ঢাকা বৃহস্পতিবার, ১৮ জুন, ২০২৬

ইরান চুক্তি নিয়ে ট্রাম্প ও ভ্যান্সের ভাষ্য ‘অসংলগ্ন’

বিশ্ব ডেস্ক
প্রকাশিত: জুন ১৮, ২০২৬, ১১:০৭ এএম
ছবি : সংগৃহীত

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সম্প্রতি স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) নিয়ে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের বক্তব্যকে ‘অসংলগ্ন’ ও ‘বাস্তবতাবিবর্জিত’ বলে সমালোচনা করেছেন পর্যবেক্ষকরা।

গতকাল মঙ্গলবার (১৭ জুন) ‘ফক্স অ্যান্ড ফ্রেন্ডস’ অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে ভাইস প্রেসিডেন্ট ভ্যান্স দাবি করেন, ইরান এই চুক্তিকে নিজেদের জনগণের কাছে ইতিবাচকভাবে উপস্থাপন করতে ‘প্রচারণা’ চালাচ্ছে।

ভ্যান্স বলেন, ‘তাদের সমাজের কিছু অংশ এই চুক্তিটিকে তাদের অভ্যন্তরীণ দর্শকদের কাছে যতটা সম্ভব ইতিবাচকভাবে তুলে ধরার চেষ্টা করছে।’

তবে সমালোচকদের মতে, এই অভিযোগ আসলে ট্রাম্প প্রশাসনের নিজস্ব প্রচারণারই প্রতিফলন। তাদের দাবি, যুদ্ধবিরতি ও সমঝোতা স্মারকটি যুক্তরাষ্ট্রের ঘোষিত যুদ্ধলক্ষ্যের কোনোটি পূরণ করতে পারেনি; বরং তেহরানকে উল্লেখযোগ্য অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সুবিধা দিয়েছে।

সমালোচকদের অন্যতম অভিযোগ, হোয়াইট হাউস চুক্তির খসড়া প্রকাশে অস্বাভাবিক বিলম্ব করেছে। আজ বুধবার পর্যন্ত সমঝোতা স্মারকের খসড়া প্রকাশ করা হয়নি। এটি কংগ্রেসেও পাঠানো হয়নি। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র ইসরায়েলও চুক্তির অনুলিপি পেতে বেগ পেয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

নেভাডার সিনেটর জ্যাকি রোজেন বলেন, ‘চুক্তিটি যদি এতই ভালো হতো, তাহলে প্রেসিডেন্ট কি সেটি সোনার পাত দিয়ে ছাপিয়ে সবার কাছে পাঠাতেন না?’

পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে প্রশ্ন

হোয়াইট হাউসের প্রথম দাবি ছিল, ‘ইরানের কখনোই পারমাণবিক অস্ত্র থাকবে না।’

তবে সমালোচকদের মতে, এটি একটি আকাঙ্ক্ষাভিত্তিক বক্তব্য মাত্র। কীভাবে যুক্তরাষ্ট্র নিশ্চিত করবে যে ইরান পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করতে পারবে না, সে বিষয়ে কোনো স্পষ্ট পরিকল্পনা বা বাস্তবায়ন কাঠামো চুক্তিতে উল্লেখ নেই।

তারা ২০১৫ সালের ‘জয়েন্ট কম্প্রিহেনসিভ প্ল্যান অব অ্যাকশন’ (জেসিপিওএ)-এর সঙ্গে তুলনা করে বলেন, ওই চুক্তিতে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণ ও যাচাই-বাছাইয়ের একাধিক ব্যবস্থা ছিল, যা ট্রাম্প ২০১৮ সালে যুক্তরাষ্ট্রকে চুক্তি থেকে প্রত্যাহার করার আগ পর্যন্ত কার্যকর ছিল।

ভ্যান্স দাবি করেছেন, নতুন সমঝোতার ফলে ইরান আন্তর্জাতিক পরিদর্শকদের দেশে প্রবেশের অনুমতি দেবে। তবে সমালোচকদের মতে, এ ধরনের কোনো বাধ্যতামূলক নিশ্চয়তা সমঝোতা স্মারকে স্পষ্টভাবে উল্লেখ নেই।

‘যুদ্ধ শেষ’ দাবির সমালোচনা

হোয়াইট হাউসের দ্বিতীয় দাবি ছিল, ‘প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প লেবাননসহ প্রতিটি রণাঙ্গনে যুদ্ধ শেষ করেছেন।’

সমালোচকদের বক্তব্য, যেহেতু ট্রাম্প প্রশাসনই সংঘাত শুরু করেছিল, তাই এই দাবি অনেকটা আগুন লাগিয়ে পরে তা নেভানোর কৃতিত্ব নেওয়ার মতো।

তাদের মতে, যুদ্ধের শুরুতে হোয়াইট হাউস ইরানের আঞ্চলিক প্রক্সি গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের কথা বললেও, পরবর্তীতে চুক্তির স্বার্থে লেবাননে হামলা বন্ধে ইসরায়েলের ওপর চাপ সৃষ্টি করা হয়েছে।

সমঝোতা স্মারকে ‘লেবাননসহ সকল রণাঙ্গনে সামরিক অভিযানের অবিলম্বে ও স্থায়ী সমাপ্তির’ আহ্বান জানানো হয়েছে, যা সমালোচকদের মতে ইরানের জন্য কূটনৈতিক সাফল্য।

হরমুজ প্রণালি প্রসঙ্গ

চুক্তির পক্ষে হোয়াইট হাউসের আরেকটি যুক্তি ছিল, ‘হরমুজ প্রণালি আবার অবাধে উন্মুক্ত হয়েছে।’

তবে বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধের আগেও হরমুজ প্রণালী আন্তর্জাতিক নৌ চলাচলের জন্য উন্মুক্ত ছিল। ফলে এই চুক্তি নতুন কোনো বাস্তবতা সৃষ্টি করেনি; বরং যুদ্ধ-পূর্ব অবস্থাই পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেছে।

অর্থনৈতিক সুবিধা নিয়ে বিতর্ক

হোয়াইট হাউস দাবি করেছে, ইরান যে অর্থ পাবে তা যুক্তরাষ্ট্রের করদাতাদের অর্থ নয়; বরং আগে জব্দ করা ইরানি সম্পদ।

তবে সমালোচকদের মতে, যুদ্ধের পর ইরানের জন্য সম্পদ অবমুক্ত করা এবং পুনর্গঠন সহায়তা নিশ্চিত করা কার্যত তেহরানের জন্য একটি বড় পুরস্কার।

সমঝোতা স্মারকে যুক্তরাষ্ট্র ও তার আঞ্চলিক অংশীদারদের ইরানের পুনর্গঠন ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য অন্তত ৩০০ বিলিয়ন ডলারের একটি পরিকল্পনা তৈরির প্রতিশ্রুতির কথাও উল্লেখ রয়েছে।

ক্ষেপণাস্ত্র ও আঞ্চলিক প্রক্সি ইস্যু

সমালোচকদের আরেকটি বড় অভিযোগ হলো, চুক্তিতে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি কিংবা লেবানন, ইয়েমেন, গাজা ও ইরাকে সক্রিয় বিভিন্ন প্রক্সি গোষ্ঠীর প্রতি তেহরানের সমর্থনের বিষয়টি উল্লেখই করা হয়নি।

যদিও সামরিক অভিযান শুরুর সময় ট্রাম্প প্রশাসন এই দুটি বিষয়কে যুদ্ধের প্রধান উদ্দেশ্য হিসেবে তুলে ধরেছিল।

তবে বুধবার এক সংবাদ সম্মেলনে ট্রাম্প বলেন, ‘ক্ষেপণাস্ত্র কোনো বড় সমস্যা নয়। ক্ষেপণাস্ত্র কিছু নির্দিষ্ট স্থানে আঘাত হানতে পারে, কিন্তু এগুলো পুরো পৃথিবী ধ্বংস করে দিতে পারে না।’