েছিল যে জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব কেবল স্থায়ী বাসিন্দা বা যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্যশীল ব্যক্তিদের সন্তানদের জন্য প্রযোজ্য। রবার্টস বলেন, কংগ্রেস যদি নাগরিকত্বের পরিধি সীমিত করতে চাইত, তবে সংবিধানের ভাষাতেই তা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হতো।
মামলার শুনানির সময় থেকেই ট্রাম্প নিজের পরাজয়ের সম্ভাবনা উপলব্ধি করেছিলেন বলে ধারণা করা হয়। গত এপ্রিল তিনি সুপ্রিম কোর্টে মৌখিক শুনানিতে সরাসরি উপস্থিত হন, যা ক্ষমতাসীন কোনো মার্কিন প্রেসিডেন্টের ক্ষেত্রে বিরল ঘটনা। শুনানির পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আদালতের সমালোচনা করলেও পরে তিনি স্বীকার করেছিলেন যে মামলায় হেরে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
রায় ঘোষণার পর ট্রাম্প তার নিজস্ব সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যাল-এ ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তিনি অভিযোগ করেন, দেশের রাজনৈতিক ব্যবস্থার মতো বিচারব্যবস্থাও পক্ষপাতদুষ্ট এবং এই পরিস্থিতির বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যাওয়ার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন।
ট্রাম্প ও তার সমর্থকদের দাবি ছিল, জন্মসূত্রে নাগরিকত্বের বর্তমান ব্যবস্থা অবৈধ অভিবাসনকে উৎসাহিত করে। তাদের মতে, অনেক অভিবাসী এই আশায় যুক্তরাষ্ট্রে আসে যে সেখানে জন্ম নেওয়া সন্তান ভবিষ্যতে নাগরিকত্বের সুবিধা পাবে। রিপাবলিকানদের একটি অংশ আরও অভিযোগ করেছে, এ কারণে তথাকথিত ‘বার্থ ট্যুরিজম’ বেড়েছে, যা জাতীয় নিরাপত্তার জন্যও উদ্বেগের বিষয়। বিচারপতি ক্লারেন্স থমাস ও নিল গোরসুচ ট্রাম্পের অবস্থানের সঙ্গে একমত হয়ে ভিন্নমত দেন। পৃথক মতামতে বিচারপতি স্যামুয়েল অ্যালিটো বলেন, বিষয়টি সংবিধানের চতুর্দশ সংশোধনীর ব্যাখ্যার মাধ্যমে কংগ্রেসের সিদ্ধান্তের ওপর ছেড়ে দেওয়া উচিত ছিল।
অন্যদিকে সমালোচকদের মতে, জন্মসূত্রে নাগরিকত্বের নীতি প্রায় ১৩০ বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্রের সাংবিধানিক কাঠামো ও সামাজিক ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এটি বাতিল হলে প্রতিটি নবজাতকের বাবা-মায়ের অভিবাসন ও আইনি অবস্থান যাচাই করতে গিয়ে প্রশাসনকে জটিল ও ব্যয়বহুল প্রক্রিয়ার মুখে পড়তে হতো। আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, ট্রাম্পের প্রস্তাব কার্যকর হলে শুধু নতুন জন্ম নেওয়া শিশুই নয়, দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসকারী বহু মানুষের নাগরিকত্বের আইনি অবস্থান নিয়েও ব্যাপক অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা ছিল।
সূত্র: সিএনএন


সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন