গত ২৪ জুন, বুধবার সন্ধ্যা ৬টা ৪ মিনিটে মাত্র ৩৯ সেকেন্ড থেকে এক মিনিটের ব্যবধানে জোড়া ভূমিকম্পে কেঁপে ওঠে ভেনেজুয়েলা। রিখটার স্কেলে ৭.২ এবং ৭.৫ মাত্রার এই ভয়াবহ দুর্যোগে রাজধানী কারাকাসসহ বেশ কয়েকটি প্রদেশ এখন ধ্বংসস্তূপ। ইতোমধ্যে প্রাণ হারিয়েছেন ১,৪০০-এর বেশি মানুষ এবং নিখোঁজ রয়েছেন প্রায় ৫০ হাজার।
তবে এই চরম বিপর্যয়ের ঠিক কয়েক সেকেন্ড আগে ভেনেজুয়েলার হাজারো মানুষের ফোনে চলে এসেছিল গুগলের বিশেষ সতর্কবার্তা। প্রযুক্তির এই জাদুকরী আগাম বার্তার রহস্য আসলে কী? কীভাবে ভূমিকম্পের আগে সংকেত পাঠায় গুগল?
পকেটের স্মার্টফোনই যখন ‘ভূমিকম্প মাপক যন্ত্র’
বিশেষজ্ঞরা জানাচ্ছেন, এই প্রযুক্তির মূল রহস্য লুকিয়ে আছে আমাদের হাতের স্মার্টফোনেই। আধুনিক প্রায় সব স্মার্টফোনে ‘অ্যাক্সেলেরোমিটার’ নামের একটি বিশেষ সেন্সর থাকে। মূলত এই সেন্সরটিই গুগলের ভূমিকম্প সতর্কবার্তা ব্যবস্থার নেপথ্য কারিগর।
যেভাবে কাজ করে এই সেন্সর:
অস্বাভাবিক কম্পন শনাক্তকরণ : যখনই কোনো এলাকায় স্বাভাবিকের বাইরে কোনো কম্পন তৈরি হয়, তখন ফোনের অ্যাক্সেলেরোমিটার সেন্সর সেটি বুঝতে পারে।
গুগল সার্ভারে সংকেত : কম্পন টের
পাওয়া মাত্রই ডিভাইসটি ‘অ্যান্ড্রয়েড আর্থকোয়াক অ্যালার্ট সিস্টেম’-এর মাধ্যমে গুগলের সার্ভারে সংকেত ও লোকেশন পাঠিয়ে দেয়।
বিশাল নেটওয়ার্কের বিশ্লেষণ : একটি নির্দিষ্ট এলাকা থেকে একই সময়ে যখন হাজার হাজার ফোন থেকে এমন সংকেত গুগলের সার্ভারে পৌঁছায়, তখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও সার্ভার বিশ্লেষণ করে নিশ্চিত হয় যে সেখানে ভূমিকম্প হচ্ছে।
বর্তমানে বিশ্বজুড়ে ২০০ কোটিরও বেশি অ্যান্ড্রয়েড ডিভাইস এই ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত। ফলে এটি বিশ্বের সবচেয়ে বড় ‘ডিস্ট্রিবিউটেড সিসমোগ্রাফ’ বা ভূমিকম্প শনাক্তকরণ নেটওয়ার্কে পরিণত হয়েছে।
পি-ওয়েভ ও এস-ওয়েভের খেলা : আলোর গতি বনাম ভূ-কম্পন
ভূমিকম্পের ডেটা বিশ্লেষণ করার প্রক্রিয়াটি বেশ বৈজ্ঞানিক ও জটিল। ভূমিকম্প মূলত দুই ধরনের প্রধান তরঙ্গের মাধ্যমে ছড়ায়:
১. প্রাইমারি ওয়েভ : এটি ভূমিকম্পের প্রথম তরঙ্গ। এর গতি প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ৬ কিলোমিটার। এটি দ্রুতগতির হলেও তুলনামূলকভাবে কম শক্তিশালী এবং মানুষের পক্ষে সহজে টের পাওয়া কঠিন। ২. সেকেন্ডারি ওয়েভ : এটি পি-ওয়েভের পরে আসে। এর গতি প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ৩ থেকে ৪ কিলোমিটার। গতি কিছুটা কম হলেও এটি অত্যন্ত ধ্বংসাত্মক এবং সব ধরনের ক্ষয়ক্ষতির জন্য দায়ী।
গুগল যেভাবে কয়েক সেকেন্ড সময় পায়:
স্মার্টফোনের সেন্সর প্রথমে মৃদু গতির ‘পি-ওয়েভ’ শনাক্ত করে আলোর গতিতে ইন্টারনেটের মাধ্যমে গুগলের সার্ভারে ডেটা পাঠিয়ে দেয়। যেহেতু ধ্বংসাত্মক ‘এস-ওয়েভ’ তুলনামূলক ধীরগতিতে এগোয়, তাই গুগল মাঝখানের এই কয়েক সেকেন্ড সময় পেয়ে যায় ডেটা প্রসেস করে ব্যবহারকারীদের ফোনে অ্যালার্ট পাঠানোর জন্য।
উদাহরণস্বরূপ : ভূমিকম্পের কেন্দ্রস্থল যদি আপনার অবস্থান থেকে ৩৪১ কিলোমিটার দূরে হয়, তবে কেন্দ্রস্থলের কাছের ফোনগুলো পি-ওয়েভ শনাক্ত করে গুগলে তথ্য পাঠাবে। আর গুগল সেই তথ্য বিশ্লেষণ করে ধ্বংসাত্মক এস-ওয়েভ আপনার কাছে পৌঁছানোর আগেই আপনাকে সতর্ক করে দেবে।
অ্যান্ড্রয়েডের দুই ধরনের সতর্কবার্তা
২০২৩ সাল থেকেই গুগলের এই ‘আর্থকোয়াক অ্যালার্ট সিস্টেম’ সক্রিয় রয়েছে। অ্যান্ড্রয়েড ৫ বা তার পরবর্তী সংস্করণের সব ফোনে এই সুবিধা পাওয়া যায়। সাধারণত তীব্রতা অনুযায়ী দুই ধরনের অ্যালার্ট পাঠানো হয়:
বি অ্যাওয়ার অ্যালার্ট : হালকা কম্পনের ক্ষেত্রে এই বার্তা পাঠানো হয়, যেন মানুষ আগে থেকেই সতর্ক হতে পারে।
টেক অ্যাকশন অ্যালার্ট : মাঝারি বা তীব্র কম্পনের ক্ষেত্রে এই রেড অ্যালার্ট আসে। এটি পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দ্রুত নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। এই মেসেজে ক্লিক করলে ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল ও সম্ভাব্য মাত্রাও জানা যায়।
জরুরি নোট : এই আগাম সতর্কবার্তা পাওয়ার জন্য স্মার্টফোনে অবশ্যই মোবাইল ডেটা বা ওয়াই-ফাই সংযোগ এবং লোকেশন সার্ভিস চালু থাকতে হবে। ভূমিকম্প থামানোর কোনো সাধ্য মানুষের নেই। তবে প্রযুক্তির কল্যাণে পাওয়া এই মাত্র কয়েক সেকেন্ডের আগাম সতর্কতা হাজার হাজার মানুষের জীবন বাঁচাতে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখতে পারে।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন