কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপনের নামে বিশৃঙ্খলা তৈরির আশঙ্কায় রাজধানীসহ সারা দেশে নিñিদ্র নিরাপত্তার ব্যবস্থা নিয়েছিল আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে বিজিবি ও সেনাবাহিনীর সদস্যদেরও রাজধানীসহ সারা দেশে তৎপর থাকতে দেখা গেছে। ফলে গতকাল মঙ্গলবার দিনভর নানা আশঙ্কা থাকলেও বড় ধরনের কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি। এদিকে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের কর্মসূচি ঘিরে বিশৃঙ্খলা চেষ্টার অভিযোগে রাজধানীসহ সারা দেশে ১১৮ আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীকে আটক করা হয়েছে। পুলিশের ভাষ্য, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতার কারণে আওয়ামী লীগের ‘নাশকতামূলক’ কর্মকা- প্রতিহত করা গেছে।
গতকাল সরেজমিনে দেখা যায়, রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিপুলসংখ্যক সদস্য সতর্ক অবস্থানে ছিলেন। বিশেষ করে ধানমন্ডি ৩২ নম্বর এবং গুলিস্তানে আওয়ামী লীগের পরিত্যক্ত প্রধান কার্যালয়সহ সরকারি বিভিন্ন অফিস, আদালতপাড়া এবং ভিভিআইপি এলাকাসহ কেপিআইভুক্ত এলাকায় সতর্ক অবস্থানে ছিল। রাজধানীসহ দেশের ছয় জেলায় পুলিশের পাশাপাশি বিজিবিসহ সেনাবাহিনীও মোতায়েন করা হয়েছিল। সন্দেহ থাকলে গাড়ি, মোটরসাইকেল তল্লাশি করতে দেখা গেছে।
সার্বিক পরিস্থিতি সম্পর্কে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনার মোসলেহ উদ্দিন আহমদ বলেন, প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপনের ঘোষণা দিয়ে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ নাশকতা ঘটিয়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটাতে চেয়েছিল। তবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তা ভেস্তে দিয়েছে। ডিএমপি কমিশনার বলেন, আওয়ামী লীগ আজকের (গতকাল মঙ্গলবার) মিছিল, সমাবেশ বা জমায়েতের মাধ্যমে সরকারকে বিব্রতকর অবস্থায় ফেলতে এবং আইনশৃঙ্খলার অবনতি ঘটাতে চেয়েছিল। ‘তাদের (আওয়ামী লীগ) এই পরিকল্পনাকে আমরা এখন পর্যন্ত নস্যাৎ করে দিয়েছি। আমি আশা করি, সামনে যে সময় বাকি আছে, সেই সময়ের মধ্যেও তারা কোথাও মিছিল, সমাবেশ বা জমায়েত হতে পারবে না।’
আওয়ামী লীগের কর্মসূচি নিয়ে গোয়েন্দা তথ্য ছিল বলে জানান ডিএমপি কমিশনার। তিনি বলেন, রাজধানীর বিভিন্ন জায়গায় মিছিল, সমাবেশ বা জমায়েত হওয়ার পরিকল্পনা ছিল আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের। বাইরে থেকে ঢাকায় আসার পরিকল্পনাও ছিল। সেই তথ্য আগাম পেয়ে পুলিশ সতর্ক অবস্থান নিয়েছিল। সে অনুযায়ী গত তিন দিন ধরে ঢাকা শহরের বিভিন্ন জায়গায়, বিশেষ করে সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোসহ বিভিন্ন চেকপোস্টে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়। মোবাইল প্যাট্রল, সাদা পোশাকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর টহলও বাড়ানো হয়। আওয়ামী সমর্থকদের বাইরের জেলাগুলো থেকে রাজধানীতে আসার পরিকল্পনা ঠেকাতে ঢাকার প্রবেশমুখ, ট্রেন স্টেশন, বাস স্টেশনসহ সব জায়গায় নজরদারি বাড়ানো হয়।
কমিশনার বলেন, ‘বিভিন্ন মেস, হোটেল এবং যেসব জায়গায় তাদের অবস্থান করার সম্ভাবনা রয়েছে, সেসব স্থানে তল্লাশি চালানো হয়েছে। বেশ কয়েকজন নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার করেছি। গ্রেপ্তার করে আমাদের কাছে মনে হয়েছে, আজকে মিছিল, সমাবেশ বা জমায়েতের মাধ্যমে তারা সরকারকে বিব্রতকর অবস্থায় ফেলতে চায় এবং আইনশৃঙ্খলার অবনতি ঘটাতে চায়।’
নাশকতার কোনো পরিকল্পনা ছিল কি নাÑ এমন প্রশ্নে মোসলেহ উদ্দিন বলেন, দলটির মিছিল থেকে ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। সে বিষয়ে সর্বাত্মক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। মিছিল ও মিছিল-পরবর্তী সময়ে বেশ কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ককটেল বিস্ফোরণের এই ঘটনা থেকে একটি বিষয় প্রতিভাত হয়েছে যে, তাদের যেকোনো নাশকতার পরিকল্পনা থাকতে পারে। যেহেতু মিছিল থেকে হাতবোমার বিস্ফোরণ ঘটানো হয়েছে, তা থেকে ডিএমপি কমিশনার ‘মোটামুটি নিশ্চিত’ যে, সুযোগ পেলে তারা নাশকতামূলক কর্মকা- চালাতে পারে। তিনি আরও বলেন, তবে পরিকল্পনা সম্পর্কে শতভাগ নিশ্চিত হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়নি।
উল্লেখ্য, দুই বছর আগে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নেতারা আত্মগোপনে থেকে গতকাল মঙ্গলবার দলের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে সারা দেশে মিছিলের কর্মসূচি ঘোষণা করে। এরপর পুলিশ দেশজুড়ে নজরদারি বাড়ায়। রাজধানীতে কড়া পাহারা বসায় ঢাকা মহানগর পুলিশ।
আওয়ামী লীগের ২৬ জনসহ এক দিনে ১১৮ গ্রেপ্তার : এদিকে ঢাকা মহানগর পুলিশ তাদের বিশেষ অভিযানে ১১৮ জনের গ্রেপ্তারের তথ্য দিয়েছে। এর মধ্যে ২৬ জন কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মী। গতকাল ডিএমপির পক্ষ থেকে পাঠানো সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানিয়ে বলা হয়, গত সোমবার দিনভর বিভিন্ন থানা এলাকায় এ অভিযান চালিয়ে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের মঙ্গলবারের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ঢাকা মহানগরসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ব্যাপক নিরাপত্তার ব্যবস্থা নিয়েছে। দেশের ছয় জায়গায় সোমবার নামানো হয় সেনাবাহিনী ও বিজিবি। এই পরিস্থিতিতে রাজধানীতে চলে বিশেষ অভিযান। এ ছাড়া ডিএমপি আগেই জানিয়েছিল, মঙ্গলবার আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর দিনে ঢাকায় ১৮ হাজার পুলিশ থাকবে। ঢাকার দুই শতাধিক জায়গায় পুলিশের বিশেষ পিকেট ও চেকপোস্ট বসানো হবে।
কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকা আওয়ামী লীগের যে ২৬ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, তাদের মধ্যে রমনা ও খিলক্ষেত থানার পুলিশ দুজন করে, ধানমন্ডিতে ১০ জন, মোহাম্মদপুর থানায় আটজন এবং বংশাল, কদমতলী, মিরপুর ও তুরাগ থানার পুলিশ একজন করে গ্রেপ্তার করে। পৃথক আরেক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ঢাকা মহানগর পুলিশের বিভিন্ন ইউনিট বিশেষ অভিযান চালিয়ে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা থেকে নানা অপরাধে জড়িত অভিযোগে মোট ৮২ জনকে গ্রেপ্তার করেছে। এ অভিযানে গ্রেপ্তারকৃতদের মধ্যে একজন তালিকাভুক্ত ও একজন তালিকাবহির্ভূত চাঁদাবাজ। এ ছাড়া সন্ত্রাসী, দস্যু, ছিনতাইকারী ও ডাকাতিসংশ্লিষ্ট অপরাধে জড়িত ৩৩ জন এবং মাদক কারবারে জড়িত ৩৭ জন রয়েছে।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন