ফরিদপুরের অন্যতম প্রধান অর্থকরী মসলা জাতীয় ফসল পেঁয়াজ। জেলার মধ্যে সবচেয়ে বেশি বাণিজ্যিকভাবে পেঁয়াজের আবাদ হয় সালথা ও নগরকান্দা উপজেলার ১৮টি ইউনিয়নে। দীর্ঘদিন ধরে এ অঞ্চলের হাজারো কৃষক পেঁয়াজ চাষের ওপর নির্ভর করে জীবিকা নির্বাহ করে আসছেন। তবে এবার বাম্পার ফলন হলেও ন্যায্যমূল্য না পাওয়ায় চরম হতাশায় পড়েছেন তারা।
বাজারে পেঁয়াজের দাম উৎপাদন খরচের অনেক নিচে নেমে গেছে। অন্যদিকে সংরক্ষণ ব্যবস্থার দুর্বলতা ও দীর্ঘস্থায়ী বিদ্যুৎ সংকটের কারণে ঘরে কিংবা সরকারি সংরক্ষণাগারেও পেঁয়াজ রাখা যাচ্ছে না। অতিরিক্ত গরমে প্রতিদিনই পচে নষ্ট হচ্ছে বিপুল পরিমাণ পেঁয়াজ। এমন পরিস্থিতিতে ক্ষোভে ও হতাশায় অনেক কৃষক তাদের কষ্টার্জিত ফসল বস্তাভর্তি করে ডোবা ও পুকুরে ফেলে দিচ্ছেন।
সালথার একাধিক কৃষক জানান, এ বছর বিভিন্ন জাতের পেঁয়াজের ভালো ফলন হয়েছে। এর মধ্যে অধিকাংশই হাইব্রিড জাতের, যা দীর্ঘদিন সংরক্ষণ করা কঠিন। সরকারিভাবে দেওয়া এয়ারফ্লো মেশিন থাকলেও নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ না থাকায় সেগুলো কার্যকরভাবে ব্যবহার করা যাচ্ছে না। ফলে সংরক্ষিত পেঁয়াজ দ্রুত পচে যাচ্ছে। কৃষকদের দাবি, বর্তমানে বাজারে প্রতি মণ পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ৮০০ থেকে ৯০০ টাকায়। অথচ উৎপাদন খরচই পড়েছে ১ হাজার ৬০০ থেকে ১ হাজার ৭০০ টাকা। এতে প্রতিটি মণ পেঁয়াজেই বড় অঙ্কের লোকসান গুনতে হচ্ছে। কৃষক মোহাম্মদ আলী বলেন, ‘সরকারি এয়ারফ্লো মেশিন ব্যবহার করেও পর্যাপ্ত বাতাস চলাচল না হওয়ায় আমার প্রায় ৩৫০ মণ পেঁয়াজ পচে গেছে। শেষ পর্যন্ত বাধ্য হয়ে সেগুলো পুকুরে ফেলে দিতে হয়েছে।’
কৃষক দাউদ মাতুব্বর বলেন, ‘বর্তমান বাজারদরে উৎপাদন খরচই উঠছে না। সংরক্ষণ ব্যয় যোগ করলে লোকসানের পরিমাণ আরও বেড়ে যাচ্ছে।’
আরেক কৃষক আবুল মাতুব্বর বলেন, ‘কৃষকদের এই দুর্দশা নিরসনে কার্যকর কোনো উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না। ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত না হলে আগামীতে অনেকেই পেঁয়াজ চাষ ছেড়ে দিতে বাধ্য হবেন।’
কৃষকদের অভিযোগ, সরকারিভাবে সরবরাহ করা এয়ারফ্লো মেশিন অনেক ক্ষেত্রে প্রত্যাশিত ফল দিচ্ছে না। বিদ্যুৎ বিভ্রাট ও কারিগরি সমস্যার কারণে বাতাস চলাচল বন্ধ হয়ে সংরক্ষিত পেঁয়াজ দ্রুত পচে যাচ্ছে। তাদের দাবি, ২৪ ঘণ্টার মধ্যে মাত্র ২ থেকে ৩ ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকায় কোনোভাবেই পেঁয়াজ সংরক্ষণ সম্ভব হচ্ছে না।
এ বিষয়ে ফরিদপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক কৃষিবিদ মো. শাহাদুজ্জামান বলেন, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে জেলায় পেঁয়াজ সংরক্ষণের জন্য ১ হাজার ৪৩০টি এয়ারফ্লো মেশিন বিতরণ করা হয়েছে। চলতি বছর আরও ৭০০টি বিতরণ করা হয়েছে এবং প্রায় আড়াই হাজার মেশিন সরবরাহের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, সংরক্ষণ সুবিধা বাড়ানো গেলে কৃষকরা তাৎক্ষণিকভাবে কম দামে পেঁয়াজ বিক্রি করতে বাধ্য হবেন না। তবে কৃষকদের ভাষ্য, শুধু সংরক্ষণ যন্ত্র সরবরাহ করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ, কার্যকর সংরক্ষণ ব্যবস্থা এবং পেঁয়াজের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা না হলে প্রতিবছরই তাদের এমন লোকসানের মুখে পড়তে হবে।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন