সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি ও জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ঝুঁকিতে থাকা বাংলাদেশসহ বদ্বীপ রাষ্ট্রগুলোর সহায়তায় সমন্বিত পদক্ষেপ নিতে বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের (ডব্লিউইএফ) প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। গতকাল মঙ্গলবার চীনের দালিয়ানে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের প্রেসিডেন্ট ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) অ্যালোয়া জুইঙ্গির সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎকালে এ আহ্বান জানান সরকারপ্রধান। স্থানীয় সময় বিকেল ৫টায় ডব্লিউইএফের বার্ষিক সম্মেলনের ফাঁকে এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।
বৈঠকের শুরুতে বাংলাদেশের সরকারপ্রধান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করায় তারেক রহমানকে অভিনন্দন জানান জুইঙ্গি। এ সময় প্রধানমন্ত্রী জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় ডব্লিউইএফের বিভিন্ন উদ্যোগের প্রশংসা করেন। পরিবেশ রক্ষায় বাংলাদেশের অঙ্গীকারের কথা তুলে ধরে তারেক রহমান জানান, আগামী পাঁচ বছরে দেশজুড়ে ২৫ কোটি গাছ লাগানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া প্রায় ২০ হাজার কিলোমিটার নদী ও খাল পুনর্খননের মাধ্যমে পানির প্রবাহ পুনরুদ্ধার, বন্যার ঝুঁকি কমানো এবং পরিবেশ সুরক্ষায় পরিকল্পনার কথাও তুলে ধরেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রী আরও জানান, বাংলাদেশে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে উৎসাহিত করতে সরকার কর রেয়াত সুবিধা দিচ্ছে এবং ২০৩০ সালের মধ্যে মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের ২০ শতাংশ নবায়নযোগ্য জ¦ালানি থেকে অর্জনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
জলবায়ু মোকাবিলায় তারেক রহমানের অভিজ্ঞতা ও উদ্যোগগুলো বৈশ্বিক পর্যায়ে কাজে লাগানোর আগ্রহ প্রকাশ করেন ডব্লিউইএফ প্রধান। তিনি বলেন, জলবায়ু সহনশীলতা ও টেকসই উন্নয়নে বাংলাদেশের এই প্রচেষ্টা আন্তর্জাতিক অর্থায়নকারী প্রতিষ্ঠান ও বিনিয়োগকারীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করবে। বাংলাদেশ যেসব বিষয় উত্থাপন করেছে, তা যথাযথভাবে বিবেচনা করা হবে বলে আশ্বস্ত করেন অ্যালোয়া জুইঙ্গি। একই সঙ্গে ফোরামের পক্ষ থেকে সহযোগিতা ও সমর্থন অব্যাহত রাখার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেন তিনি। এ সময় সুইজারল্যান্ডের দাভোসে অনুষ্ঠিতব্য ডব্লিউইএফের বার্ষিক সভায় অংশ নেওয়ার জন্য প্রধানমন্ত্রীকে আমন্ত্রণ জানান জুইঙ্গি।
বৈঠকে অন্যান্যের মধ্যে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান, প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির, বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী এবং প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতীকুর রহমান রুমন উপস্থিত ছিলেন।
‘বৈশ্বিক বিনিয়োগকারীদের জন্য আস্থার পরিবেশ নিশ্চিত করতে চায় সরকার’: প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন বলেছেন, ‘বাংলাদেশ ব্যবসার জন্য উন্মুক্ত’ বার্তার মাধ্যমে বৈশ্বিক বিনিয়োগকারীদের জন্য একটি আস্থাশীল ও প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ নিশ্চিত করতে চায় সরকার।
গতকতাল চীনের দালিয়ানে শাংগ্রি-লা হোটেলে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ কথা বলেন। মাহদী আমিন বলেন, ওয়ার্ল্ড ইকোনোমিক ফোরাম আয়োজিত সামার দাভোস ২০২৬ বর্তমানে চীনের দালিয়ানে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। এই সম্মেলনে এবারের প্রতিপাদ্য ‘ইনোভেটিং অ্যাট স্কেল’। সম্মেলনে বিভিন্ন দেশ ও অঞ্চলের সরকারি প্রতিনিধিদল, রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধান, শীর্ষ ব্যবসায়ী, প্রযুক্তি উদ্ভাবক, শিক্ষাবিদ ও করপোরেট নেতারা অংশ নিচ্ছেন।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র বলেন, এই সম্মেলনে অংশগ্রহণের মূল লক্ষ্য বাংলাদেশে অধিকতর বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, জলবায়ু সহনশীলতা ও টেকসই উন্নয়ন অগ্রযাত্রাকে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ ও অংশীদারত্বের সঙ্গে আরও গভীরভাবে সংযুক্ত করা। একই সঙ্গে ‘বাংলাদেশ ব্যবসার জন্য উন্মুক্ত’ বার্তার মাধ্যমে বৈশ্বিক বিনিয়োগকারীদের জন্য একটি আস্থাশীল ও প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ নিশ্চিত করা হচ্ছে।
ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের ‘ক্লাইমেট লিডারশিপ ইন আ শিফটিং গ্লোবাল ল্যান্ডস্কেপ’ সেশনে প্রধানমন্ত্রী বক্তব্য রেখেছেন জানিয়ে মাহদী আমিন বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাব মোকাবিলায় নির্বাচিত সরকারের গৃহীত কর্মসূচিগুলো আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃতি পেয়েছে এবং প্রশংসিত হয়েছে। সেই ধারাবাহিকতায় এই সেশনে প্রধানমন্ত্রীকে আমন্ত্রণ জানানো হয় এবং তিনি এসব কর্মসূচি বিশ্বদরবারে উপস্থাপন করেন। তিনি জানান, সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী বিশ্বনেতাদের সামনে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় সরকারের নির্বাচনি ইশতেহারভিত্তিক কর্মপরিকল্পনা তুলে ধরেছেন। আগামী পাঁচ বছরে ২০ হাজার কিলোমিটার নদী ও খাল খনন-পুনর্খনন, পদ্মা ও তিস্তা অববাহিকার পানি ব্যবস্থাপনা উন্নয়ন, ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ, সবুজ শিল্পের বিকাশে পাটশিল্প ও পরিবেশবান্ধব ইলেকট্রিক ভেহিকেল চালু এবং নবায়নযোগ্য জ¦ালানির অংশ ২০ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্যের কথা তিনি উল্লেখ করেন।
প্রধানমন্ত্রী তার বক্তব্যে বলেছেন, জলবায়ু কার্যক্রম কোনো ব্যয় নয়; এটি আমাদের সমৃদ্ধি, স্থিতিশীলতা ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য অপরিহার্য বিনিয়োগ। মাহদী আমিন বলেন, প্রধানমন্ত্রী একই সঙ্গে ক্ষয়ক্ষতি তহবিলের কার্যকর বাস্তবায়ন, সহজলভ্য ও পর্যাপ্ত জলবায়ু অর্থায়ন নিশ্চিতকরণ এবং প্রশমন ও অভিযোজন কার্যক্রমে সমান গুরুত্ব দেওয়ার ওপর জোর দেন। তিনি জলবায়ু সংকট মোকাবিলায় বৈশ্বিক সংহতি, প্রযুক্তি হস্তান্তর ও যৌথ দায়িত্ববোধের ভিত্তিতে কার্যকর আন্তর্জাতিক সহযোগিতার আহ্বান জানান।
চার দিনের সরকারি সফরে মালয়েশিয়া থেকে গতকাল সোমবার রাতে চীনের বন্দরনগরী দালিয়ানে পৌঁছান প্রধানমন্ত্রী। সরকারপ্রধান হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর এটি তার দ্বিতীয় দেশ সফর। চীনের প্রধানমন্ত্রী লি চিয়াংয়ের আমন্ত্রণে তিনি এ সফরে গেছেন। প্রধানমন্ত্রী দালিয়ানে ২৩ থেকে ২৫ জুন লিয়াওনিং প্রদেশে অনুষ্ঠিত ‘সামার দাভোস’ নামে পরিচিত বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের ‘নিউ চ্যাম্পিয়নস’-এর ১৭তম বার্ষিক সভায় অংশ নিচ্ছেন।
আজ বুধবার সকালে কাজাখস্তানের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে তারেক রহমানের বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। পরে অন্যান্য কর্মসূচিতে অংশ নিয়ে বিকেলে তিনি ট্রেনে করে বেইজিংয়ের উদ্দেশে রওনা হবেন। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফরের মূল আনুষ্ঠানিকতাগুলো বেইজিংয়ে অনুষ্ঠিত হবে। সেখানে তিনি দেশটির শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠক করবেন। কাল ২৫ জুন চীনের প্রধানমন্ত্রী লি চিয়াং এবং ২৬ জুন প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে তার বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। ২৬ জুন রাতে দেশে ফেরার কথা রয়েছে প্রধানমন্ত্রীর।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন