ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

সংঘাতের শঙ্কার মধ্যেই

যুক্তরাষ্ট্র-ইরানের সরাসরি বৈঠক আজ

বিশ্ব ডেস্ক
প্রকাশিত: ফেব্রুয়ারি ৬, ২০২৬, ১০:১৭ এএম
স্টিভ উইটকফ ও আরাগচি। ছবি : সংগৃহীত

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সামরিক সংঘাতের আশঙ্কা যখন কেবলই বাড়ছে, তখন শুক্রবার (৬ ফেব্রুয়ারি) ওমানে আলোচনায় বসতে যাচ্ছেন দুই দেশের শীর্ষ কর্মকর্তারা। মূলত ওমানের মধ্যস্থতায় দুই দেশের শীর্ষ পর্যায়ের প্রতিনিধিদের মধ্যে সরাসরি বৈঠককে উত্তেজনা কমানোর গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক উদ্যোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

সংবাদমাধ্যম বিবিসি বলছে, ওমানে এই বৈঠক হচ্ছে এমন এক সময়ে, যখন গত মাসে ইরানে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ দমনে সহিংস অভিযানের পর মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের বড় ধরনের সামরিক শক্তি মোতায়েন রয়েছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর দাবি, ওই দমনপীড়নে হাজার হাজার মানুষ নিহত হয়েছেন। বৈঠকের স্থান ও আলোচনার পরিধি নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ায় শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত আলোচনা ভেস্তে যাওয়ার আশঙ্কা ছিল। তবে আঞ্চলিক মধ্যস্থতাকারীদের উদ্যোগে উত্তেজনা কমাতে এই কূটনৈতিক প্রচেষ্টা এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।

অবশ্য দুই দেশ এখনো নিজ নিজ অবস্থানে অনড়। তবে আলোচনায় অগ্রগতি হলে ভবিষ্যতে বিস্তৃত আলোচনার একটি কাঠামো তৈরি হতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র চায়, ইরান তার পারমাণবিক কর্মসূচি স্থগিত করবে এবং সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত পরিত্যাগ করবে। ওয়াশিংটনের মতে, আলোচনায় ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি, আঞ্চলিক সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে সমর্থন এবং নিজ নাগরিকদের সঙ্গে আচরণের বিষয়ও অন্তর্ভুক্ত হওয়া উচিত।

ইরান অবশ্য বলছে, আলোচনা কেবল পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়েই হবে। এই মতপার্থক্য আদৌ মিটেছে কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়।

সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, সমঝোতা না হলে ইরানে হামলা চালানো হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র ইতোমধ্যে হাজার হাজার সেনা, একটি বিমানবাহী রণতরীসহ যুদ্ধজাহাজ ও যুদ্ধবিমান মধ্যপ্রাচ্যে পাঠিয়েছে। আর এটাকে ট্রাম্প ‘নৌবহর’ বলে উল্লেখ করেছেন।

ইরানও পাল্টা হুমকি দিয়ে বলেছে, হামলা হলে তারা শক্ত হাতে জবাব দেবে এবং মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটি ও ইসরায়েলকে লক্ষ্যবস্তু করা হবে।

বৈঠকে ইরানি প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেবেন দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি। তিনি সম্প্রতি বলেছেন, ইরানের সশস্ত্র বাহিনী মার্কিন হামলার প্রতিশোধ নিতে ‘ট্রিগারে আঙুল রেখে প্রস্তুত’ আছে। যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে আলোচনায় থাকবেন বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এবং ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনার।

গত বছরের জুনে ইসরায়েল ও ইরানের যুদ্ধ এবং যুক্তরাষ্ট্রের ইরানের তিনটি প্রধান পারমাণবিক স্থাপনায় হামলার পর এটিই হবে দুই দেশের কর্মকর্তাদের প্রথম সরাসরি বৈঠক। ইরানের দাবি, ওই হামলার পর তাদের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়।

বিবিসি বলছে, ইরানের সংকটে পড়া নেতৃত্বের জন্য এই আলোচনা যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযান ঠেকানোর শেষ সুযোগ হতে পারে। বিশ্লেষকদের মতে, ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর বর্তমান সময়টি ইরানি সরকারের সবচেয়ে দুর্বল সময়।

এর আগে অর্থনৈতিক সংকট থেকে শুরু হওয়া সরকারবিরোধী বিক্ষোভ দমন করতে গিয়ে দেশটির নিরাপত্তা বাহিনী ব্যাপক সহিংসতা চালায়। ওয়াশিংটনভিত্তিক হিউম্যান রাইটস অ্যাকটিভিস্টস নিউজ এজেন্সির হিসাবে, এতে অন্তত ৬ হাজার ৮৮৩ জন নিহত হয়েছেন এবং ৫০ হাজারের বেশি মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে বলে সংস্থাটি সতর্ক করেছে।

এই সংকট আবারও ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিকে আলোচনার কেন্দ্রে এনেছে। ইরান বরাবরই বলে আসছে, তাদের কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ উদ্দেশ্যে পরিচালিত। তবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের অভিযোগ, এর মাধ্যমে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির চেষ্টা চলছে। ইরান জোর দিয়ে বলছে, নিজ ভূখণ্ডে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ তাদের অধিকার। তারা ৪০০ কেজি উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত তৃতীয় কোনো দেশে পাঠানোর প্রস্তাবও প্রত্যাখ্যান করেছে।

তবে কর্মকর্তারা ইঙ্গিত দিয়েছেন, কিছু ছাড় দেওয়া হতে পারে। এর মধ্যে আঞ্চলিক ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কনসোর্টিয়াম গঠনের প্রস্তাবও রয়েছে। একই সঙ্গে ইরান স্পষ্ট করে বলেছে, তাদের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি সীমিত করা বা আঞ্চলিক মিত্রদের সমর্থন বন্ধ করার দাবি তাদের সার্বভৌমত্বে হস্তক্ষেপ। এই জোটের মধ্যে গাজায় হামাস, ইরাকে মিলিশিয়া, লেবাননে হিজবুল্লাহ এবং ইয়েমেনে হুতিরাও রয়েছে।

গত মঙ্গলবার ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান জানান, উপযুক্ত পরিবেশ থাকলে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ‘ন্যায্য ও সমতাভিত্তিক আলোচনা’ চালানোর নির্দেশ তিনি পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে দিয়েছেন।

এদিকে ইরান যেকোনো সমঝোতার ক্ষেত্রে অর্থনীতিকে পঙ্গু করে দেওয়া নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের দাবি তুলবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে সরকারবিরোধীদের মতে, নিষেধাজ্ঞা শিথিল হলে ধর্মীয় শাসকদের জন্য তা হবে বড় স্বস্তি।

যুক্তরাষ্ট্রের জন্যও এই বৈঠক ট্রাম্পের সামরিক হুমকি থেকে সরে আসার একটি পথ খুলে দিতে পারে। আঞ্চলিক দেশগুলো আশঙ্কা করছে, যুক্তরাষ্ট্রের হামলা হলে তা বড় ধরনের যুদ্ধ বা ইরানে দীর্ঘমেয়াদি অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করতে পারে। তারা সতর্ক করেছে, কেবল আকাশপথে হামলা চালিয়ে ইরানের নেতৃত্ব উৎখাত করা সম্ভব নয়।

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি উদ্বিগ্ন কি না— এমন প্রশ্নে সম্প্রতি ট্রাম্প এনবিসি নিউজকে বলেন, ‘আমার মনে হয়, তার খুবই উদ্বিগ্ন হওয়া উচিত।’

মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেন, অর্থবহ ফল পেতে হলে আলোচনা পারমাণবিক ইস্যুর বাইরেও যেতে হবে। তিনি বলেন, ‘এই লোকদের সঙ্গে চুক্তি হবে কি না জানি না, তবে চেষ্টা করে দেখতে ক্ষতি নেই।’

প্রথমে বৈঠকটি ইস্তাম্বুলে হওয়ার কথা থাকলেও শেষ মুহূর্তে ইরানের অনুরোধে স্থান পরিবর্তন করে ওমানে নেওয়া হয়। ইরান আরও চায়, আলোচনায় কেবল ইরানি ও মার্কিন প্রতিনিধিরাই অংশ নেবেন। এই উদ্যোগে মিশর, তুরস্ক ও কাতার মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা রাখছে।