ঢাকা রবিবার, ১২ জুলাই, ২০২৬

ষষ্ঠ প্রজন্মের যুদ্ধবিমানের প্রতিযোগিতায় চীন-আমেরিকা— কে এগিয়ে?

রূপালী প্রতিবেদক
প্রকাশিত: জুলাই ১২, ২০২৬, ০৮:৩৬ পিএম
ছবি : সংগৃহীত

ষষ্ঠ প্রজন্মের যুদ্ধবিমান তৈরির প্রতিযোগিতা বর্তমানে বিশ্বের সামরিক প্রযুক্তির সবচেয়ে আলোচিত ক্ষেত্রগুলোর একটি। যুক্তরাষ্ট্র, চীন এবং যুক্তরাজ্য-ইতালি-জাপান জোট এই প্রতিযোগিতায় সবচেয়ে এগিয়ে রয়েছে। তবে কোন বিমানকে প্রকৃত অর্থে ষষ্ঠ প্রজন্মের যুদ্ধবিমান বলা হবে, তা নিয়ে এখনো বিশ্বব্যাপী কোনো নির্দিষ্ট সংজ্ঞা নেই।

এই শ্রেণির যুদ্ধবিমানের সম্ভাব্য বৈশিষ্ট্যের মধ্যে রয়েছে উন্নত গোপনীয় প্রযুক্তি (স্টেলথ), অত্যাধুনিক সেন্সর ব্যবস্থা, উন্নত তথ্য আদান-প্রদান ক্ষমতা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার এবং মানুষবিহীন সহযোগী যুদ্ধবিমানের সঙ্গে সমন্বিতভাবে পরিচালনার সক্ষমতা।

সাম্প্রতিক সময়ে লেজবিহীন নকশার যুদ্ধবিমানগুলো ষষ্ঠ প্রজন্মের প্রতীক হিসেবে আলোচনায় এসেছে। তবে শুধু লেজ না থাকা কোনো বিমানকে ষষ্ঠ প্রজন্মের যুদ্ধবিমান করে তোলে না। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় থেকেই লেজবিহীন নকশা নিয়ে গবেষণা হয়ে আসছে।

বর্তমান পরিস্থিতিতে বিশ্বের সক্রিয় ষষ্ঠ প্রজন্মের যুদ্ধবিমান কর্মসূচিগুলো উড্ডয়নের প্রস্তুতি ও প্রযুক্তিগত অগ্রগতির ভিত্তিতে বিভিন্ন পর্যায়ে রয়েছে।

ষষ্ঠ প্রজন্মের যুদ্ধবিমান বলতে কী বোঝায়?

ষষ্ঠ প্রজন্মের যুদ্ধবিমান নিয়ে আলোচনায় সাধারণত কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্যের কথা বলা হয়। এর মধ্যে রয়েছে উন্নত স্টেলথ প্রযুক্তি, শত্রুর নজর এড়িয়ে অভিযান পরিচালনার সক্ষমতা, উন্নত সেন্সর ব্যবস্থা, দ্রুত তথ্য বিশ্লেষণ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার এবং অন্যান্য বিমান ও যুদ্ধ ব্যবস্থার সঙ্গে সমন্বিতভাবে কাজ করার ক্ষমতা।

তবে একটি বিষয় নিয়ে ভুল ধারণা রয়েছে—লেজবিহীন নকশাই ষষ্ঠ প্রজন্মের যুদ্ধবিমানের প্রধান পরিচয় নয়। বর্তমানে চীনের নতুন যুদ্ধবিমান এবং যুক্তরাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ যুদ্ধবিমানের ধারণাগত নকশায় লেজবিহীন আকার দেখা গেলেও, সব ষষ্ঠ প্রজন্মের বিমান এমন নকশার হবে না।

লেজবিহীন নকশা মূলত রাডারে বিমানের উপস্থিতি কমানো এবং উন্নত বায়ুগত সুবিধা পাওয়ার জন্য ব্যবহার করা হয়। যুক্তরাষ্ট্র ১৯৯০-এর দশকেই এই ধরনের নকশা নিয়ে পরীক্ষা শুরু করেছিল।

যুক্তরাষ্ট্রের এফ-৪৭

ষষ্ঠ প্রজন্মের যুদ্ধবিমান তৈরির ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র সবচেয়ে দীর্ঘ সময় ধরে গবেষণা চালিয়ে আসছে। ১৯৯০-এর দশক থেকেই দেশটি উন্নত লেজবিহীন নকশা এবং গোপনীয় প্রযুক্তির পরীক্ষামূলক বিমান তৈরি করে আসছে।

ম্যাকডোনাল ডগলাস এক্স-৩৬ এবং বোয়িং এক্স-৪৫-এর মতো পরীক্ষামূলক বিমানগুলো ভবিষ্যতের যুদ্ধবিমানের প্রযুক্তি যাচাইয়ের জন্য ব্যবহার করা হয়েছিল। তবে ওই সময় উন্নত সেন্সর সমন্বয়, নেটওয়ার্ক ব্যবস্থা এবং মানুষবিহীন সহযোগী প্রযুক্তি বর্তমান পর্যায়ে না থাকায় এগুলোকে ষষ্ঠ প্রজন্মের যুদ্ধবিমান হিসেবে বিবেচনা করা হয় না।

জানা গেছে, যুক্তরাষ্ট্র ২০১৯ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে নেক্সট জেনারেশন এয়ার ডমিনেন্স (এনজিএডি) কর্মসূচির আওতায় পরীক্ষামূলক বিমান উড়িয়েছে। তবে এসব বিমানের কোনো ছবি প্রকাশ করা হয়নি।

২০২৫ সালের মার্চে বোয়িংকে যুক্তরাষ্ট্রের বিমান বাহিনীর নতুন প্রজন্মের যুদ্ধবিমান এফ-৪৭ তৈরির দায়িত্ব দেওয়া হয়। বর্তমানে এর প্রাথমিক নমুনা তৈরির কাজ চলছে এবং ২০২৮ সালের দিকে প্রথম উড্ডয়নের লক্ষ্য রয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের বিমান বাহিনীর পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে এফ-৪৭কে কোনো না কোনো পর্যায়ের কার্যকর সামরিক ব্যবহারে আনা হতে পারে।

এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীও নিজস্ব ষষ্ঠ প্রজন্মের যুদ্ধবিমান কর্মসূচি এফ/এ-এক্সএক্স পরিচালনা করছে। এই বিমান ২০৩৫ সালের মধ্যে নৌবাহিনীতে যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে।

চীনের জে-৩৬ ও জে-৫০

চীন ২০২৪ সালের শেষ দিকে দুটি নতুন লেজবিহীন যুদ্ধবিমান প্রকাশ্যে উড়িয়ে বিশ্বকে চমকে দেয়। এগুলো হলো চেংডু জে-৩৬ এবং শেনইয়াং জে-৫০।

বিমান দুটি প্রকৃতপক্ষে ষষ্ঠ প্রজন্মের মানদণ্ড কতটা পূরণ করে, তা এখনো নিশ্চিত নয়। বিশেষ করে জে-৫০ নিয়ে বিশেষজ্ঞদের মধ্যে প্রশ্ন রয়েছে।

তবে বড় আকারের তিন ইঞ্জিনবিশিষ্ট জে-৩৬ সবচেয়ে বেশি মনোযোগ আকর্ষণ করেছে। এর নকশা দেখে ধারণা করা হচ্ছে, এটি দীর্ঘ পাল্লার অভিযান, উন্নত গোপনীয়তা এবং ভবিষ্যতের নেটওয়ার্কভিত্তিক যুদ্ধের জন্য তৈরি হতে পারে।

চীনের এই বিমানগুলো জনসমক্ষে প্রদর্শনের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। যুক্তরাষ্ট্র যেখানে তার উন্নত যুদ্ধবিমান কর্মসূচির তথ্য গোপন রাখছে, সেখানে চীন ইচ্ছাকৃতভাবে নতুন প্রযুক্তির সক্ষমতার বার্তা দিচ্ছে বলে ধারণা করা হয়।

তবে এখনো পরিষ্কার নয়, জে-৩৬ ও জে-৫০ পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধবিমান, নাকি কেবল প্রযুক্তি প্রদর্শনের জন্য তৈরি পরীক্ষামূলক বিমান।

বর্তমান অবস্থায় বলা যায়, চীনই প্রথম দেশ, যারা সম্ভাব্য ষষ্ঠ প্রজন্মের লেজবিহীন যুদ্ধবিমান প্রকাশ্যে উড়িয়েছে।

যুক্তরাজ্য-ইতালি-জাপানের জিক্যাপ বা টেম্পেস্ট কর্মসূচি

ষষ্ঠ প্রজন্মের যুদ্ধবিমান তৈরির ক্ষেত্রে ইউরোপের সবচেয়ে এগিয়ে থাকা প্রকল্প হলো যুক্তরাজ্য, ইতালি ও জাপানের যৌথ গ্লোবাল কমব্যাট এয়ার প্রোগ্রাম (জিক্যাপ)।

যুক্তরাজ্যে এই বিমানকে টেম্পেস্ট নামে পরিচিত করা হয়।

এই প্রকল্পের লক্ষ্য হলো এমন একটি যুদ্ধবিমান তৈরি করা, যা উন্নত গোপনীয় প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, উন্নত সেন্সর এবং মানুষবিহীন সহযোগী যুদ্ধবিমানের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করতে পারবে।

বিএই সিস্টেমস ২০২৫ সালে এই বিমানের প্রদর্শনী নমুনা তৈরির কাজ শুরু করেছে। ২০২৭ সালে প্রথম উড্ডয়নের লক্ষ্য রয়েছে।

জাপান এই প্রকল্পকে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে, কারণ দেশটি ২০৩৫ সালের মধ্যে চীনের উন্নত যুদ্ধবিমানের মোকাবিলায় নতুন বিমান হাতে পেতে চায়।

ইউরোপের এফসিএএস প্রকল্প

জার্মানি, ফ্রান্স ও স্পেনের যৌথ ষষ্ঠ প্রজন্মের যুদ্ধবিমান প্রকল্প ছিল ফিউচার কমব্যাট এয়ার সিস্টেম (এফসিএএস)। তবে জার্মানির এয়ারবাস এবং ফ্রান্সের দাসোর মধ্যে প্রযুক্তি ভাগাভাগি ও নেতৃত্ব নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ রয়েছে।

ফলে প্রকল্পটির অগ্রগতি ধীর হয়ে পড়ে। জার্মানি এই কর্মসূচি থেকে সরে যাওয়ার সম্ভাবনা বিবেচনা করছে বলে জানা যায়।

ফ্রান্স ও জার্মানি এখন একে অপরকে ছাড়া ভবিষ্যতের যুদ্ধবিমান তৈরির সম্ভাবনাও বিবেচনা করছে।

বর্তমান অবস্থায় এফসিএএস বিশ্বের সবচেয়ে পিছিয়ে পড়া বড় ষষ্ঠ প্রজন্মের প্রকল্পগুলোর একটি।

রাশিয়ার পিএকে-ডিএ ও মিগ-৪১

রাশিয়াও ষষ্ঠ প্রজন্মের যুদ্ধবিমান তৈরির দাবি করেছে। তবে তাদের পিএকে-ডিএ প্রকল্পকে অনেক বিশ্লেষক বাস্তব অগ্রগতির চেয়ে রাজনৈতিক ঘোষণার অংশ হিসেবে দেখছেন।

ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে রাশিয়া বর্তমানে ভবিষ্যতের প্রকল্পের পরিবর্তে বিদ্যমান যুদ্ধবিমান উন্নয়ন ও উৎপাদনে বেশি মনোযোগ দিচ্ছে।

রাশিয়ার সামরিক বিমান কর্মসূচির মূল লক্ষ্য এখন সু-৩০, সু-৩৪ ও সু-৩৫ যুদ্ধবিমানের উন্নয়ন এবং সু-৫৭-এর সক্ষমতা বৃদ্ধি।

মিগ-৪১ প্রকল্প নিয়েও দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা রয়েছে। তবে ২০২৩ সালের পর থেকে এ বিষয়ে নতুন তথ্য খুব সীমিত।

এর আগে রাশিয়া দাবি করেছিল, মিগ-৪১ অত্যন্ত উচ্চ গতির হবে এবং মহাকাশের কাছাকাছি উচ্চতায় অভিযান চালাতে পারবে। তবে এসব পরিকল্পনার বাস্তবায়ন নিয়ে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা রয়েছে।

অন্যান্য সম্ভাব্য ষষ্ঠ প্রজন্মের কর্মসূচি

চীনের কাছে আরও উন্নত যুদ্ধবিমানের নকশা থাকতে পারে, যা এখনো প্রকাশ করা হয়নি।

এ ছাড়া সুইডেনও ভবিষ্যতের যুদ্ধবিমান নিয়ে প্রাথমিক পর্যায়ের গবেষণা করছে। দেশটি তাদের বর্তমান যুদ্ধবিমান ব্যবস্থার পরবর্তী বিকল্প খুঁজছে।

সুইডেন ইউরোপের এফসিএএস প্রকল্পের ভবিষ্যৎ এবং জার্মানির সম্ভাব্য অংশগ্রহণের দিকেও নজর রাখছে।

উড্ডয়নের প্রস্তুতির ভিত্তিতে সম্ভাব্য তালিকা

১. চীন — জে-৩৬ ও জে-৫০: প্রকাশ্যে উড্ডয়ন করেছে, তবে প্রকৃত সামরিক সক্ষমতা এখনো অজানা।

২. যুক্তরাষ্ট্র — এফ-৪৭ কর্মসূচি: প্রযুক্তিগতভাবে সবচেয়ে পরিণত প্রকল্পগুলোর একটি, তবে প্রকাশ্য উড্ডয়ন এখনো হয়নি।

৩. যুক্তরাজ্য-ইতালি-জাপান — জিক্যাপ/টেম্পেস্ট: প্রদর্শনী বিমান ২০২৭ সালে উড্ডয়নের লক্ষ্য রয়েছে।

৪. যুক্তরাষ্ট্র — এফ/এ-এক্সএক্স: নৌবাহিনীর প্রকল্প, ২০৩৫ সালের মধ্যে পরিষেবায় আসার লক্ষ্য রয়েছে।

৫. ইউরোপ — এফসিএএস: রাজনৈতিক ও প্রযুক্তিগত বিরোধের কারণে পিছিয়ে গেছে।

৬. রাশিয়া — পিএকে-ডিএ/মিগ-৪১: ঘোষণা রয়েছে, তবে বাস্তব অগ্রগতি সীমিত।