যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে স্থায়ী যুদ্ধবিরতি প্রতিষ্ঠা এবং হরমুজ প্রণালি সম্পূর্ণ সচল করার লক্ষ্যে কাতারের মধ্যস্থতায় চলমান কূটনৈতিক প্রচেষ্টা অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। কাতার স্পষ্ট জানিয়েছে, দোহায় আসা শীর্ষ মার্কিন প্রতিনিধিদের সঙ্গে ইরানের কোনো উচ্চপর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হচ্ছে না। কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মাজেদ আল আনসারী জানান, চলতি সপ্তাহে কেবল আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও অন্যান্য কারিগরি বিষয়ে আলোচনা হবে, যা পরে উচ্চপর্যায়ে উন্নীত হতে পারে। এই ঘোষণার ফলে গত ১৭ জুনের ১৪ দফার অন্তর্বর্তী চুক্তির ওপর ভিত্তি করে একটি স্থায়ী শান্তিচুক্তি এবং ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিসংক্রান্ত জটিল বিষয়গুলো সমাধানের সম্ভাবনা সংকুচিত হয়ে পড়েছে বলে ধারণা বিশেষজ্ঞদের।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনার এবং বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ গতকাল মঙ্গলবার দোহায় পৌঁছালেও ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই পরিষ্কার জানান, আগামী দিনগুলোতে আমেরিকার সঙ্গে কোনো পর্যায়েই আলোচনা করার পরিকল্পনা তেহরানের নেই। তবে অবরুদ্ধ ইরানি সম্পদ অবমুক্ত করাসহ অন্তর্বর্তী চুক্তি বাস্তবায়নের বিষয়ে মধ্যস্থতাকারী কাতারের সঙ্গে বুধবার আলোচনা হতে পারে। বিশ্লেষকদের মতে, হোয়াইট হাউস শুরুতে উচ্চপর্যায়ের বৈঠকের কথা বললেও দুই পক্ষের এই বিপরীতমুখী অবস্থান মূলত গত সপ্তাহান্তের সামরিক সংঘাতেরই প্রতিফলন। সে সময় মার্কিন এবং ইরানি বাহিনী একে অপরের বিরুদ্ধে সামরিক ঘাঁটিতে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়ে যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের অভিযোগ আনে।
এদিকে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান জানান, কাতারে আটকে থাকা ১২ বিলিয়ন ডলারের মধ্যে প্রথম ধাপে ছয় বিলিয়ন ডলার ইরানের কাছে ফেরত দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। তিনি একে ইরানি জনগণের বড় কূটনৈতিক সাফল্য হিসেবে উল্লেখ করেন। পাশাপাশি ইরানের তেল ও পেট্রোরসায়ন খাতের ওপর আরোপিত কিছু নিষেধাজ্ঞা শিথিল করার বিষয়েও অগ্রগতি হয়েছে বলে তেহরানের দাবি। এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরেই এ নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়েছে। বিরোধী আইনপ্রণেতাদের একাংশ অভিযোগ করেন, সংঘাতের পরও যুক্তরাষ্ট্র কী অর্জন করেছে, সে বিষয়ে সরকার স্পষ্ট ব্যাখ্যা দিতে পারেনি। তাদের মতে, ইরান বিপুল অর্থ ফিরে পাওয়ার পাশাপাশি তেল রপ্তানির সুযোগও বাড়াচ্ছে, অথচ হরমুজ প্রণালিতে তাদের প্রভাব কমেনি।
চার মাস আগে শুরু হওয়া এই যুদ্ধের কারণে বিশ্বের অন্যতম প্রধান জ¦ালানি সরবরাহের পথ হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল স্থবির হয়ে পড়েছিল, যা বিশ্ববাজারে বড় ধাক্কা দেয়। এই সংঘাতে ইরান ও লেবাননে হাজার হাজার মানুষের প্রাণহানি ঘটে। যুদ্ধবিরতি বজায় রাখা নিয়ে অনিশ্চয়তা থাকলেও গত কয়েক দিনের তুলনায় সামরিক উত্তেজনা কিছুটা কমায় আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছিল। কিন্তু দুই দেশের আলোচনায় অনিশ্চয়তা ঘিরে ফের বাড়তে শুরু করেছে তেলের দাম।
এদিকে হরমুজ প্রণালি ঘিরে আরেকটি নতুন বিতর্ক তৈরি হয়েছে মাইন অপসারণ ঘিরে। ফ্রান্স ও ওমান যৌথভাবে প্রণালিতে মাইন অপসারণের প্রস্তাব দিলেও তা সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে ইরান। তেহরানের দাবি, পূর্ববর্তী সমঝোতা অনুযায়ী এই কৌশলগত জলপথে মাইন অপসারণের দায়িত্ব কেবল ইরানের। অন্য কোনো দেশের অংশগ্রহণকে তারা উসকানিমূলক এবং পরিস্থিতি জটিল করার প্রচেষ্টা হিসেবে দেখছে। ইরান আরো অভিযোগ করে, তাদের সঙ্গে সমন্বয় ছাড়াই নতুন নৌপথ চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যা বিদ্যমান সমঝোতার পরিপন্থি। ফলে হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা ও নৌ চলাচল নিয়ে মতবিরোধ আরও গভীর হয়েছে।
পর্যবেক্ষকদের মতে, দোহাকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া এই নতুন কূটনৈতিক তৎপরতা আপাতত উত্তেজনা প্রশমনের একটি সুযোগ তৈরি করেছে। তবে দুই দেশের পরস্পরবিরোধী বক্তব্য, হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে মতবিরোধ, পারমাণবিক কর্মসূচি, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং জব্দ অর্থ ফেরতÑ এসব প্রশ্নের সমাধান না হলে স্থায়ী সমঝোতায় পৌঁছানো সহজ হবে না।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন