ভারত মহাসাগরে শ্রীলঙ্কার দক্ষিণ উপকূলের কাছে মার্কিন নৌবাহিনীর সাবমেরিন থেকে ছোড়া একটি টর্পেডোর আঘাতে ইরানের যুদ্ধজাহাজ আইআরআইএস ডেনা ডুবে গেছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এই প্রথমবার কোনো মার্কিন সাবমেরিন থেকে নিক্ষিপ্ত টর্পেডোর আঘাতে একটি যুদ্ধজাহাজ ধ্বংস হওয়ার ঘটনা ঘটল বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে।
মার্কিন প্রতিরক্ষা সচিব পিট হেগসেথ এক প্রেস ব্রিফিংয়ে হামলার বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, ‘যুদ্ধজাহাজটি আমাদের টর্পেডোর আঘাতে ডুবে গেছে। এটি এক ধরনের ‘নীরব মৃত্যু’।’
তবে এখন পর্যন্ত হামলায় অংশ নেওয়া মার্কিন সাবমেরিনটির নাম প্রকাশ করেনি পেন্টাগন।
প্রকাশিত ভিডিও ও বিভিন্ন প্রতিবেদনে দেখা যায়, ইরানের যুদ্ধজাহাজটির পেছনের অংশে একটি টর্পেডো আঘাত হানে। আঘাতের সঙ্গে সঙ্গে বিশাল জলরাশি আকাশের দিকে উঠে যায় এবং বিস্ফোরণের পর জাহাজটির মূল কাঠামো দ্বিখণ্ডিত হয়ে যায়।
প্রতিরক্ষা দপ্তরের প্রকাশিত একটি ছবিতে দেখা গেছে, ডুবে যাওয়ার আগে যুদ্ধজাহাজটির সামনের অংশ খাড়াভাবে ওপরে উঠে আছে।
শ্রীলঙ্কার পররাষ্ট্রমন্ত্রী বিজিথা হেরাথ জানিয়েছেন, জাহাজটিতে প্রায় ১৮০ জন নাবিক ছিলেন। শ্রীলঙ্কার নৌবাহিনী উদ্ধার অভিযান চালাচ্ছে। এখন পর্যন্ত ৩২ জনকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে এবং বাকিদের খোঁজে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শ্রীলঙ্কার দক্ষিণ উপকূলে এই হামলা ঘটেছে, যা মার্কিন ইন্দো-প্যাসিফিক কমান্ড–এর দায়িত্বপ্রাপ্ত এলাকায় পড়ে।
মার্কিন কর্মকর্তাদের মতে, হামলায় ব্যবহৃত হয়েছে- এমকে-48 হেভিওয়েট টর্পেডো। ১৯৭২ সালে প্রথম চালু হওয়া এই টর্পেডো সময়ের সঙ্গে বিভিন্ন আধুনিক সংস্করণে উন্নত করা হয়েছে।
টর্পেডোর বৈশিষ্ট্যগুলো
ব্যাস : ২১ ইঞ্চি
মোট ওজন : প্রায় ৩,৭৪৪–৩,৮০০ পাউন্ড
ওয়ারহেড : প্রায় ৬৫০ পাউন্ড উচ্চ বিস্ফোরক
লক্ষ্য শনাক্তকরণ : সোনার সেন্সর
টর্পেডোটি সাধারণত জাহাজের নিচে গিয়ে বিস্ফোরিত হয়। এতে সৃষ্ট গ্যাসের বিশাল বুদ্বুদ জাহাজের নিচের কাঠামো বা ‘মেরুদণ্ড’ ভেঙে দেয়, ফলে জাহাজটি দ্রুত দুই ভাগ হয়ে ডুবে যায়।
২০২৫ অর্থবছরের মার্কিন নৌবাহিনীর বাজেট অনুযায়ী, একটি এমকে-48 টর্পেডোর মূল্য প্রায় ৪.২ মিলিয়ন ডলার।
প্রতিরক্ষা শিল্প প্রতিষ্ঠান লকহিড মার্টিন জানিয়েছে, এই টর্পেডো সাবমেরিনের সঙ্গে তারের মাধ্যমে সংযুক্ত থেকে রিয়েল-টাইমে পরিচালিত হতে পারে। এতে অপারেটররা লক্ষ্যবস্তুর তথ্য আপডেট করতে এবং টর্পেডোর গতিপথ পরিবর্তন করতে পারেন।
যদি তারের সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়, তখন এটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিজস্ব ডিজিটাল গাইডেন্স ও সিগন্যাল প্রসেসিং সিস্টেম ব্যবহার করে লক্ষ্যবস্তুর দিকে অগ্রসর হয়।
সময়ের সঙ্গে এমকে-48 টর্পেডো বিভিন্ন ‘মড’ সংস্করণে উন্নত হয়েছে। বর্তমানে ব্যবহৃত মড-7 সংস্করণটি রয়্যাল অস্ট্রেলিয়ান নেভির সঙ্গে যৌথভাবে তৈরি করা হয়েছে। এছাড়া মড-8 এবং মড-9 সংস্করণ উন্নয়নের কাজও চলছে।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট
১৯৪৫ সালের ১৪ আগস্ট মার্কিন নৌবাহিনীর সাবমেরিন ‘ইউএসএস র্ট্রাস্কস’ থেকে নিক্ষিপ্ত টর্পেডোর আঘাতে জাপানের একটি প্রায় ৭৫০ টনের জাহাজ ডুবে যায়। এরপর দীর্ঘ সময় ধরে মার্কিন সাবমেরিনগুলো মূলত গোয়েন্দা ও কৌশলগত মিশনে ব্যবহৃত হলেও সরাসরি টর্পেডো দিয়ে যুদ্ধজাহাজ ধ্বংসের ঘটনা আর ঘটেনি।
পরবর্তীতে অপারেশন ডেজার্ট স্টর্ম থেকে শুরু করে ইরাক, আফগানিস্তান, লিবিয়া, সোমালিয়া এবং ইয়েমেনে মার্কিন সাবমেরিনগুলো প্রধানত ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র বা টমাহক মিসাইল ব্যবহার করে হামলা চালিয়েছে।
ইরানের ইসলামিক প্রজাতন্ত্র নৌবাহিনীর দক্ষিণ নৌবহরের অধীনস্থ মজ-ক্লাস ফ্রিগেট আইআরআইএস ডেনা সম্প্রতি বারতসাগরে একটি নৌ মহড়ায় অংশ নেওয়ার পর ভারত মহাসাগরের ওই অঞ্চলে অবস্থান করছিল বলে জানা গেছে।

