দেশের উত্তর জনপদে হঠাৎ বেড়েছে বৃষ্টিপাত। একই সঙ্গে দেশের উজানে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে ভারি বর্ষণে দেশের উত্তরাঞ্চলে নদ-নদীতে প্রতিদিন বাড়ছে পানি। পানির তোড়ে ইতোমধ্যে গত রোববার তিস্তা ব্রিজের ৪৪টি জলকপাট খুলে দেওয়া হয়েছে। ধারাবাহিক বৃষ্টি আর উজানের ঢলে হু হু করে বাড়ছে তিস্তা নদীর পানি। একই সঙ্গে দেশের অভ্যন্তরে গত সোমবার ও মঙ্গলবার প্রবল বর্ষণ হয়েছে বলে জানিয়েছে আবহাওয়া অফিস, রংপুর।
আবাহাওয়া অফিস জানায়, রংপুরে গত সোমবার সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত ৪৬ মিলিলিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে। আগামী কয়েক দিন আরও বৃষ্টিপাত হতে পারে। এতে এই অঞ্চলে বন্যা হতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র। ফলে রংপুরের তিস্তা, ধরলা ও দুধকুমার এবং করতোয়া নদ-নদীর পানি বাড়ায় দুর্ভোগ বাড়তে শুরু করেছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের মতে, ভারত গজলডোবা ব্যারাজের ২০টি গেট খুলে দেওয়ায় তিস্তার পানি বিপৎসীমার কাছাকাছি চলে এসেছে। নদীতীরবর্তী নি¤œাঞ্চল ও চর এলাকাগুলোতে অবিরাম নদীর পানি ঢুকছে। নতুন করে আরও বৃষ্টির আভাস দিয়েছে আবহাওয়া অফিস।
উজানের পানিতে উত্তরাঞ্চলের চারটি জেলা নীলফামারী, লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম ও রংপুরে উজানের পানিতে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। নতুন করে বর্ষণে ডুবেছে আমন ধানের বীজতলা। অনেক কৃষকের পুকুরের মাছ ভেসে গেছে। নতুন করে আরও ভারি বর্ষণে বন্যার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। তবে আগাম বন্যা প্রতিরোধে সরকারের তেমন প্রস্তুতি নেই বলে জানিয়েছে তিস্তাতীরবর্তী অনেক মানুষ।
রংপুর জেলা প্রশাসনের অফিস জানিয়েছে, বন্যার্তদের জন্য শুকনো খাবার হিসেবে বিস্কুট, চিড়া, বিশুদ্ধ পানি, পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট যথেষ্ট মজুত রয়েছে। এ ছাড়া প্রাথমিক চিকিৎসার অংশ হিসেবে খাওয়ার স্যালাইন এবং তাদের উদ্ধারে ব্যবস্থা রয়েছে।
রংপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী রবিউল ইসলাম রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, ‘উজানে ভারি বৃষ্টি হচ্ছে, যার কারণে তিস্তার পানি বাড়ছে। বন্যা হতে পারে বলে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের আমরা জানিয়েছি।’ তিনি আর বলেন, উজানে ভারি বৃষ্টিপাতের পূর্বাভাস রয়েছে। আগামী তিন দিন তিস্তার পানি আবারও বেড়ে বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হতে পারে।
স্থানীয়রা জানান, রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলায় তিস্তাপাড়ের মানুষ ত্রাণ চায় না। তারা প্রতিরক্ষা হিসেবে নদীভাঙন রোধে দীর্ঘমেয়াদি টেকসই প্রতিরক্ষা বাঁধ নির্মাণের দাবি জানান, যাতে নতুন করে বর্ষায় দুর্ভোগের পুনরাবৃত্তি না ঘটে।
উত্তরাঞ্চলে কয়েক দিনের টানা বৃষ্টিতে দেশের বিভিন্ন নদ-নদীর পানি বিপৎসীমা ছুঁই ছুঁই করছে। রংপুরে গত সোমবার নতুন করে বর্ষণে নি¤œাঞ্চল তলিয়ে গেছে। বৃষ্টিপাত সম্পর্কে জানতে চাইলে রংপুরের আবহাওয়া অফিসের সহকারী আবহাওয়াবিদ মোস্তাফিজার রহমান বলেন, গত ২৪ ঘণ্টায় সোমবার ৪৬ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে। আগামী কয়েক দিন আরও বর্ষণ হতে পারে। আবহাওয়া অফিসের পর্যবেক্ষক অরজিৎ কুমার বলেন, গতকাল (আজ) কী পরিমাণ বৃষ্টিপাত হয়েছে, তা রেকর্ড চলছে। ২৪ ঘণ্টা হিসেবে এটা জানানো হয়।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের শনিবারের নিয়মিত বুলেটিনে বলা হয়েছে, বর্তমানে দেশের সব প্রধান নদ-নদীর পানি বিপৎসীমার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। কেন্দ্রের তথ্য বলছে, শনিবার সকাল ৯টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় রংপুর, সিলেট ও খুলনা বিভাগে ভারি থেকে অতিভারী এবং উজানে ভারতের অরুণাচল প্রদেশে ভারি বৃষ্টি হয়েছে।
আবহাওয়া সংস্থাগুলোর বরাত দিয়ে বন্যা পূর্বাভাস কেন্দ্র বলছে, আগামী পাঁচ দিন রংপুর, সিলেট ও ময়মনসিংহ বিভাগ এবং উজানে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, আসাম ও মেঘালয় প্রদেশে ভারি থেকে অতি ভারি বৃষ্টির পূর্বাভাস রয়েছে।
বন্যা পূর্বাভাস কেন্দ্রের সহকারী প্রকৌশলী নুসরাত জাহান জেরিন বলেছেন, বৃষ্টিপাতের কারণে নীলফামারী, লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম ও রংপুরে নদ-নদীর পানি বেড়েছে। তাতে স্বল্পমেয়াদি অর্থাৎ, কমপক্ষে তিন দিন মেয়াদে বন্যা পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।
রংপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্যমতে, গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে ডালিয়া ব্যারাজ পয়েন্টে তিস্তার পানিপ্রবাহ রেকর্ড করা হয়েছে ৫১ দশমিক ৮৫ মিটার, যা বিপৎসীমার ৩০ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হয়। একই সময়ে কাউনিয়া তিস্তা সেতু পয়েন্টেও পানি বিপৎসীমার ২৩ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হয়। তবে পানি কমলেও উজানে ভারি বৃষ্টিপাতের কারণে আগামী তিন দিনে আবারও নদীর পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করতে পারে বলে আশঙ্কা করছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
গঙ্গাচড়া উপজেলার কোলকোন্দ ও লক্ষ্মীটারী ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ নি¤œাঞ্চল প্লাবিত হয়ে অন্তত ৪ হাজার পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। চরাঞ্চলের যোগাযোগব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে এবং পাট, চিনাবাদাম ও আমনের বীজতলা তলিয়ে যাওয়ায় কৃষকেরা ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়েছেন। কোলকোন্দ, আলমবিদিতর, নোহালী, সদর, লক্ষ্মীটারী ও মর্ণেয়া ইউনিয়নের ২০টিরও বেশি গ্রামের শত শত বাড়িঘর, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, গ্রামীণ সড়ক ও কৃষিজমি এখনো পানির নিচে রয়েছে।
রংপুরের পীরগঞ্জ উপজেলায় অতিবর্ষণে অধিকাংশ আমন ধানের বীজতলা ডুবেছে। তবে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা না থাকায় এখনি ক্ষতির কোনো কারণ নেই বলে জানিয়েছে কৃষি বিভাগ।
অন্যদিকে পানি উন্নয়ন বোর্ডের অধীনে তিস্তা ব্যারাজ প্রকল্পের গুরুত্বপূর্ণ পরিচালন ও রক্ষণাবেক্ষণ দপ্তর ডালিয়া ডিভিশনের নির্বাহী প্রকৌশলী অমিতাভ চৌধুরী বলেন, ধারাবাহিক বৃষ্টি আর উজানের ঢলে হু হু করে বাড়ছে তিস্তা নদীর পানি। অব্যাহতভাবে পানি বাড়ার কারণে তিস্তা ব্যারাজ পয়েন্টে পানি বিপৎসীমা ছুঁই ছুঁই করছে, যা বর্তমানে ১৩ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, ভারত গজলডোবা ব্যারাজের ২০টি গেট খুলে দেওয়ায় তিস্তার পানি বিপৎসীমার কাছাকাছি চলে এসেছে। এতে চরের অনেক কৃষকের আবাদি জমি পানিতে তলিয়ে গেছে। নদীতীরবর্তী নি¤œাঞ্চল ও চর এলাকাগুলোতে নদীর পানি ঢুকছে।
রংপুর বিভাগীয় পানি উন্নয়ন বোর্ডের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী আহসান হাবিব বলেন, নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি ও নদীপাড়ে ভাঙন পরিস্থিতি পযর্বেক্ষণ করা হচ্ছে। ব্রহ্মপুত্র, দুধকুমার, ধরলা, গঙ্গাধর, জিনজিরাম ও ঘাঘটে পানি বাড়ছে। আপাতত বন্যা পরিস্থিতি সৃষ্টি না হলেও তিস্তাপাড়ে বন্যার আশঙ্কা রয়েছে।’

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন