× UCB Sticker Card
বুধবার, ০১ জুলাই, ২০২৬

ফেসবুক


ইউটিউব


টিকটক

Rupali Bangladesh

ইনস্টাগ্রাম

Rupali Bangladesh

এক্স

Rupali Bangladesh


লিংকডইন

Rupali Bangladesh

পিন্টারেস্ট

Rupali Bangladesh

গুগল নিউজ

Rupali Bangladesh


হোয়াটস অ্যাপ

Rupali Bangladesh

টেলিগ্রাম

Rupali Bangladesh

মেসেঞ্জার গ্রুপ

Rupali Bangladesh


En Bn

আরিয়ান স্ট্যালিন

প্রকাশিত: জুলাই ১, ২০২৬, ০২:৪০ এএম

প্রকৃতির প্রতিশোধে বিপর্যস্ত বিশ্ব, শঙ্কায় বিজ্ঞানীরা

আরিয়ান স্ট্যালিন

প্রকাশিত: জুলাই ১, ২০২৬, ০২:৪০ এএম

প্রকৃতির প্রতিশোধে বিপর্যস্ত বিশ্ব, শঙ্কায় বিজ্ঞানীরা

বিশ্ব যেন এক সঙ্গে একাধিক প্রাকৃতিক দুর্যোগের কবলে পড়েছে। কোথাও তীব্র দাবদাহে মানুষের জীবন বিপন্ন, কোথাও ভয়াবহ দাবানলে পুড়ে যাচ্ছে বিস্তীর্ণ বনভূমি, আবার কোথাও আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসে মুহূর্তের মধ্যে তলিয়ে যাচ্ছে জনপদ। জলবায়ু পরিবর্তনের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব এখন আর ভবিষ্যতের আশঙ্কা নয়, বরং বর্তমানের নির্মম বাস্তবতা। বিশে^র বিভিন্ন প্রান্তে ঘটে চলা ধারাবাহিক দুর্যোগ মানবসভ্যতার জন্য নতুন করে বিপদের ঘণ্টা বাজিয়ে দিয়েছে। গত কয়েক বছর ধরেই পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে চরম আবহাওয়ার ঘটনা বেড়ে চলেছে। তবে চলতি বছরের পরিস্থিতি আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় আরও ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা, আফ্রিকা ও এশিয়ার বহু অঞ্চলে একই সময়ে দাবদাহ, দাবানল, বন্যা, ভূমিধস ও খরার মতো দুর্যোগ আঘাত হানায় কোটি কোটি মানুষের জীবন ও জীবিকা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সবচেয়ে উদ্বেগজনক পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছে ইউরোপ।

জুন মাসের শেষভাগ থেকে শুরু হওয়া রেকর্ডভাঙা তাপপ্রবাহ ইতালি, ফ্রান্স, জার্মানি, সার্বিয়া, ক্রোয়েশিয়া, আলবেনিয়া, হাঙ্গেরি, স্পেনসহ বিস্তীর্ণ অঞ্চলে জনজীবন বিপর্যস্ত করে তুলেছে। কোথাও কোথাও তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস অতিক্রম করেছে। বহু স্থানে রাতের তাপমাত্রাও অস্বাভাবিকভাবে বেশি থাকায় মানুষ স্বস্তি পাচ্ছে না। ফ্রান্সে এই দাবদাহ জনস্বাস্থ্য সংকটে পরিণত হয়েছে। দেশটির জনস্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, মাত্র কয়েকদিনের ব্যবধানে অতিরিক্ত প্রায় এক হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে। নিহতদের অধিকাংশই বয়স্ক। হাসপাতাল, বৃদ্ধ নিবাস এবং বাসাবাড়িতে মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় স্বাস্থ্যসেবাব্যবস্থা ব্যাপক চাপের মুখে পড়েছে। রাজধানী প্যারিস ও আশপাশের অঞ্চলের মরদেহ সংরক্ষণ কেন্দ্রগুলোও ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত চাপ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে। ইতালির উত্তর থেকে দক্ষিণ পর্যন্ত বহু শহরে সর্বোচ্চ সতর্কতা জারি করা হয়েছে। রাজধানী রোমসহ বিভিন্ন শহরে মানুষ ছাতা, হাতপাখা ও পানির ছিটা দিয়ে তীব্র গরম থেকে বাঁচার চেষ্টা করছেন।

বিদ্যুৎ উৎপাদনে বিঘœ, কৃষিতে ক্ষতি এবং পানির সংকট পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। ইতালির প্রধান নদীর পানির স্তর আশঙ্কাজনকভাবে নেমে যাওয়ায় কৃষিজমিতে লবণাক্ত পানি প্রবেশের ঘটনাও দেখা দিয়েছে। জার্মানিতেও একের পর এক নতুন তাপমাত্রার রেকর্ড সৃষ্টি হচ্ছে। প্রচ- গরমে রেলপথ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় কিছু এলাকায় ট্রাম ও ট্রেন চলাচল বন্ধ রাখতে হয়েছে। বিদ্যুৎ সরবরাহ ও পরিবহনব্যবস্থার ওপরও এর বিরূপ প্রভাব পড়েছে। সার্বিয়া, হাঙ্গেরি ও বলকান অঞ্চলেও একই ধরনের পরিস্থিতি বিরাজ করছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান তাপপ্রবাহ ইউরোপের ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়াবহ ঘটনাগুলোর একটি। মানুষের কর্মকা-ের ফলে সৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তন না হলে এত তীব্র দাবদাহ সৃষ্টি হওয়া প্রায় অসম্ভব ছিল। গবেষকেরা বলছেন, দুই দশক আগের তুলনায় এখন চরম উষ্ণ রাতের ঝুঁকি শতগুণ বেড়ে গেছে।

দাবদাহের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে দাবানলও। যুক্তরাষ্ট্র, তুরস্ক, গ্রিস, ক্রোয়েশিয়া এবং ইউরোপের আরও কয়েকটি দেশে বিস্তীর্ণ বনাঞ্চল আগুনে পুড়ে যাচ্ছে। কোথাও কৃষিজমি থেকে শুরু হওয়া আগুন দ্রুত বনাঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে জনবসতির কাছাকাছি পৌঁছে গেছে। বহু মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিতে হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের পশ্চিমাঞ্চলে দাবানল নেভাতে গিয়ে প্রাণ হারিয়েছেন দমকল বাহিনীর সদস্যরা। আগুনের তীব্রতা এতটাই বেশি যে শত শত অগ্নিনির্বাপক কর্মী, উড়োজাহাজ ও উড়ন্ত জলবাহী যন্ত্র ব্যবহার করেও অনেক এলাকায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়নি। তুরস্কেও আকাশ ও স্থলপথে একযোগে অভিযান চালিয়ে আগুনের বিস্তার রোধের চেষ্টা চলছে। বিশ্বের বনাঞ্চলের ক্ষয়ক্ষতিও উদ্বেগজনক। চলতি বছরের প্রথম চার মাসেই প্রায় ১৫ কোটি হেক্টর বনভূমি দাবানলে পুড়ে গেছে বলে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণ সংস্থাগুলো জানিয়েছে। এতে শুধু জীববৈচিত্র্য নয়, জলবায়ুর ভারসাম্য আরও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

অন্যদিকে পৃথিবীর আরেক প্রান্তে চলছে বন্যার তা-ব। যুক্তরাষ্ট্রের কেনটাকি অঙ্গরাজ্যে প্রবল বর্ষণের ফলে সৃষ্ট আকস্মিক বন্যায় একাধিক মানুষের মৃত্যু হয়েছে। কয়েক ঘণ্টার ভারি বৃষ্টিতে নদী-খাল উপচে পড়ে বহু এলাকা প্লাবিত হয়েছে। শতাধিক মানুষকে উদ্ধার করে নিরাপদ স্থানে নেওয়া হয়েছে। বিভিন্ন এলাকায় জরুরি অবস্থা ঘোষণা করা হয়েছে। ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলেও মৌসুমি বৃষ্টিতে বন্যা ও ভূমিধসের সৃষ্টি হয়েছে। অরুণাচল ও আসামের বহু গ্রাম পানির নিচে তলিয়ে গেছে। হাজার হাজার মানুষ আশ্রয়কেন্দ্রে যেতে বাধ্য হয়েছেন। নদীর পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ায় সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। গবাদিপশুরও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। আফ্রিকার দক্ষিণ ও পশ্চিমাঞ্চলেও প্রবল বর্ষণে আকস্মিক বন্যা দেখা দিয়েছে। বহু বাড়িঘর ধ্বংস হয়েছে এবং লাখ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন।

কোথাও আবার বন্যার পর দেখা দিয়েছে খাদ্য ও বিশুদ্ধ পানির সংকট। বিজ্ঞানীরা বলছেন, পৃথিবীর উষ্ণতা বাড়ার ফলে বায়ুম-লে জলীয় বাষ্পের পরিমাণও বাড়ছে। এর ফলে একদিকে দীর্ঘ সময় বৃষ্টিহীন অবস্থা তৈরি হয়ে খরা ও দাবদাহ বাড়ছে, অন্যদিকে স্বল্প সময়ে অস্বাভাবিক ভারি বৃষ্টিপাতের কারণে আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসের ঘটনা বৃদ্ধি পাচ্ছে। অর্থাৎ একই জলবায়ু পরিবর্তন পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে ভিন্ন ভিন্ন রূপে আঘাত হানছে। আবহাওয়া বিশেষজ্ঞদের মতে, সমুদ্রের তাপমাত্রাও এখন রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছে। 

একসময় যে দাবদাহকে শতাব্দীতে একবারের ঘটনা মনে করা হতো, তা এখন প্রায় প্রতি বছরই ফিরে আসছে। দাবানল, বন্যা, খরা ও ভূমিধসও ক্রমেই হয়ে উঠছে আরও ঘনঘন এবং আরও বিধ্বংসী। প্রকৃতির এই ধারাবাহিক রুদ্ররূপ স্পষ্ট করে দিচ্ছে, জলবায়ু পরিবর্তন আর ভবিষ্যতের কোনো সতর্কবার্তা নয়; এটি আজকের পৃথিবীর সবচেয়ে বড় বাস্তব সংকট। মানবসভ্যতার নিরাপদ ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে এখনই কার্যকর বৈশি^ক উদ্যোগ গ্রহণ না করলে আগামী প্রজন্মকে আরও ভয়াবহ বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হবে।

রূপালী বাংলাদেশ

Link copied!