আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) গ্রেপ্তারি পরোয়ানা এবং নিউইয়র্ক সিটির মেয়র জোহরান মামদানির আপত্তিকে গুরুত্ব না দিয়ে আসন্ন জাতিসংঘ অধিবেশনে অংশ নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। একই সঙ্গে এক টেলিভিশন সাক্ষাৎকারে তিনি মামদানির বিরুদ্ধে কড়া সমালোচনা করেন। তবে সাম্প্রতিক বিভিন্ন জনমত জরিপে দেখা যাচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্রের ইহুদি জনগোষ্ঠীর মধ্যে নেতানিয়াহুর তুলনায় মামদানির প্রতি ইতিবাচক মনোভাব বেশি।
আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়, ফক্স নিউজের একটি অনুষ্ঠানে দেওয়া সাক্ষাৎকারে নেতানিয়াহু জানান, তিনি জাতিসংঘের অধিবেশনে উপস্থিত হয়ে ইসরায়েল এবং যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল সম্পর্কের পক্ষে নিজের অবস্থান তুলে ধরবেন। একই সাক্ষাৎকারে তিনি মামদানির বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগও করেন।
এর আগে জোহরান মামদানি মন্তব্য করেছিলেন, নেতানিয়াহু যুক্তরাষ্ট্রে এলে তাকে গ্রেপ্তার করা উচিত। ফিলিস্তিনিদের অধিকারের পক্ষে অবস্থান এবং ইসরায়েলের নীতির সমালোচনার কারণে তিনি দেশটির ইসরায়েলপন্থি বিভিন্ন মহলের সমালোচনার মুখে রয়েছেন। এসব মহল তার অবস্থানকে ইহুদিবিদ্বেষ হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করছে।
সাক্ষাৎকারে নেতানিয়াহু দাবি করেন, মামদানি বিভাজনমূলক রাজনীতি করছেন এবং নিউইয়র্কের সব সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিত্ব করার পরিবর্তে বিভিন্ন গোষ্ঠীর মধ্যে বিরোধ তৈরি করছেন। তিনি আরও বলেন, অনেক ইহুদি-আমেরিকান নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন বলে তার সঙ্গে আলোচনায় জানিয়েছেন।
তবে গত জুনে অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস-এনওআরসি সেন্টার ফর পাবলিক অ্যাফেয়ার্স রিসার্চ পরিচালিত এক জরিপে ভিন্ন চিত্র উঠে আসে। এক হাজারের বেশি ইহুদি মার্কিন নাগরিকের অংশগ্রহণে হওয়া ওই জরিপে ৪৪ শতাংশ উত্তরদাতা মামদানিকে ইতিবাচকভাবে মূল্যায়ন করেন, যেখানে ৩৯ শতাংশ তার প্রতি নেতিবাচক মত দেন। প্রায় ২০ শতাংশ এ বিষয়ে কোনো মতামত জানাননি।
একই জরিপে দেখা যায়, মাত্র এক-তৃতীয়াংশ ইহুদি প্রাপ্তবয়স্ক নেতানিয়াহুকে ইতিবাচকভাবে দেখেন। বিপরীতে প্রায় ৬০ শতাংশ তার প্রতি নেতিবাচক মনোভাব প্রকাশ করেন, যার মধ্যে ৪২ শতাংশের মূল্যায়ন ছিল অত্যন্ত নেতিবাচক। প্রায় ১০ শতাংশ এ বিষয়ে নিরপেক্ষ ছিলেন।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রে ইসরায়েলের প্রতি জনসমর্থন ধারাবাহিকভাবে কমছে। ফলে নেতানিয়াহুর সাম্প্রতিক বক্তব্য দেশটির জনমতের সঙ্গে আগের তুলনায় কম সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে বিশ্লেষকদের ধারণা।
ফিলিস্তিনপন্থি অবস্থানের কারণে মামদানি বিতর্কের মুখে থাকলেও জরিপে দেখা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রের ইহুদিদের মধ্যে তার গ্রহণযোগ্যতা নেতানিয়াহুর চেয়ে বেশি। একই জরিপে ৩০ শতাংশ উত্তরদাতা মনে করেন, গাজায় ইসরায়েল গণহত্যা চালিয়েছে।
উল্লেখ্য, গাজায় মানবতাবিরোধী অপরাধ ও যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে ২০২৪ সালের নভেম্বরে আইসিসি বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এবং সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইয়োভ গ্যালান্টের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে।
নির্বাচনী প্রচারের সময় মামদানি বলেছিলেন, নেতানিয়াহু নিউইয়র্কে এলে তাকে গ্রেপ্তারের উদ্যোগ নেওয়া হবে। তবে পরে তিনি স্পষ্ট করেন, নেতানিয়াহুকে যুদ্ধাপরাধী মনে করলেও নিউইয়র্ক সিটির মেয়র হিসেবে তার এমন কোনো আইনি ক্ষমতা নেই।
এদিকে, চলতি সপ্তাহে প্রকাশিত ইউগভের এক জরিপে দেখা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রের ৪৬ শতাংশ নাগরিক নেতানিয়াহুকে গ্রেপ্তারের পক্ষে মত দিয়েছেন। বিপরীতে ২৮ শতাংশ মনে করেন, তাকে গ্রেপ্তার করা উচিত নয়।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্রের দুই প্রধান রাজনৈতিক দলের সঙ্গে ইসরায়েলের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকা সত্ত্বেও দেশটির জনমতের পরিবর্তন ঠেকানো সম্ভব হয়নি। বরং ওয়াশিংটনের সামরিক সহায়তা ও অস্ত্র সরবরাহ বন্ধের দাবি আগের তুলনায় আরও জোরালো হচ্ছে।
সাক্ষাৎকারে নেতানিয়াহু ইরান প্রসঙ্গেও মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, ভবিষ্যতে ইরান যদি আবার ইসরায়েলের ওপর হামলার চেষ্টা করে, তাহলে সেটি তাদের জন্য বড় ধরনের ভুল হবে।
এ ছাড়া তিনি অভিযোগ করেন, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার পর মামদানি, তার স্ত্রী ও পরিবারের সদস্যরা ওই ঘটনার প্রতি সমর্থন বা উদযাপনের মনোভাব দেখিয়েছিলেন। তবে এ বিষয়ে তিনি কোনো প্রমাণ উপস্থাপন করেননি।
অন্যদিকে জোহরান মামদানি একাধিকবার বলেছেন, ৭ অক্টোবর হামাসের হামলা ছিল একটি ভয়াবহ যুদ্ধাপরাধ এবং তিনি সেই হামলার নিন্দা করেন।


সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন