ঢাকা শনিবার, ১১ জুলাই, ২০২৬

ট্রাম্পকে হত্যার ভুয়া তথ্য ছড়াচ্ছে ইসরায়েল: মার্কিন গোয়েন্দা

বিশ্ব ডেস্ক
প্রকাশিত: জুলাই ১১, ২০২৬, ০৬:৪৭ পিএম
ছবি : সংগৃহীত

ইসরায়েলি একটি সূত্র এবং একজন মার্কিন কর্মকর্তার দাবি, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে হত্যার যে ইরানি হুমকির তথ্য ইসরায়েলি গোয়েন্দারা ট্রাম্প প্রশাসনকে দিয়েছে, তা কোনো সুনির্দিষ্ট বা বিস্তারিত হত্যাচক্রান্তের প্রমাণ নয়। বরং এটি তেহরানের কট্টরপন্থি নেতৃত্বের একটি অংশের মধ্যে ট্রাম্পকে লক্ষ্যবস্তু করার আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন।

ইসরায়েলি সূত্রটি সিএনএনকে জানায়, ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)-এর নতুন কমান্ডার আহমদ ভাহিদি এই ধরনের পরিকল্পনার পক্ষে থাকা গোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।

মার্কিন পরিকল্পনা সম্পর্কে অবগত একটি সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, ভাহিদিকে শাসকগোষ্ঠীর ‘বাধা সৃষ্টিকারীদের’ তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

ট্রাম্প প্রশাসনের অভিযোগ, এই ব্যক্তিরা সক্রিয়ভাবে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনা দুর্বল করার চেষ্টা করছেন।

সূত্রটি আরও জানায়, যদি পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ পুনরায় শুরু হয়, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র এই তালিকাভুক্ত নেতাদের সরাসরি লক্ষ্যবস্তু করার বিষয়টি বিবেচনা করেছে।

বিষয়টি সম্পর্কে অবগত দুটি মার্কিন সূত্র জানিয়েছে, সাম্প্রতিক মার্কিন গোয়েন্দা মূল্যায়নে ট্রাম্পকে হত্যার কোনো নতুন বা সুনির্দিষ্ট ইরানি ষড়যন্ত্রের প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তবে বিভিন্ন ইরানি গোষ্ঠীর মধ্যে ট্রাম্পকে হত্যা করার ইচ্ছা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনা ও গুঞ্জন রয়েছে।

ট্রাম্পকে লক্ষ্যবস্তু করার এই মনোভাব শুধু ইরানের শাসকগোষ্ঠীর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। ফেব্রুয়ারির শেষদিকে যুদ্ধের প্রথম দফার হামলায় ইসরায়েলের হাতে নিহত আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির দিনব্যাপী অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় অংশ নেওয়া শোকাহতদের অনেকেই ট্রাম্পকে হত্যার আহ্বান জানিয়ে প্ল্যাকার্ড প্রদর্শন করেন।

গতকাল শুক্রবার (স্থানীয় সময়) নিউইয়র্ক পোস্টকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনের গুরুত্ব খাটো করে দেখান। এর আগের দিন বৃহস্পতিবার ওয়াল স্ট্রিট জার্নালে প্রথম প্রকাশিত ওই প্রতিবেদনের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ইরান দীর্ঘদিন ধরেই তাকে হত্যার হুমকি দিয়ে আসছে।

ট্রাম্প বলেন, ‘ইসরায়েল কিছুই প্রমাণ করতে পারেনি।’ তিনি নিজেকে দীর্ঘদিন ধরে ইরানের ‘এক নম্বর লক্ষ্যবস্তু’ বলেও উল্লেখ করেন।

এদিকে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলো যখন ট্রাম্পের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য ইরানি হুমকি পর্যবেক্ষণ করছে, তখনই ন্যাটো শীর্ষ সম্মেলন শেষে দেশে ফেরার পথে তিনি অপ্রত্যাশিতভাবে প্রেসিডেন্টের বিমান পরিবর্তন করেন।

কাতারের উপহার হিসেবে পাওয়া এবং সম্প্রতি পরিষেবায় যুক্ত হওয়া নতুন বিমানটির পরিবর্তে ট্রাম্প ব্যবহার করেন সেই পুরোনো বিমান, যা কয়েক দশক ধরে মার্কিন প্রেসিডেন্টদের বহন করে আসছে।

চারজন মার্কিন কর্মকর্তার মতে, ইরানকে ঘিরে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনা এবং নিরাপত্তা উদ্বেগের কারণেই আংশিকভাবে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল।

তবে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, ট্রাম্পের জীবনের ওপর কোনো নতুন বা নির্দিষ্ট হুমকি ছিল না। যদিও তুরস্ক-সংলগ্ন অঞ্চলে নতুন করে মার্কিন হামলার পর প্রেসিডেন্ট শীর্ষ সম্মেলনে ইরানের পক্ষ থেকে সম্ভাব্য গুপ্তহত্যা প্রচেষ্টার আশঙ্কার কথা উল্লেখ করেছিলেন।

ইসরায়েলের এই গোয়েন্দা তথ্য এমন এক সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে পৌঁছেছে, যখন ট্রাম্প প্রশাসন ইরানের সঙ্গে চলমান সংঘাতের অবসান নিয়ে কৌশল নির্ধারণে চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে। দুটি ইসরায়েলি সূত্রের দাবি, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার আশঙ্কায় ট্রাম্প প্রশাসন চায় না যে ইসরায়েল নতুন করে এই সংঘাতে জড়িয়ে পড়ুক।

সূত্রগুলোর একজন জানান, ইসরায়েলের মূল্যায়ন অনুযায়ী ট্রাম্প পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধে ফিরতে চান না। প্রয়োজনে তিনি সর্বোচ্চ ইরানের বন্দরগুলোতে নৌ অবরোধ পুনর্বহালের মতো পদক্ষেপে সম্মত হতে পারেন।

এ বিষয়ে মন্তব্য করতে গিয়ে এক মার্কিন কর্মকর্তা বলেন, ‘এটি ভুয়া খবর।’

তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যে অত্যন্ত শক্তিশালী সম্পর্ক রয়েছে এবং 'অপারেশন মিডনাইট হ্যামার' ও 'অপারেশন এপিক ফিউরি'-এর সাফল্যে সেই সমন্বয় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। তিনি আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্র তাদের ইসরায়েলি অংশীদারদের সঙ্গে নিবিড় সমন্বয় বজায় রেখেছে।

গতকাল ট্রাম্প তার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে লিখেছেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র তাদের দ্ব্যর্থহীনভাবে জানিয়ে দিয়েছে যে যুদ্ধবিরতি শেষ।’

তিনি ইরানি নেতৃত্বের উদ্দেশে এই মন্তব্য করেন। একই সঙ্গে জানান, যুদ্ধবিরতি পুনঃপ্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে আলোচনা চালিয়ে যেতে তিনি সম্মত হয়েছেন।

অন্যদিকে, ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ইরানের উদ্দেশ্য নিয়ে সন্দিহান। তার বিশ্বাস, তেহরান কখনোই আন্তরিকভাবে আলোচনায় বসেনি। বরং তিনি ইরানি শাসনব্যবস্থাকে দুর্বল করার লক্ষ্যে সামরিক অভিযান পুনরায় শুরুর পক্ষপাতী।

বিষয়টি সম্পর্কে অবগত দুটি সূত্র জানিয়েছে, মার্কিন গোয়েন্দা কর্মকর্তারা মনে করেন, ইসরায়েল সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া থেকে নিজেদের বিচ্ছিন্ন মনে করছে এবং বিভিন্ন উপায়ে ট্রাম্প প্রশাসনের ইরাননীতি প্রভাবিত করার চেষ্টা করছে। তাদের লক্ষ্য, ইসরায়েলের দৃষ্টিতে ‘খারাপ’ কোনো চুক্তিতে যেন যুক্তরাষ্ট্র সম্মত না হয়।

এই কারণেই ইসরায়েলের দেওয়া গোয়েন্দা তথ্য নিয়ে মার্কিন গোয়েন্দা সম্প্রদায়ের মধ্যে কিছুটা সংশয় রয়েছে। তাদের ধারণা, ট্রাম্পের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলতেই ইসরায়েল বিভিন্ন তথ্য উপস্থাপন করছে।

সূত্রগুলোর মতে, সাম্প্রতিক সময়ে ট্রাম্পকে হত্যার কথিত নতুন ষড়যন্ত্র সম্পর্কিত গোয়েন্দা তথ্যও ইসরায়েল একই উদ্দেশ্যে গুরুত্বসহকারে তুলে ধরেছে।

তবে একটি মার্কিন সূত্র জানায়, ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে তার বিরুদ্ধে হুমকির প্রকৃতিতে মৌলিক কোনো পরিবর্তন ঘটেনি।

মার্কিন গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের মূল্যায়ন অনুযায়ী, ইরানের একাধিক গোষ্ঠীর মধ্যে ট্রাম্পকে হত্যার আগ্রহ থাকলেও তারা এখন পর্যন্ত কার্যকর কোনো পরিকল্পনা তৈরি করতে পারেনি। এমনকি নির্দিষ্ট কোনো হত্যাচক্রান্ত বাস্তবায়নের জন্য ইরানের নীতিনির্ধারকদের আনুষ্ঠানিক অনুমোদনেরও প্রমাণ মেলেনি।

উল্লেখ্য, ট্রাম্পের প্রথম প্রশাসনের সময়ও যুক্তরাষ্ট্র ইরান-সমর্থিত একাধিক হত্যার হুমকি পর্যবেক্ষণ করেছিল। এর মধ্যে সাবেক জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা জন বোল্টন এবং সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেওও সম্ভাব্য ইরানি হত্যাচক্রান্তের লক্ষ্যবস্তু ছিলেন বলে তদন্ত-সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।