জোরপূর্বক শ্রমের মাধ্যমে উৎপাদিত পণ্যের বাণিজ্য ঠেকাতে ব্যর্থ হওয়ার অভিযোগ তুলে বাংলাদেশসহ বিশ্বের ৬০টি দেশের আমদানিপণ্যের ওপর নতুন করে শুল্ক আরোপের প্রস্তাব দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। প্রস্তাবটি কার্যকর হলে বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি হওয়া পণ্য, বিশেষ করে তৈরি পোশাক খাত বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। গতকাল বুধবার বিবিসির এক প্রতিবেদনে এমন তথ্য উঠে এসেছে।
প্রতিবেদন অনুসারে যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেড রিপ্রেজেন্টেটিভ (ইউএসটিআর) জানিয়েছে, শ্রমিক ও তাদের কর্মপরিবেশ নিয়ে পরিচালিত তদন্তে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে এই প্রস্তাব তৈরি করা হয়েছে। সংস্থাটির ভাষ্য, এটি অন্যায্য বাণিজ্য অনুশীলন সংক্রান্ত তদন্তের সর্বশেষ ফলাফল।
ইউএসটিআরের প্রস্তাবিত তালিকায় বাংলাদেশ ছাড়াও চীন, ভারত, পাকিস্তান, কানাডা, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, ইন্দোনেশিয়া, মেক্সিকো, কম্বোডিয়া, মালয়েশিয়া, জাপানসহ ৬০টি দেশের নাম রয়েছে। প্রস্তাব অনুযায়ী, এসব দেশের পণ্যের ওপর ১০ শতাংশ অথবা ১২ দশমিক ৫ শতাংশ পর্যন্ত অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ করা হতে পারে।
শ্রমিক অধিকারকে গুরুত্ব : প্রস্তাবে পণ্য উৎপাদনের ক্ষেত্রে শ্রমিকদের অধিকার ও কর্মপরিবেশকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ইউএসটিআরের দাবি, বাণিজ্য অংশীদার দেশগুলো জোরপূর্বক শ্রমের মাধ্যমে পণ্য উৎপাদন বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হওয়ায় এ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেড রিপ্রেজেন্টেটিভ জেমসন গ্রিয়ার এক বিবৃতিতে বলেন, ‘জোরপূর্বক শ্রমের মাধ্যমে তৈরি পণ্য আমদানির বিষয়টি মোকাবিলায় আমাদের গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য অংশীদারদের ব্যর্থতা অগ্রহণযোগ্য।’
তিনি আরও বলেন, ‘এটি এমন একটি পরিস্থিতির সৃষ্টি করে, যেখানে আমেরিকান শ্রমিকরা বিশ্ববাজারে অসম প্রতিযোগিতার মুখে পড়তে বাধ্য হন।’
উল্লেখ্য, বাংলাদেশসহ কয়েকটি দেশের উৎপাদন খাতে অতিরিক্ত সক্ষমতা বা অতিরিক্ত উৎপাদন হচ্ছে কি না এবং জোরপূর্বক শ্রম ব্যবহারের বিরুদ্ধে কতটা কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে, তা খতিয়ে দেখতে চলতি বছরের মার্চ মাসে তদন্ত শুরু করেছিল যুক্তরাষ্ট্র।
কোন দেশে কত শুল্ক : গত মঙ্গলবার ট্রাম্প প্রশাসন ৬০টি দেশের আমদানিপণ্যের ওপর ১০ শতাংশ অথবা ১২ দশমিক ৫ শতাংশ অতিরিক্ত শুল্ক আরোপের প্রস্তাব দেয়। যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, এসব দেশের বাণিজ্যিক কার্যক্রমের কারণে মার্কিন বাণিজ্য ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানায়, গত ফেব্রুয়ারিতে দেশটির সুপ্রিম কোর্ট জরুরি শুল্কব্যবস্থা বাতিল করার পর যুক্তরাষ্ট্র বর্তমানে নতুন শুল্ক কাঠামো পুনর্গঠনের প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে এই পদক্ষেপ নিচ্ছে।
ইউএসটিআর জানিয়েছে, যেসব দেশ এরই মধ্যে জোরপূর্বক শ্রমের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে, অথবা দ্বিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয় বাণিজ্য চুক্তির মাধ্যমে এমন নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে ১০ শতাংশ অতিরিক্ত শুল্ক আরোপের প্রস্তাব করা হয়েছে। এই তালিকায় রয়েছে বাংলাদেশ, কানাডা, ইকুয়েডর, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, ইন্দোনেশিয়া, মেক্সিকো, পাকিস্তান, আর্জেন্টিনা, কম্বোডিয়া, এল সালভাদর, গুয়াতেমালা, মালয়েশিয়া, তাইওয়ান ও যুক্তরাজ্য। অন্যদিকে বাকি ৪৫টি দেশের জন্য ১২ দশমিক ৫ শতাংশ অতিরিক্ত শুল্ক আরোপের প্রস্তাব করা হয়েছে।
পোশাক খাতে প্রভাবের আশঙ্কা : নতুন প্রস্তাবে একটি ‘টেক্সটাইল মেকানিজম’-এর কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। এর আওতায় নির্দিষ্ট পরিমাণ পোশাক ও টেক্সটাইল পণ্য হ্রাসকৃত শুল্ক হারে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের সুযোগ পাবে। তবে এই সুবিধার আওতা, হার বা পরিমাণ সম্পর্কে এখনো বিস্তারিত প্রকাশ করা হয়নি।
রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, ট্রাম্প প্রশাসন ২০ ফেব্রুয়ারি যে ১০ শতাংশ অস্থায়ী শুল্ক আরোপ করেছিল, তার মেয়াদ আগামী ২৪ জুলাই শেষ হওয়ার কথা রয়েছে। দেশটির সুপ্রিম কোর্টের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ওই সময়ের পর আন্তর্জাতিক জরুরি অর্থনৈতিক ক্ষমতা আইনের অধীনে প্রেসিডেন্টের শুল্ক আরোপের ক্ষমতা আর বহাল থাকবে না।
এদিকে ইউএসটিআর জানিয়েছে, চীনসহ ১৬টি বাণিজ্য অংশীদার দেশের অতিরিক্ত শিল্প সক্ষমতা বৃদ্ধির বিষয়ে পরিচালিত তদন্তের ফলাফলও শিগগিরই প্রকাশ করা হবে।
যেসব পণ্য শুল্কমুক্ত থাকবে : জোরপূর্বক শ্রমসংক্রান্ত নতুন শুল্কের আওতার বাইরে রাখা হতে পারে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পণ্য। ইউএসটিআরের তথ্য অনুযায়ীÑ জ্বালানি, বিরল মৃত্তিকা ও নির্দিষ্ট কিছু ধাতু, গরুর মাংস, কফি, কিছু ফল ও সবজি, ওষুধ, জৈব রাসায়নিক এবং বিমানের যন্ত্রাংশ এই অতিরিক্ত শুল্কের আওতামুক্ত থাকবে।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন