ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সাম্প্রতিক যুদ্ধের অবসান ঘটাতে স্বাক্ষরিত অন্তর্বর্তী সমঝোতা চুক্তি কার্যকর হওয়ার আগেই এর বিভিন্ন শর্ত নিয়ে দুই দেশের মধ্যে তীব্র মতবিরোধ দেখা দিয়েছে। পারমাণবিক স্থাপনা পরিদর্শন, বিদেশে জব্দ থাকা ইরানি সম্পদ ব্যবহারের অধিকার, হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা ইস্যুতে ওয়াশিংটন ও তেহরান সম্পূর্ণ ভিন্ন অবস্থান তুলে ধরছে। ফলে যুদ্ধবিরতির স্থায়িত্ব ও ভবিষ্যৎ শান্তি প্রক্রিয়া নিয়ে নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
সুইজারল্যান্ডে অনুষ্ঠিত প্রথম দফার উচ্চপর্যায়ের আলোচনার পর যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেন, ইরান তাদের পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতে আন্তর্জাতিক পরিদর্শকদের ‘সীমাহীন’ প্রবেশাধিকার দিতে সম্মত হয়েছে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, ভবিষ্যতে সর্বোচ্চ মাত্রার আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণব্যবস্থার আওতায় থাকবে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি।
তবে ট্রাম্পের এএউ বক্তব্য প্রত্যাখ্যান করেছে তেহরান। ইরানের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম গারিবাবাদি স্পষ্ট করে বলেন, পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতে আন্তর্জাতিক পরিদর্শনের প্রশ্নটি কেবল যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি চূড়ান্ত ও পূর্ণাঙ্গ চুক্তি সম্পন্ন হওয়ার পর বিবেচনা করা হবে। তার মতে, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারসহ বাস্তব পদক্ষেপ না দেখা পর্যন্ত পরিদর্শনসংক্রান্ত কোনো অগ্রগতি সম্ভব নয়।
ইরানি কর্মকর্তারা আরঢ জানান, আলোচনার সময় আন্তর্জাতিক পরমাণু তদারকি সংস্থার মহাপরিচালকের সঙ্গে তাদের কোনো বৈঠকই হয়নি। ফলে পরিদর্শন বিষয়ে নতুন কোনো প্রতিশ্রুতি দেওয়ার প্রশ্নই ওঠে না।
অন্যদিকে আন্তর্জাতিক পরমাণু তদারকি সংস্থার পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, শেষ পর্যন্ত ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতে পরিদর্শন কার্যক্রম অবশ্যই পরিচালিত হবে। সংস্থাটির প্রধান রাফায়েল গ্রোসি বলেন, সময়ের প্রশ্ন থাকতে পারে, কিন্তু পরিদর্শন এড়ানো যাবে না।
জব্দ অর্থ ব্যবহারে বিরোধ : চুক্তির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো বিদেশে জব্দ থাকা ইরানি অর্থ অবমুক্ত করা। আলোচনার পর জানা যায়, অন্তত ১২ বিলিয়ন ডলার ছাড়ের বিষয়ে নীতিগত সমঝোতা হয়েছে। তবে এই অর্থের ব্যবহার নিয়ে দুই দেশের বক্তব্য একেবারেই ভিন্ন।
ট্রাম্প প্রশাসনের দাবি, মুক্ত হওয়া অর্থ একটি বিশেষ ব্যবস্থার আওতায় থাকবে এবং তা মূলত খাদ্য ও ওষুধসহ নির্দিষ্ট মানবিক পণ্য কেনার কাজে ব্যয় করা হবে। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের কৃষিপণ্য কেনার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু ইরান এই ব্যাখ্যা প্রত্যাখ্যান করেছে। তেহরানের বক্তব্য, মুক্ত হওয়া অর্থ ব্যবহারের সিদ্ধান্ত সম্পূর্ণভাবে ইরানের নিজস্ব বিষয়। ইরানের কেন্দ্রীয় ব্যাংকও জানিয়েছে, অর্থ শুধু মানবিক পণ্য নয়, নিষেধাজ্ঞার আওতার বাইরে থাকা অন্যান্য প্রয়োজনীয় খাতেও ব্যয় করা হবে। বিশ্লেষকদের মতে, অর্থ ব্যবহারের নিয়ন্ত্রণ প্রশ্নে এই মতবিরোধ ভবিষ্যৎ আলোচনায় বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে।
হরমুজ প্রণালি নিয়ে নতুন বিতর্ক : বিশ্ব জ¦ালানি বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করেও মতবিরোধ স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেছেন, কোনো দেশ আন্তর্জাতিক নৌপথে টোল বা ফি আরোপ করতে পারে না এবং যুক্তরাষ্ট্র এমন কোনো পদক্ষেপ মেনে নেবে না। অন্যদিকে ইরানের প্রধান আলোচক ও পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ বলেছেন, হরমুজ প্রণালির ওপর ইরানের সার্বভৌম অধিকার অক্ষুণœ থাকবে। তার মতে, প্রণালিটি খোলা রাখা হলেও এর ব্যবস্থাপনায় ইরানের ভূমিকাকে খাটো করে দেখার সুযোগ নেই। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ইস্যু ভবিষ্যতে দুই দেশের সম্পর্কের অন্যতম স্পর্শকাতর বিষয়ে পরিণত হতে পারে।
ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি আলোচনার বাইরে : ইরানের ব্যালাস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি নিয়ে আলোচনার গুঞ্জন থাকলেও তেহরান বারবার জানিয়েছে, এ বিষয়ে কোনো আলোচনা হয়নি এবং ভবিষ্যতেও হবে না। পাকিস্তান সফরে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানও একই অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেন। তার মতে, সংলাপ ও শান্তির জন্য ইরান প্রস্তুত থাকলেও জাতীয় প্রতিরক্ষা সক্ষমতা নিয়ে কোনো আপস করা হবে না।
পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফও বলেন, সমঝোতা স্মারকে ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচির কোনো উল্লেখ নেই। তিনি মন্তব্য করেন, কিছু দেশের ক্ষেপণাস্ত্র থাকবে; কিন্তু ইরানের থাকবে নাÑ এমন দ্বৈত মানদ- গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
উপসাগরীয় মিত্রদের উদ্বেগ : সমঝোতা চুক্তি নিয়ে শুধু যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যেই নয়, মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন মিত্র দেশের মধ্যেও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে ইরানের জন্য প্রস্তাবিত বিপুল পুনর্গঠন তহবিল এবং নিষেধাজ্ঞা শিথিলের সিদ্ধান্তে উপসাগরীয় কয়েকটি দেশ অস্বস্তি প্রকাশ করেছে। তাদের আশঙ্কা, অর্থনৈতিক সুবিধা পেলে ইরান ভবিষ্যতে সামরিক সক্ষমতা আরও বাড়াতে পারে।
এই উদ্বেগ প্রশমনে পশ্চিম এশিয়া সফর শুরু করেছেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও। সফরে তিনি আঞ্চলিক মিত্রদের আশ্বস্ত করার চেষ্টা করছেন যে, যুক্তরাষ্ট্র তাদের নিরাপত্তা উদ্বেগকে গুরুত্ব দিচ্ছে।
যুদ্ধবিরতির ভবিষ্যৎ নিয়ে সংশয় : সমঝোতা চুক্তি স্বাক্ষরিত হলেও যুদ্ধবিরতির ভবিষ্যৎ নিয়ে সন্দেহ রয়ে গেছে। যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন জনমত জরিপে দেখা গেছে, অধিকাংশ মার্কিন নাগরিক মনে করেনÑ এই চুক্তি দীর্ঘমেয়াদে স্থায়ী শান্তি নিশ্চিত করতে পারবে না।
অনেকের ধারণা, যুদ্ধের মূল কারণগুলো এখনো অমীমাংসিত রয়ে গেছে। বিশেষ করে পারমাণবিক কর্মসূচি, আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তার এবং সামরিক সক্ষমতা নিয়ে দুই দেশের অবস্থান এখনো গুরুত্বপূর্ণ। তবু উভয় পক্ষ আপাতত আলোচনার পথ খোলা রেখেছে। আগামী ৬০ দিনের আলোচনা পর্বে এই মতবিরোধগুলো কতটা সমাধান করা যায়, তার ওপরই নির্ভর করবে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন শান্তি প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনা।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন