জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ (ইউনেস্কো) প্রস্তাব ২৮০৩ গাজাকে কার্যত আন্তর্জাতিক ট্রাস্টিশিপ বা বিদেশি তত্ত্বাবধানের আওতায় আনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। চীন ও রাশিয়ার অনুপস্থিতি এবং ১৩-১ ভোটে গৃহীত এই প্রস্তাবটি বিশ্লেষকরা ১৯৪৮ সালের পর ফিলিস্তিনি রাজনৈতিক কর্তৃত্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পুনর্গঠন হিসেবে উল্লেখ করছেন। প্রস্তাবটি একটি সমান্তরাল শাসন কাঠামো তৈরি করছে, যা হামাসকে কার্যত একপাশে রাখে এবং ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের সার্বভৌমত্বকে সীমিত করে।
বিদেশি শাসন কাঠামো
প্রস্তাব অনুযায়ী গাজায় একটি (শান্তি বোর্ড) নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী প্রশাসন গঠন করা হবে, যা পুনর্গঠন, অর্থায়ন এবং কার্যকরী শাসন কাঠামোর তদারকি করবে।
ফিলিস্তিনি বিশ্লেষক খলিল শাহীন মনে করেন, এটি এক বহুস্তরীয় শাসনব্যবস্থা যা ফিলিস্তিনিদের সিদ্ধান্তগ্রহণ ক্ষমতাকে সীমিত করছে।
গঠিত শান্তি বোর্ড অধীনে আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা বাহিনী (আইএসএফ) মোতায়েন করা হবে, এর কাজ হবে যুদ্ধবিরতি পর্যবেক্ষণ, নিরস্ত্রীকরণ এবং প্রস্তাবে উল্লেখিত ‘সন্ত্রাসী অবকাঠামো’ ভেঙে ফেলা। মার্কিন রাষ্ট্রদূত মাইক ওয়াল্টজ এটিকে ‘স্থিতিশীল ও নিরাপদ গাজা তৈরির পূর্বশর্ত’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
তবে সমালোচকরা আশঙ্কা করছেন, এটি গাজা ও পশ্চিম তীরকে আরও বিচ্ছিন্ন করে, একটি সংলগ্ন ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রের সম্ভাবনাকে দুর্বল করতে পারে।
ফিলিস্তিনি প্রতিক্রিয়া
ফিলিস্তিনি রাজনৈতিক দলের মধ্যে প্রস্তাব ২৮০৩ প্রতিক্রিয়ায় তীব্র বিভাজন দেখা গেছে। প্যালেস্টিনিয়ান অথরিটি (পিএ) প্রস্তাবটিকে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি ও পুনর্গঠনের সুযোগ হিসেবে দেখছে। ফাতাহ নেতা আব্বাস জাকি বলেন, ‘এটি আমাদের কূটনৈতিক পথের সাফল্য এবং ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের শাসন সক্ষমতার ওপর আন্তর্জাতিক আস্থা পুনর্গঠনের সুযোগ।’
অন্যদিকে, হামাস প্রস্তাবটিকে বিদেশি তত্ত্বাবধান ও নিরস্ত্রীকরণের আড়ালে দখলের একটি প্রচেষ্টা হিসেবে প্রত্যাখ্যান করছে। হামাসের মুখপাত্র মুস্তফা জারার সতর্ক করেছেন, ‘গাজার ওপর জোরপূর্বক নিরস্ত্রীকরণ সরাসরি সংঘাতের সূত্রপাত করতে পারে।’
নেতৃত্ব ও আঞ্চলিক হিসাব
প্রস্তাবটি মূলত মার্কিন-ইসরায়েলি দৃষ্টিভঙ্গির ওপর ভিত্তি করে গাজার নতুন শাসনব্যবস্থা তৈরি করছে। রাশিয়া ও চীনের অনুপস্থিতি মার্কিন একতরফাবাদের প্রতি অসন্তোষ প্রকাশ করে, যদিও তারা সরাসরি বিরোধিতা করেনি।
এদিকে আরব রাষ্ট্রসমূহ আনুষ্ঠানিকভাবে এটিকে সমর্থন জানিয়েছে, কিন্তু বিশ্লেষকরা এটিকে বাস্তববাদী বা কূটনৈতিক সমর্থন হিসেবে দেখছেন।
আলজেরিয়ার রাষ্ট্রদূত বলেন, ‘ফিলিস্তিনিদের ন্যায়বিচার ছাড়া স্থায়ী শান্তি সম্ভব নয়।’ সমালোচকরা মনে করছেন, কিছু আরব রাষ্ট্র ফিলিস্তিনি জনগণের ত্যাগ উপেক্ষা করে আন্তর্জাতিক প্রস্তাবের আড়ালে সমর্থন প্রকাশ করছে।
অস্থায়ী প্রশাসনের সময়সীমা
শান্তি বোর্ডে ও আইএফএস-এর মেয়াদ নির্ধারিত ৩১ ডিসেম্বর ২০২৭ পর্যন্ত। কিন্তু সমালোচকরা আশঙ্কা করছেন যে আন্তর্জাতিক ট্রাস্টিশিপ প্রায়শই ‘অস্থায়ী’ হলেও দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলতে পারে।
শাহীন সতর্ক করেছেন, গাজাকে বিদ্রোহী অঞ্চল হিসেবে দেখলে আন্তর্জাতিক বাহিনী অনিচ্ছাকৃতভাবে অভ্যন্তরীণ দমন প্রক্রিয়ায় অংশীদার হতে পারে। তিনি আরও মন্তব্য করেছেন, প্রস্তাবটি কার্যত দ্বি-রাষ্ট্রীয় সমাধানের মৃত্যুদণ্ড দিতে পারে।
ভবিষ্যতে ফিলিস্তিনিদের পথ
বিশ্লেষকদের মতে, ফিলিস্তিনিদের সামনে তিনটি সম্ভাব্য পথ রয়েছে। এক, সম্মিলিত জাতীয় কৌশল গ্রহণ করা। দুই, গাজার জন্য ঐকমত্যভিত্তিক সরকার বা টেকনোক্র্যাটিক কমিটি গঠন। এবং তিন, দলগুলোর মধ্যে পুনর্মিলন ও নাগরিক সমাজের অন্তর্ভুক্তি। অন্যথায়, গাজা-পশ্চিম তীর বিভাজন আরও গভীর হবে এবং ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনা দুর্বল হবে।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন
আপনার ফেসবুক প্রোফাইল থেকে মতামত লিখুন