ঢাকা শুক্রবার, ১৭ জুলাই, ২০২৬

পাকিস্তান যেভাবে শোষণ করছে বেলুচিস্তানের সম্পদ

বিশ্ব ডেস্ক
প্রকাশিত: জুলাই ১৭, ২০২৬, ০১:৩৪ এএম
ছবি : সংগৃহীত

পাকিস্তান কর্তৃক দখলকৃত বেলুচিস্তান দেশটির বৃহত্তম দখলকৃত ভূখণ্ড। এ অঞ্চল প্রাকৃতিক সম্পদে অত্যন্ত সমৃদ্ধ। এখানে আনুমানিক ১ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার মূল্যের খনিজসম্পদ রয়েছে বলে ধারণা করা হয়। বিশাল পর্বতমালা, মনোমুগ্ধকর সমুদ্রসৈকত এবং ভূগর্ভে বিস্তৃত খনিজভাণ্ডারের জন্য বেলুচিস্তান বিশেষভাবে পরিচিত।

এ প্রদেশে কয়লা, সালফার, ক্রোমাইট, লৌহ আকরিক, ব্যারাইট, মার্বেল, কোয়ার্টজাইট ও চুনাপাথর প্রচুর পরিমাণে পাওয়া যায়। পাশাপাশি উল্লেখযোগ্য পরিমাণে তেল, প্রাকৃতিক গ্যাস, তামা ও সোনার মজুত রয়েছে। ১৯৫৩ সালে ডেরা বুগতির সুই এলাকায় প্রাকৃতিক গ্যাস আবিষ্কৃত হওয়ার পর থেকে সেই গ্যাস সমগ্র পাকিস্তানে সরবরাহ করা হয়ে আসছে।

বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ অনাবিষ্কৃত তামা ও সোনার ভাণ্ডার হিসেবে পরিচিত রেকো দিকে প্রায় ৫.৯ বিলিয়ন টন তামা ও সোনার আকরিকের মজুত রয়েছে। এ ছাড়া বেলুচিস্তান বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ক্রোমাইট উৎপাদক অঞ্চল। পাকিস্তানের মোট ক্রোমাইট উৎপাদনের ৯০ শতাংশেরও বেশি এ প্রদেশে হয়। স্টেইনলেস স্টিল উৎপাদনে ব্যবহৃত ক্রোমাইটের আন্তর্জাতিক বাজারে ব্যাপক চাহিদা রয়েছে।

আনুমানিক ২০০ মিলিয়ন টন লৌহ আকরিকের মজুতও বেলুচিস্তানে রয়েছে। ফলে এখানে বৃহৎ লৌহ ও ইস্পাতশিল্প গড়ে তোলার উল্লেখযোগ্য সম্ভাবনা রয়েছে। অন্যদিকে, বিদ্যুৎ উৎপাদনের অন্যতম প্রধান জ্বালানি কয়লার আনুমানিক ১৮৫ বিলিয়ন টন মজুত এ প্রদেশে বিদ্যমান, যা দেশের জ্বালানি চাহিদার একটি বড় অংশ পূরণ করতে সক্ষম। তবে অবকাঠামো ও বিনিয়োগের ঘাটতির কারণে এ সম্পদের অধিকাংশ এখনো উত্তোলিত হয়নি।

পাকিস্তান গোয়াদার এবং বেলুচিস্তানের অন্যান্য উপকূলীয় এলাকাকে চীনের একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত ঘাঁটিতে পরিণত করছে। এ অঞ্চলে বিপুলসংখ্যক সামরিক ঘাঁটি ও সেনানিবাস স্থাপন করা হয়েছে। ২০১৭ সালে পাকিস্তান গোয়াদার বন্দর ৪০ বছরের জন্য একটি চীন-সমর্থিত প্রতিষ্ঠানের কাছে ইজারা দেয়। বর্তমানে চায়না ওভারসিজ পোর্ট হোল্ডিং কোম্পানি বন্দরটির উন্নয়ন ও পরিচালনার দায়িত্ব পালন করছে।

চীন গোয়াদারে বন্দরনগরী নির্মাণ, ৩০০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন এবং ২৩ কোটি মার্কিন ডলার ব্যয়ে একটি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর নির্মাণে শত শত কোটি ডলার বিনিয়োগ করেছে। পাশাপাশি চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোরের (সিপিইসি) আওতায় আরও বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। জিওয়ানি, সোনমিয়ানি ও অন্যান্য এলাকায় নতুন সামরিক ঘাঁটি গড়ে তোলা হচ্ছে। এর ফলে বহু বেলুচ অধিবাসী কোনো যথাযথ ক্ষতিপূরণ ছাড়াই জমি ও জীবিকার সুযোগ হারাচ্ছেন।

১৯৯০ দশকের শুরুতে পাকিস্তান এম-৯ ও এম-১১ ক্ষেপণাস্ত্র সংগ্রহে আগ্রহ প্রকাশ করলে চীন ১৯৯৩ সালে সেগুলো সরবরাহ করে। এর বিনিময়ে চীনের রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন মেটালার্জিক্যাল করপোরেশন অব চায়না (এমসিসি) সম্পদসমৃদ্ধ চাগাই অঞ্চল ২০ বছরের জন্য ইজারা পায়। প্রতিষ্ঠানটি সাইন্দাক ও রেকো দিক এলাকায় তামা ও সোনার উল্লেখযোগ্য খনিজভাণ্ডার শনাক্ত করে।

২০০২ সাল থেকে এমসিসি সাইন্দাকে তামা ও সোনা উত্তোলন শুরু করে। সে সময় প্রতিষ্ঠানটির বার্ষিক উৎপাদন ছিল প্রায় ২৫ হাজার টন তামা এবং উল্লেখযোগ্য পরিমাণ সোনা। প্রকল্প থেকে অর্জিত মুনাফার ৫০ শতাংশ প্রতিষ্ঠানটি নিজে রাখত, কেন্দ্রীয় সরকার পেত ৪৮ শতাংশ এবং বেলুচিস্তানের অংশ ছিল মাত্র ২ শতাংশ।

বেলুচ আন্দোলনের কর্মী ও মানবাধিকারকর্মীরা শত শত কোটি ডলারের সিপিইসি প্রকল্পের বিরোধিতা করে আসছেন। তাদের অভিযোগ, এই প্রকল্পের মাধ্যমে বেলুচিস্তানের প্রাকৃতিক সম্পদ শোষণ করা হচ্ছে। তাদের মতে, প্রকল্পগুলোতে পরিকল্পিতভাবে বেলুচ জনগণকে উপেক্ষা করা হয়েছে; তারা যেমন কর্মসংস্থান ও উন্নয়নের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়েছে, তেমনি বহু মানুষকে নির্মাণকাজের জন্য জোরপূর্বক উচ্ছেদও করা হয়েছে।

পিইসি, বেলুচিস্তানের খনিজ শোষণ

চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোর (সিপিইসি) চীন ও পাকিস্তানের মধ্যে একটি বৃহৎ দ্বিপক্ষীয় অবকাঠামো প্রকল্প। এর আওতায় প্রায় ৩ হাজার কিলোমিটার দীর্ঘ সড়ক, রেলপথ ও পাইপলাইনের নেটওয়ার্ক নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে, যা চীন, পাকিস্তান এবং এ অঞ্চলের অন্যান্য দেশের মধ্যে বাণিজ্য সহজতর করবে। প্রকল্পটির ঘোষিত লক্ষ্য পাকিস্তানের অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং চীনের জিনজিয়াং প্রদেশকে গোয়াদার ও করাচি বন্দরের সঙ্গে সংযুক্ত করা। এর মাধ্যমে দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্যিক যোগাযোগ আরও সম্প্রসারিত হওয়ার কথা বলা হয়।

সিপিইসি প্রকল্পের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন হয় ২০১৫ সালের ২০ এপ্রিল। এ সময় তৎকালীন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফ এবং চীনের রাষ্ট্রপতি শি জিনপিং ৪৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার মূল্যের ৫১টি চুক্তি ও সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষর করেন।

জেলাভিত্তিক বেলুচিস্তানের খনিজ সম্ভাবনা

সোনা ও তামা

রেকো দিকে আনুমানিক ৫.৮৭ বিলিয়ন টন তামার আকরিক এবং ৪২ মিলিয়ন আউন্স সোনার মজুত রয়েছে। সাইন্দাকে তামার মজুত প্রায় ৪১২ মিলিয়ন টন এবং দশ্ত-ই-কাইনে প্রায় ৪০০ মিলিয়ন টন বলে উল্লেখ করা হয়। এসব স্থানে তামা প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানা স্থাপনের দাবি দীর্ঘদিন ধরে উত্থাপিত হয়ে আসছে।

লৌহ আকরিক

বেলুচিস্তানে প্রায় ৭৫ মিলিয়ন টন লৌহ আকরিকের মজুত রয়েছে। চাগাই অঞ্চলের পাচিন কোহ, চিগেন্দিক ও চিলগাজি এলাকায় এ সম্পদ উল্লেখযোগ্য পরিমাণে পাওয়া যায়। লৌহ আকরিক পরিশোধন ও প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প স্থাপনের সম্ভাবনাও রয়েছে।

মার্বেল

চাগাই ও এর আশপাশের এলাকায় অনিক্স মার্বেলের উল্লেখযোগ্য মজুত রয়েছে। জুলিলে প্রায় ১০ মিলিয়ন টন, মাশকিচায় ১২ মিলিয়ন টন এবং বুটুকে ১৫ মিলিয়ন টন মার্বেল মজুত রয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়। নির্মাণশিল্প ও ভাস্কর্য তৈরিতে ব্যবহারের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারেও এ খনিজের চাহিদা রয়েছে।

সালফার

চাগাই জেলার কোহ-ই-সুলতান নামের বিলুপ্ত আগ্নেয়গিরির দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিম অংশে সালফারের প্রধান মজুত অবস্থিত। এ অঞ্চলে প্রায় ৫০ মিলিয়ন টন সালফার রয়েছে বলে ধারণা করা হয়। রাসায়নিক শিল্পে এর ব্যাপক ব্যবহার রয়েছে।

ক্রোমাইট

এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে খুজদার-পিশিন এবং মুসলিম বাগ-কিল্লা সাইফউল্লাহ অঞ্চলে ক্রোমাইট উত্তোলন হয়ে আসছে। এসব এলাকা থেকে প্রতিবছর প্রায় অর্ধ মিলিয়ন টন ক্রোমিয়াম আকরিক উৎপাদিত হয়। খুজদার, বেলা, ঝোব ও ডালবন্দিন এলাকাতেও ক্রোমাইটের মজুত শনাক্ত হয়েছে।

টাইটানিয়াম

টাইটানিয়াম এবং এর সংকর ধাতু সামরিক ও বেসামরিক বিমান, রকেট, ক্ষেপণাস্ত্র এবং বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে ব্যবহৃত হয়। জিয়ারত এলাকায় টাইটানিয়ামের উপস্থিতি পাওয়া গেছে এবং এ খনিজভিত্তিক শিল্প স্থাপনের সম্ভাবনার কথাও বলা হয়।

জিপসাম ও নিকেল

সিবি, বারখান, কোহলু ও লোরালাই জেলায় জিপসামের উল্লেখযোগ্য মজুত রয়েছে। পাশাপাশি মুসলিম বাগ ও ঝোব জেলায় নিকেলসমৃদ্ধ আকরিকের সন্ধান পাওয়া গেছে।

কয়লা

দেগারি, সিনজিদি, মাচ, পীর ইসমাইল, জিয়ারত, দুকি ও চামালাং এলাকায় মোট প্রায় ২১৭ মিলিয়ন টন কয়লার মজুত রয়েছে। এসব এলাকায় কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের সম্ভাবনা নিয়ে দীর্ঘদিন আলোচনা চলছে।

ব্যারাইট

পাকিস্তান বিশ্বের অন্যতম ব্যারাইট উৎপাদক দেশ হিসেবে পরিচিত। খুজদার অঞ্চল একাই উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ব্যারাইট উৎপাদন করে। এ খনিজ রাসায়নিক শিল্পে গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহৃত হয়।

টাংস্টেন, সীসা ও দস্তা

চাগাই জেলার আমালাফ এলাকায় টাংস্টেন, মলিবডেনাম ও টিনের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। অন্যদিকে, লাসবেলা ও চাগাই অঞ্চলে ২৬ মিলিয়ন টনেরও বেশি সীসা ও দস্তার আকরিকের মজুত রয়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

১. চামালাং কয়লা খনি

চামালাং কয়লাখনি কোহলু ও বারখান জেলা জুড়ে বিস্তৃত এবং প্রধানত লোরালাই অঞ্চলে অবস্থিত। প্রায় ৫০০ বর্গমাইল এলাকাজুড়ে বিস্তৃত এই খনি প্রথম আবিষ্কৃত হয় ১৮৮৫ সালে, যখন অঞ্চলটি ব্রিটিশ শাসনের অধীনে ছিল। চামালাংকে এশিয়ার অন্যতম বৃহৎ কয়লাক্ষেত্র হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

২০০৭ সালে বাণিজ্যিকভাবে খননকাজ শুরু হওয়ার পর থেকে প্রায় ১.৫ মিলিয়ন টন কয়লা উত্তোলিত হয়েছে, যা থেকে প্রায় ৬ বিলিয়ন রুপি রাজস্ব অর্জিত হয়েছে। এখানে প্রায় ৫০০ মিলিয়ন টন কয়লার মজুত রয়েছে বলে দাবি করা হয়, যার আনুমানিক মূল্য ২ হাজার বিলিয়ন রুপি।

চামালাংয়ের কয়লার মান বেলুচিস্তানের অন্যান্য কয়লাক্ষেত্রের তুলনায় উন্নত বলে বিবেচিত হয়। বর্তমানে উৎপাদিত কয়লার প্রায় ৮০ শতাংশ ইটভাটায় ব্যবহৃত হয় এবং অবশিষ্ট অংশ সিমেন্টশিল্পে ব্যবহৃত হয়। আমদানিকৃত কয়লার সঙ্গে মিশিয়েও এটি ব্যবহার করা হয়, ফলে উৎপাদন ব্যয় তুলনামূলকভাবে কমে আসে।

২. দুদ্দার সীসা-দস্তা খনি প্রকল্প

দুদ্দার সীসা-দস্তা খনি প্রকল্পটি পাকিস্তানের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বেলুচিস্তান প্রদেশের লাসবেলা জেলায় অবস্থিত। এটি করাচি থেকে প্রায় ১৩৫ কিলোমিটার উত্তরে কানরাজ উপত্যকার দুদ্দার এলাকায় অবস্থিত। এটি পাকিস্তানের প্রথম ভূগর্ভস্থ ধাতু খনি প্রকল্প হিসেবে পরিচিত।

প্রকল্পটির বিনিয়োগকারী ও উন্নয়নকারী চীনের রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন চায়না মেটালার্জিক্যাল কনস্ট্রাকশন কর্পোরেশন (এমসিসি)। নির্মাণ ও উৎপাদন কার্যক্রম পরিচালনা করে চায়না হুয়ায়ে গ্রুপ। এমএইচডি (এমসিসি হুয়ায়ে দুদ্দার মাইনিং কোম্পানি) প্রকল্পটির ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে রয়েছে। প্রকল্পটির উচ্চপর্যায়ের ব্যবস্থাপনায় মূলত চীনা কর্মকর্তারা দায়িত্ব পালন করেন, যাঁদের পাকিস্তানি কর্মীরা সহযোগিতা করেন।

দুদ্দার খনিতে আনুমানিক ৫০ মিলিয়ন টন আকরিকের মজুত রয়েছে। এর মধ্যে আকরিকে সীসার গড় উপস্থিতি ৩.২ শতাংশ এবং দস্তার গড় উপস্থিতি ৮.৬ শতাংশ। প্রকল্পটির কার্যক্রম ২০০৫ সালে শুরু হলেও কঠিন ভূতাত্ত্বিক পরিস্থিতির কারণে তা সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যায়। পরে উৎপাদন পর্যায়ে নিয়ে যেতে প্রায় ২৩৬ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগ করা হয়। এর মধ্যে এমসিসি প্রায় ১০৮ মিলিয়ন ডলার এবং এমএইচডি প্রায় ১০১ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করে।

প্রতি মাসে দুদ্দার খনি থেকে শত শত ট্রাক খনিজ বহন করে উইন্ডার হয়ে করাচি বন্দরের দিকে যায়। সেখান থেকে খনিজগুলো জাহাজে করে চীনে পাঠানো হয় প্রক্রিয়াজাতকরণের জন্য। দুদ্দার-উইন্ডার সড়কটি পাকিস্তান সরকারের নির্মিত এ অঞ্চলের অন্যতম প্রধান পাকা সড়ক এবং মূলত খনিজ পরিবহনের জন্য ব্যবহৃত হয়।

২০১৪ সালে এমএইচডি প্রকল্পটির নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করে। ২০১৯ সালে প্রকল্পটির বার্ষিক উৎপাদনক্ষমতা প্রায় পাঁচ লাখ টনে উন্নীত হয়।

তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, আধুনিক খনি প্রযুক্তি ব্যবহৃত হলেও প্রকল্পসংলগ্ন এলাকার মানুষের জীবনযাত্রার মানে তেমন উন্নতি ঘটেনি। বহু গ্রাম এখনও মৌলিক নাগরিক সুবিধা, স্বাস্থ্যসেবা ও মানসম্মত শিক্ষা থেকে বঞ্চিত। স্থানীয় রাজনৈতিক কর্মী কমরেড সেলিম বালোচের ভাষ্য অনুযায়ী, কানরাজ অঞ্চলে এখনো পর্যাপ্ত হাসপাতাল, চিকিৎসা সরঞ্জাম কিংবা মানসম্মত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠেনি। মেয়েদের জন্য একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং ছেলেদের জন্য একটি উচ্চবিদ্যালয় থাকলেও সেগুলোর অবস্থা অত্যন্ত নাজুক।

লাসবেলা থেকে নির্বাচিত জাতীয় পরিষদের সদস্য (এমএনএ) আসলাম ভুতানি এক সাক্ষাৎকারে বলেন, বেলুচিস্তানের বিভিন্ন প্রকল্প, বিশেষ করে চীনা পরিচালিত দুদ্দার খনি প্রকল্পের প্রধান সুবিধাভোগী স্থানীয় জনগণ নন। তাঁর মতে, বেলুচিস্তানের সম্পদ আহরণে স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ ও প্রাপ্তি নিশ্চিত না হওয়ায় বঞ্চনা ও বিচ্ছিন্নতার অনুভূতি আরও তীব্র হয়েছে।

৩. সাইন্দাক কপার-গোল্ড প্রকল্প

সাইন্দাক কপার-গোল্ড খনি চাগাই জেলার সাইন্দাক শহরের নিকটে অবস্থিত। ১৯৭০-এর দশকে একটি চীনা প্রকৌশল প্রতিষ্ঠানের সহায়তায় এখানে তামা ও সোনার খনিজভাণ্ডার শনাক্ত করা হয়।

এ খনিতে আনুমানিক ৪১২ মিলিয়ন টন আকরিকের মজুত রয়েছে, যার মধ্যে প্রায় ১.৬৯ মিলিয়ন টন অর্থনৈতিকভাবে উত্তোলনযোগ্য বলে উল্লেখ করা হয়। প্রকল্পটির বার্ষিক উৎপাদনক্ষমতা প্রায় ১৫,৮০০ টন কপার ব্লিস্টার, ১.৪৭ টন সোনা এবং ২.৭৬ টন রুপা।

পাকিস্তান সরকারের মালিকানাধীন সাইন্দাক মেটালস লিমিটেড (এসএমএল) ১৯৯৫ সালে প্রায় ১৩.৫ বিলিয়ন রুপি ব্যয়ে প্রকল্পটি নির্মাণ করে। পরে ২০০২ সালে পাকিস্তান সরকার ও চীনের মধ্যে ৩৫০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের একটি চুক্তির মাধ্যমে প্রকল্পটি পুনরায় চালু করা হয়। এসএমএল এবং চীনের এমসিসি রিসোর্সেস ডেভেলপমেন্ট কোম্পানি লিমিটেড (এমআরডিএল)-এর মধ্যে সম্পাদিত চুক্তির মেয়াদ একাধিকবার বাড়ানো হয় এবং বর্তমানে তা ২০৩৫ সাল পর্যন্ত সম্প্রসারিত হয়েছে।

চুক্তি অনুযায়ী প্রকল্প থেকে অর্জিত আয়ের ৪৯ শতাংশ এমসিসি পায়, ৫১ শতাংশ পাকিস্তান সরকারের কাছে যায় এবং নির্ধারিত হারে রয়্যালটি প্রদান করা হয়।

এমসিসির চেয়ারম্যানের দাবি অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটি এ প্রকল্প থেকে পাকিস্তান সরকারকে কয়েক শ মিলিয়ন মার্কিন ডলার রাজস্ব প্রদান করেছে। তবে কয়েকজন বিশেষজ্ঞ এ হিসাব নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁদের অভিযোগ, প্রকৃত উৎপাদন, সোনা, রুপা ও অন্যান্য খনিজ আহরণের পূর্ণাঙ্গ তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।

সমালোচকদের মতে, খনি প্রকল্পের আর্থিক হিসাবের পাশাপাশি স্থানীয় জনগণের স্বাস্থ্য, শিক্ষা, বিশুদ্ধ পানি, বিদ্যুৎ এবং অবকাঠামো উন্নয়নে কত অর্থ ব্যয় হয়েছে, সে সম্পর্কেও স্বচ্ছ তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।

১৯৭৪ সালে শুরু হওয়া এ প্রকল্প থেকে দীর্ঘমেয়াদে উল্লেখযোগ্য রাজস্ব আয়ের সম্ভাবনার কথা বলা হলেও স্থানীয় জনগণের দাবি, প্রকল্পের সুফল তাদের জীবনে প্রত্যাশিতভাবে প্রতিফলিত হয়নি।

প্রাথমিক চুক্তি অনুযায়ী প্রকল্প থেকে অর্জিত রাজস্বের বড় অংশ চীনা কোম্পানি ও পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকারের মধ্যে বণ্টিত হয় এবং বেলুচিস্তানের জন্য রয়্যালটির হার তুলনামূলকভাবে কম নির্ধারণ করা হয়েছিল। এ বিষয়টি দীর্ঘদিন ধরে বিতর্কের বিষয় হয়ে আছে।

এছাড়া স্থানীয়দের অভিযোগ, সাইন্দাকসহ বিভিন্ন খনিজ প্রকল্পে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থার কারণে সাধারণ মানুষ প্রকল্প এলাকায় প্রবেশ করতে পারেন না এবং খনিজসম্পদ আহরণ থেকে প্রকৃত আয় বা সুবিধা সম্পর্কেও তাদের কাছে পর্যাপ্ত তথ্য প্রকাশ করা হয় না।

৪. রেকো দিক প্রকল্প

রেকো দিক বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ তামা ও সোনার খনি। এখানে আনুমানিক ৫.৯ বিলিয়ন টন আকরিক, গড়ে ০.৪১ শতাংশ তামা এবং প্রায় ৪১.৫ মিলিয়ন আউন্স সোনার মজুত রয়েছে। খনিটির সম্ভাব্য উৎপাদনকাল কমপক্ষে ৪০ বছর বলে ধারণা করা হয়।

১৯৯৩ সালে অস্ট্রেলিয়ার ব্রোকেন হিল প্রোপ্রাইটারি কোম্পানি (বিএইচপি) এবং বেলুচিস্তান ডেভেলপমেন্ট অথরিটি (বিডিএ) চাগাই হিলস এক্সপ্লোরেশন জয়েন্ট ভেঞ্চার অ্যাগ্রিমেন্ট (সিএইচইজেভিএ) নামে একটি চুক্তি স্বাক্ষর করে। পরবর্তীতে ২০০৬ সালে টেথিয়ান কপার কোম্পানি (টিসিসি), যা ব্যারিক গোল্ড ও আন্তোফাগাস্তা যৌথভাবে পরিচালনা করত, প্রকল্পটির অধিকার গ্রহণ করে।

২০১১ সালে পাকিস্তানের সুপ্রিম কোর্ট সিএইচইজেভিএ চুক্তিকে অবৈধ ঘোষণা করে। এরপর বেলুচিস্তান সরকার খনির ইজারা দিতে অস্বীকৃতি জানায় এবং বিষয়টি আন্তর্জাতিক সালিশে গড়ায়। দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়ার পর ২০২২ সালে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে একটি সমঝোতা হয়। এর ফলে ব্যারিক গোল্ড নতুন করে খনির ইজারা ও অনুসন্ধান লাইসেন্স লাভ করে এবং প্রকল্পের উন্নয়নকাজ শুরু করে।

সরকারি তথ্যমতে, প্রকল্পের পুরো মেয়াদকালে আর্থিক সুবিধার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ বেলুচিস্তান সরকারের জন্য নির্ধারিত হয়েছে। পাশাপাশি উন্নয়ন পর্যায়ে প্রায় ৮,০০০ এবং উৎপাদন পর্যায়ে প্রায় ৩,০০০ কর্মসংস্থান সৃষ্টির পরিকল্পনার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।

রেকো দিক নিয়ে বিতর্ক

সমালোচকদের মতে, রেকো দিকের বিপুল খনিজসম্পদের প্রকৃত সুবিধা স্থানীয় জনগণের কাছে পৌঁছায়নি। তাঁদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে বহুজাতিক কোম্পানি ও কেন্দ্রীয় সরকারের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে, অথচ বেলুচ জনগণের সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন নিশ্চিত করা হয়নি।

বিভিন্ন সূত্রে দাবি করা হয়, রেকো দিকের খনিজসম্পদের সম্ভাব্য মূল্য শত শত বিলিয়ন মার্কিন ডলার। সমালোচকদের মতে, এই সম্পদের আয় যদি স্থানীয় উন্নয়নে ব্যয় করা হতো, তবে উন্নত হাসপাতাল, বিশ্ববিদ্যালয়, শিল্পকারখানা, সেচব্যবস্থা, বাঁধ এবং আধুনিক অবকাঠামো নির্মাণের মাধ্যমে বেলুচিস্তানের জীবনমান উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নত করা সম্ভব হতো।

রেকো দিককে বিশ্বের পঞ্চম বৃহত্তম তামা ও সোনার খনি বলেও বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। এর বিপুল খনিজসম্পদের কারণে এটি আন্তর্জাতিক খনি কোম্পানি ও বিভিন্ন রাষ্ট্রের কৌশলগত আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।

সুই গ্যাস ও সম্পদ বণ্টন

১৯৫৩ সালে ডেরা বুগতির সুই এলাকায় প্রাকৃতিক গ্যাস আবিষ্কৃত হওয়ার পর তা দ্রুত পাকিস্তানের বিভিন্ন অঞ্চলে সরবরাহ শুরু হয়। কয়েক দশক ধরে সুই গ্যাস শিল্প, বিদ্যুৎ উৎপাদন, আবাসিক ব্যবহার এবং বাণিজ্যিক কার্যক্রমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।

বেলুচ জাতীয়তাবাদী সংগঠন ও স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের অভিযোগ, সুই গ্যাস থেকে অর্জিত বিপুল অর্থনৈতিক সুবিধার তুলনায় বেলুচিস্তান খুব সামান্য অংশ পেয়েছে। তাঁদের দাবি, গ্যাস উত্তোলনকারী অঞ্চল হওয়া সত্ত্বেও দীর্ঘ সময় পর্যন্ত বেলুচিস্তানের বহু এলাকায় গ্যাসসংযোগ পৌঁছায়নি।

সমালোচকদের মতে, কয়েক দশক ধরে গ্যাসসম্পদ ব্যবহার করে পাকিস্তানের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চল ও বড় শহর উপকৃত হলেও সম্পদ উৎপাদনকারী এলাকাগুলো কাঙ্ক্ষিত অবকাঠামো, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ থেকে বঞ্চিত থেকেছে।

কয়লা ও অন্যান্য খনিজসম্পদ

ব্রিটিশ আমল থেকে বেলুচিস্তানের বিভিন্ন কয়লাক্ষেত্র থেকে কয়লা উত্তোলন হয়ে আসছে। এসব কয়লা দীর্ঘদিন ধরে শিল্পকারখানা, ইটভাটা এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহৃত হয়েছে। একইভাবে তামা, সোনা, দস্তা, সীসা, ক্রোমাইট ও অন্যান্য খনিজও বিভিন্ন সময়ে বাণিজ্যিকভাবে আহরণ করা হয়েছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, এসব খনিজসম্পদ থেকে অর্জিত আয়ের স্বচ্ছ হিসাব কখনো প্রকাশ করা হয়নি এবং সম্পদসমৃদ্ধ এলাকাগুলোর উন্নয়নও প্রত্যাশিত মাত্রায় হয়নি।