× UCB Sticker Card
বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

ফেসবুক


ইউটিউব


টিকটক

Rupali Bangladesh

ইনস্টাগ্রাম

Rupali Bangladesh

এক্স

Rupali Bangladesh


লিংকডইন

Rupali Bangladesh

পিন্টারেস্ট

Rupali Bangladesh

গুগল নিউজ

Rupali Bangladesh


হোয়াটস অ্যাপ

Rupali Bangladesh

টেলিগ্রাম

Rupali Bangladesh

মেসেঞ্জার গ্রুপ

Rupali Bangladesh


En Bn

ইকবাল হাসান ফরিদ

প্রকাশিত: জুন ৪, ২০২৬, ০৫:৫৭ এএম

টিডিপি কর্মী শেলী হত্যা

চাকরিচ্যুত মেজরের গোপন সম্পর্কের রক্তাক্ত পরিণতি

ইকবাল হাসান ফরিদ

প্রকাশিত: জুন ৪, ২০২৬, ০৫:৫৭ এএম

চাকরিচ্যুত মেজরের গোপন  সম্পর্কের রক্তাক্ত পরিণতি

পুরান ঢাকার কদমতলীর একটি ভাড়া বাসা। কয়েক দিন ধরে দরজা বন্ধ। হঠাৎ চারপাশে ছড়িয়ে পড়ে তীব্র দুর্গন্ধ। প্রতিবেশীদের সন্দেহের পর পুলিশ এসে দরজা ভেঙে উদ্ধার করে এক নারীর অর্ধগলিত মরদেহ। নিহতের নাম শারমিন আক্তার শেলী। তিনি আনসারের টিডিপি (শহর প্রতিরক্ষাদল) কর্মী ছিলেন।

শুরুতে এটি ছিল রহস্যঘেরা একটি হত্যাকা-। তবে তদন্ত যত এগিয়েছে, ততই সামনে এসেছে প্রেম, প্রতারণা, গোপন সম্পর্ক, ঈর্ষা এবং অধিকারবোধের জটিল এক কাহিনি। যার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন সেনাবাহিনী থেকে চাকরিচ্যুত মেজর আব্দুল্লাহ আল মামুন। আর মামুনের জটিল সম্পর্ক বলয়ের করুণ পরিণতি হলো শেলীর মৃত্যু।

পুলিশের ভাষ্য, এটি শুধু একটি হত্যাকা- নয়; বরং একাধিক সম্পর্কের জটিলতা থেকে জন্ম নেওয়া পরিকল্পিত অপরাধ। সমাজ বিশ্লেষকদের মতে, ঘটনাটি আধুনিক নগরজীবনের এক নীরব সংকটের প্রতিচ্ছবি। যেখানে সম্পর্কের অস্বচ্ছতা ও অধিকারবোধ মানুষকে ভয়াবহ অপরাধের দিকে ঠেলে দিতে পারে।

গত ২৬ এপ্রিল কদমতলী থানার জুরাইন কমিশনার গলির ৯৮৪/১ নম্বর বাড়ির চতুর্থ তলার ফ্ল্যাট থেকে শেলীর মরদেহ উদ্ধার করা হয়। তিনি ওই বাসায় চাকরিচ্যুত মেজর আব্দুল্লাহ আল মামুনের সঙ্গে স্বামী-স্ত্রী পরিচয়ে বসবাস করতেন। প্রতিবেশীরাও তাদের দম্পতি হিসেবেই চিনতেন।

পুলিশ জানায়, তদন্তের শুরুতে সন্দেহের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন মামুন। সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, ২২ এপ্রিল রাতে তিনি (মামুন) বাসায় প্রবেশ করেন এবং পরদিন সকালে বের হয়ে যান। তাকে গ্রেপ্তার করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলেও তিনি হত্যার সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগ অস্বীকার করেন।

এই অবস্থায় চিন্তায় পড়লেও তদন্তকারীরা সেখানেই থমকে থাকেননি। তারা আরও ফুটেজ বিশ্লেষণ শুরু করেন। একপর্যায়ে তদন্তকারীরা এমন এক তথ্য পান, যা পুরো মামলার মোড় পুরোটাই ঘুরিয়ে দেয়।

সিসিটিভি বিশ্লেষণে পুলিশ দেখতে পায়, মামুন বেরিয়ে যাওয়ার কিছু সময় পর বোরকা পরা এক নারী ওই বাসায় প্রবেশ করেন। প্রযুক্তিগত তথ্য ও গোয়েন্দা অনুসন্ধানের মাধ্যমে তার পরিচয় শনাক্ত করে পুলিশ। তিনি মোহনা সুলতানা, যিনি মামুনের আরেক প্রেমিকা।

তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র রূপালী বাংলাদেশকে জানায়, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকের মাধ্যমে মামুন ও মোহনার পরিচয় হয়। একপর্যায়ে তাদের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে ওঠে। পরে মোহনা জানতে পারেন, মামুন আরেক নারীর সঙ্গে স্বামী-স্ত্রীর মতো বসবাস করছেন। এই তথ্য মেনে নিতে পারেননি মোহনা। তিনি গোপনে মামুনকে অনুসরণ করতে শুরু করেন। একসময় জুরাইনের শেলীর বাসার সন্ধান পান। জিজ্ঞাসাবাদে মোহনা পুলিশকে জানিয়েছেন, ২৩ এপ্রিল শেলীর সঙ্গে কথা বলতে ওই ফ্ল্যাটে গিয়ে দুজনের মধ্যে তর্কাতর্কি হয়। একপর্যায়ে ক্ষুব্ধ হয়ে তিনি শেলীকে ছুরিকাঘাত ও গলা কেটে হত্যা করেন। পরে কয়েক ঘণ্টা বাসায় অবস্থান করে কৌশলে সেখান থেকে বেরিয়ে যান।

২৬ এপ্রিল শেলীর মরদেহ উদ্ধারের পর তার মা শাহানা খাতুন কদমতলী থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন। মামলায় আসামি করা হয় আব্দুল্লাহ আল মামুনকে। মামলায় উল্লেখ করা হয়, ঘটনার ৭-৮ মাস আগে শেলীর সঙ্গে মামুনের পরিচয় হয়। এরপর তারা স্বামী-স্ত্রী পরিচয়ে ভাড়া বাসায় বসবাস শুরু করেন।

তদন্তে উঠে এসেছে, মামুনের ব্যক্তিগত জীবন দীর্ঘদিন ধরেই সম্পর্কের জটিলতায় আবদ্ধ ছিল। ২০২২ সালে পরকীয়াবিষয়ক অভিযোগের কারণে সেনাবাহিনী থেকে চাকরিচ্যুত হন তিনি। পরে প্রথম স্ত্রীর সঙ্গে বিচ্ছেদ ঘটে। এরপর দ্বিতীয় বিয়ে করেন এবং সেই সংসারে একটি সন্তানও রয়েছে।

এর মধ্যেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পরিচয় হয় শেলীর সঙ্গে। সম্পর্কের একপর্যায়ে তারা একসঙ্গে বসবাস শুরু করেন। কিন্তু শেলীর সঙ্গে সম্পর্ক চলমান থাকতেই মোহনাসহ আরও সম্পর্ক গড়ে তোলেন মামুন। সেই অস্বচ্ছ ও জটিল সম্পর্কের জালই শেষ পর্যন্ত রক্তাক্ত পরিণতি ডেকে আনে।

অপরাধ বিশ্লেষক অধ্যাপক ড. মো. ওমর ফারুক বলেন, অধিকাংশ প্রেমঘটিত হত্যাকা-ের পেছনে কাজ করে ঈর্ষা, প্রত্যাখ্যান এবং অধিকারবোধ। ভালোবাসা যখন পারস্পরিক সম্মানের পরিবর্তে মালিকানাবোধে রূপ নেয়, তখন তা বিপজ্জনক হয়ে ওঠে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ড. নেহাল করিম বলেন, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের কারণে সম্পর্ক তৈরি হচ্ছে দ্রুত, কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই দায়বদ্ধতা ও স্বচ্ছতার অভাব থাকছে। বাস্তবতা সামনে এলে অনেকে তা মানসিকভাবে গ্রহণ করতে পারেন না। তখন সংঘাত ভয়াবহ রূপ নেয়।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে পুলিশের এক কর্মকর্তা বলেন, এই ঘটনায় প্রকৃতপক্ষে প্রতারণার শিকার কে, সেই প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ। তদন্তে দেখা গেছে, শেলী, মোহনা এবং মামুনের পূর্ববর্তী স্ত্রী, প্রত্যেকেই কোনো না কোনোভাবে সত্য গোপনের শিকার হয়েছেন। এক ব্যক্তির অসততা শেষ পর্যন্ত একাধিক মানুষের জীবনকে বিপর্যস্ত করেছে।

কদমতলী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা শেখ আশরাফুজ্জামান জানান, মামুন ও মোহনা দুজনকেই গ্রেপ্তার করা হয়েছে। মোহনা আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনসহ অন্যান্য আলামত বিশ্লেষণ শেষে দ্রুত অভিযোগপত্র দাখিল করা হবে।

তদন্তকারীদের মতে, শেলী হত্যা মামলাটি শুধু একটি খুনের ঘটনা নয়; এটি সম্পর্কের অস্বচ্ছতা, গোপন জীবন এবং নিয়ন্ত্রণের মানসিকতার ভয়াবহ পরিণতির একটি বাস্তব উদাহরণ। যেখানে একজনের গোপন সম্পর্কের জালে আটকে শেষ পর্যন্ত প্রাণ হারাতে হয়েছে একজন নিরীহ নারীকে।

 

রূপালী বাংলাদেশ

Link copied!