পুনর্ব্যবহারযোগ্য রকেট প্রযুক্তিতে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের আধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে চীন সমুদ্রভিত্তিক একটি নতুন রকেট বুস্টার পুনরুদ্ধার ব্যবস্থার সফল পরীক্ষা চালিয়েছে। শুক্রবার (১০ জুলাই) পরিচালিত এ পরীক্ষাকে দেশটির পুনর্ব্যবহারযোগ্য মহাকাশ প্রযুক্তির উন্নয়নে একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে দেখা হচ্ছে।
রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম সিসিটিভির তথ্য অনুযায়ী, লং মার্চ–১০বি রকেটটি দক্ষিণ চীনের হাইনান বাণিজ্যিক মহাকাশ উৎক্ষেপণ কেন্দ্র থেকে স্থানীয় সময় দুপুর ১২টা ১৫ মিনিটে (০৪১৫ জিএমটি) উৎক্ষেপণ করা হয়। উৎক্ষেপণের প্রায় ছয় মিনিট পর বুস্টার ও আপার স্টেজ পৃথক হয়ে যায়। এরপর বুস্টারটি নিয়ন্ত্রিতভাবে উল্লম্বভাবে ফিরে এসে সমুদ্রে অবস্থানরত একটি অফশোর প্ল্যাটফর্মের সঙ্গে সংযুক্ত বিশেষ জালের মাধ্যমে সফলভাবে পুনরুদ্ধার করা হয়।
এটি চীনের প্রথম সফল অরবিটাল-শ্রেণির রকেট বুস্টার পুনরুদ্ধার, যা দেশটিকে পুনর্ব্যবহারযোগ্য রকেট প্রযুক্তি বাস্তবায়নের আরও এক ধাপ এগিয়ে নিল।
এই সাফল্যের পর চীনের মহাকাশ খাতসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের শেয়ারের দামও বেড়েছে। চায়না স্পেসস্যাট এবং চায়না স্যাটেলাইট কমিউনিকেশনসের শেয়ার দৈনিক সর্বোচ্চ সীমায় পৌঁছায়।
ফ্যালকন–৯-এর বিকল্প হিসেবে লং মার্চ–১০বি
লং মার্চ–১০বি-কে স্পেসএক্সের বহুল ব্যবহৃত মাঝারি-উত্তোলন ক্ষমতাসম্পন্ন ফ্যালকন–৯ রকেটের সম্ভাব্য প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখা হচ্ছে। চীনের প্রধান রাষ্ট্রীয় রকেট নির্মাতা প্রতিষ্ঠান চায়না একাডেমি অব লঞ্চ ভেহিকেল টেকনোলজি বাণিজ্যিক মহাকাশ কার্যক্রমের জন্য রকেটটি তৈরি করেছে। এটি পৃথিবীর নিম্ন কক্ষপথে (LEO) অন্তত ১৬ মেট্রিক টন পেলোড বহন করতে সক্ষম।
তবে ফ্যালকন–৯-এর মতো লং মার্চ–১০বি স্বয়ংক্রিয়ভাবে ল্যান্ডিং লেগের ওপর ভর করে স্থলভাগ বা ড্রোন শিপে অবতরণ করে না। এর পরিবর্তে, এটি বিশেষ ল্যান্ডিং হুক ব্যবহার করে সমুদ্রভিত্তিক প্ল্যাটফর্মের সঙ্গে সংযুক্ত জালে আটকে পুনরুদ্ধার করা হয়।
অন্যদিকে, স্পেসএক্স ২০১৫ সালের ডিসেম্বরে প্রথমবারের মতো ফ্যালকন–৯ রকেটের প্রথম ধাপ সফলভাবে অবতরণ করায়। পরে ২০২৫ সালের নভেম্বরে ব্লু অরিজিনের নিউ গ্লেন রকেটও একই ধরনের সাফল্য অর্জন করে।
বর্তমানে স্পেসএক্স বছরে প্রায় ১৫০টি ফ্যালকন–৯ উৎক্ষেপণ করে, অর্থাৎ গড়ে সপ্তাহে প্রায় তিনটি। এসব রকেটের বুস্টার কয়েক ডজনবার পুনরায় ব্যবহার করা সম্ভব হয়েছে। ইঞ্জিনসংবলিত বুস্টারকে সাধারণত একটি রকেটের সবচেয়ে ব্যয়বহুল ও মূল্যবান অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
চীনের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা
চীন প্রায় এক দশক ধরে পুনর্ব্যবহারযোগ্য রকেট প্রযুক্তি উন্নয়নে কাজ করছে। প্রাথমিক পর্যায়ের স্বল্প-উচ্চতায় হোভার পরীক্ষা থেকে শুরু করে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অরবিটাল-শ্রেণির বুস্টার পুনরুদ্ধারের বিভিন্ন পরীক্ষা চালানো হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পুনর্ব্যবহারযোগ্য রকেট প্রযুক্তি পুরোপুরি সফল হলে চীনের দ্রুত সম্প্রসারণশীল বাণিজ্যিক স্যাটেলাইট কর্মসূচির উৎক্ষেপণ ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসবে।
এদিকে, বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার মধ্যে চীনের বেসরকারি মহাকাশ কোম্পানিগুলোও পুনর্ব্যবহারযোগ্য রকেট প্রযুক্তি নিয়ে গবেষণা ও পরীক্ষা জোরদার করেছে। এ খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে সরকার আইপিও (IPO)–সংক্রান্ত নিয়মও শিথিল করেছে।
গত বছর বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ল্যান্ডস্পেস এবং রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন চায়না অ্যারোস্পেস সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি করপোরেশন (CASC) পৃথকভাবে বুস্টার অবতরণ ও পুনরুদ্ধারের চেষ্টা চালালেও চূড়ান্ত ধাপে সফল হতে পারেনি।
২০৩০ সালের আগে চীনের পরিকল্পিত মনুষ্যবাহী চন্দ্রাভিযানের জন্য তৈরি লং মার্চ–১০ রকেট পরিবারের অংশ হিসেবে লং মার্চ–১০বি গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তিগত তথ্য ও অভিজ্ঞতা সরবরাহ করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
চীন ইতোমধ্যে জানিয়েছে, পরীক্ষায় ব্যবহৃত লং মার্চ–১০বি-এর বুস্টারটি পুনরায় ব্যবহারযোগ্য হিসেবে প্রস্তুত করা হবে এবং ভবিষ্যতে আরেকটি উৎক্ষেপণে সেটি ব্যবহার করার পরিকল্পনা রয়েছে।

