বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে তীব্র তাপপ্রবাহ নতুন করে উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে। ইউরোপের একাধিক দেশে প্রাণহানির সংখ্যা কয়েক হাজার ছাড়িয়ে গেছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রেও ভয়াবহ গরমে স্বাধীনতা দিবসের নানা আয়োজন বাতিল বা স্থগিত করতে হয়েছে। অতিরিক্ত বিদ্যুৎ ব্যবহারের কারণে বহু এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহে সংকট দেখা দিয়েছে। একই সঙ্গে শীতলীকরণ যন্ত্রের চাহিদা কয়েক গুণ বেড়ে যাওয়ায় বাজারে সংকট তৈরি হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই পরিস্থিতি জলবায়ু পরিবর্তনের ক্রমবর্ধমান প্রভাবেরই স্পষ্ট উদাহরণ।
ইউরোপে এক মাসে প্রায় তিন হাজার সাতশ মানুষের মৃত্যু : জুন মাসের শেষভাগে শুরু হওয়া ভয়াবহ তাপপ্রবাহ ইউরোপের ইতিহাসে অন্যতম শক্তিশালী বলে মনে করছেন আবহাওয়াবিদেরা। গত ২০ থেকে ২৮ জুন পর্যন্ত চলা এই তাপপ্রবাহে ফ্রান্স, বেলজিয়াম ও নেদারল্যান্ডসে অন্তত তিন হাজার সাত শ মানুষের মৃত্যু হয়েছে। সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এটি এখনো প্রাথমিক হিসাব। প্রকৃত সংখ্যা আরও বাড়তে পারে। সবচেয়ে বেশি প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে ফ্রান্সে। দেশটির স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, শুধু তাপপ্রবাহের সময় অতিরিক্ত দুই হাজার পঁচিশ মানুষের মৃত্যু হয়েছে। আগের সপ্তাহের তুলনায় বাড়িতে মৃত্যুর সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। বৃদ্ধাশ্রম ও স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানেও মৃত্যুর হার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বিশেষ করে পঁয়তাল্লিশ বছরের বেশি বয়সিদের মধ্যে মৃত্যুর হার উদ্বেগজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। বেলজিয়ামেও পরিস্থিতি ভয়াবহ। দেশটির স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় এক হাজার দুইশ মানুষের মৃত্যু হয়েছে। মৃতদের বড় একটি অংশের বয়স পঁচাশি বছরের বেশি হলেও অপেক্ষাকৃত কম বয়সিদের মধ্যেও প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ বলছে, তাপপ্রবাহের সময় এত বেশি অতিরিক্ত মৃত্যু দেশটির ইতিহাসে নজিরবিহীন।
নেদারল্যান্ডসেও প্রায় চারশ আশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে। অধিকাংশই প্রবীণ নাগরিক। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দীর্ঘ সময় ধরে উচ্চ তাপমাত্রা ও গরম বাতাসের কারণে দুর্বল ও বয়স্ক মানুষের ওপর সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়েছে।
স্বাস্থ্যসেবা ও অবকাঠামোর ওপর তীব্র চাপ : তাপপ্রবাহ শুধু প্রাণহানিই ঘটায়নি, ইউরোপের স্বাস্থ্যব্যবস্থা ও অবকাঠামোকেও বড় চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে। হাসপাতালে গরমজনিত অসুস্থ রোগীর সংখ্যা বেড়েছে। বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে। কোথাও কোথাও অতিরিক্ত তাপমাত্রায় রেললাইন বেঁকে গেছে, ট্রেন চলাচল ব্যাহত হয়েছে। অনেক স্কুল সাময়িকভাবে বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।
ফ্রান্সে পানিতে ডুবে মৃত্যুর ঘটনাও বেড়েছে। প্রচ- গরম থেকে স্বস্তি পেতে নদী ও জলাশয়ে নামতে গিয়ে বহু মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন বলে জানিয়েছে দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা সতর্ক করে জানিয়েছে, আগামী কয়েক সপ্তাহেও ইউরোপের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে তাপপ্রবাহ অব্যাহত থাকতে পারে। ফলে নতুন করে স্বাস্থ্যঝুঁকি ও প্রাণহানির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
শীতলীকরণ যন্ত্রের চাহিদায় বাজারে সংকট : অস্বাভাবিক গরমে ইউরোপজুড়ে শীতলীকরণ যন্ত্রের চাহিদা কয়েক গুণ বেড়ে গেছে। যুক্তরাজ্যের অন্যতম বৃহৎ প্রযুক্তিপণ্য বিক্রেতা প্রতিষ্ঠান জানিয়েছে, জুন মাসের রেকর্ড তাপমাত্রার পর ফ্যানের বিক্রি আগের সপ্তাহের তুলনায় প্রায় ত্রিশ গুণ এবং শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্রের বিক্রি তিন গুণেরও বেশি বেড়েছে।
চাহিদা হঠাৎ বেড়ে যাওয়ায় নতুন পণ্য সংগ্রহে হিমশিম খেতে হচ্ছে বিক্রেতাদের। অনেক স্থানে মজুত দ্রুত শেষ হয়ে যাচ্ছে। একই সঙ্গে বিশ্বজুড়ে অর্ধপরিবাহী চিপের সংকট ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক তথ্যকেন্দ্রগুলোর বাড়তি চাহিদার কারণে ইলেকট্রনিক পণ্যের দাম আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
যুক্তরাষ্ট্রেও তীব্র তাপপ্রবাহে ব্যাহত স্বাধীনতা দিবস : ইউরোপের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের মধ্য ও পূর্বাঞ্চলেও ভয়াবহ তাপপ্রবাহ আঘাত হেনেছে। দেশের অর্ধেকের বেশি মানুষ গরমজনিত সতর্কবার্তার আওতায় রয়েছে। রাজধানীসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ শহরে তাপমাত্রা বিপজ্জনক মাত্রায় পৌঁছেছে। এ অবস্থায় স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে আয়োজিত বহু শোভাযাত্রা, কনসার্ট, মেলা ও আতশবাজির অনুষ্ঠান বাতিল কিংবা স্থগিত করা হয়েছে। রাজধানীতে আয়োজিত বৃহৎ রাষ্ট্রীয় মেলাও কয়েক ঘণ্টার জন্য বন্ধ রাখতে হয়েছে। অংশগ্রহণকারী, স্বেচ্ছাসেবক ও কর্মীদের নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে আয়োজকেরা জানিয়েছেন। কয়েকটি বড় শহরে দুপুরের অনুষ্ঠান বিকেলে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। কোথাও কোথাও গরম থেকে মানুষকে স্বস্তি দিতে অস্থায়ী শীতলীকরণ কেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছে। তবে প্রচ- গরমে অসুস্থ হয়ে বহু মানুষকে হাসপাতালে নিতে হয়েছে।
বিদ্যুৎ ব্যবস্থায় বাড়তি চাপ : অতিরিক্ত গরমে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্রের ব্যবহার ব্যাপকভাবে বেড়ে যাওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন অঞ্চলে বিদ্যুৎ সরবরাহব্যবস্থা চরম চাপের মুখে পড়েছে। কয়েকটি এলাকায় বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষ গ্রাহকদের অপ্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ ব্যবহার কমানোর আহ্বান জানিয়েছে। বিশেষ করে বিকেল ও সন্ধ্যার সময় বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের জন্য জরুরি নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। তবুও বহু এলাকায় বিদ্যুৎ ঘাটতি দেখা দিয়েছে।
গরমে রাস্তাঘাটও উত্তপ্ত : প্রচ- তাপমাত্রার কারণে অনেক স্থানে পিচঢালা সড়ক নরম হয়ে গেছে। কোথাও কোথাও মানুষের জুতার তলাও গলে যাওয়ার খবর পাওয়া গেছে। আবহাওয়াবিদেরা সতর্ক করে বলেছেন, দীর্ঘ সময় রোদে অবস্থান করলে গরমজনিত অসুস্থতা, পানিশূন্যতা এবং হিটস্ট্রোকের ঝুঁকি দ্রুত বেড়ে যায়। স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ সাধারণ মানুষকে পর্যাপ্ত পানি পান, ছায়াযুক্ত স্থানে অবস্থান এবং প্রয়োজন ছাড়া বাইরে না যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছে। বিশেষ করে শিশু, প্রবীণ ও দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের বিষয়ে অতিরিক্ত সতর্কতা অবলম্বনের আহ্বান জানানো হয়েছে।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব আরও স্পষ্ট : বিজ্ঞানীদের মতে, সাম্প্রতিক এই তাপপ্রবাহ কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। মানবসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বিশ্বজুড়ে তাপপ্রবাহ আগের তুলনায় আরও ঘন ঘন, আরও দীর্ঘস্থায়ী এবং আরও তীব্র হয়ে উঠছে। বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা জানিয়েছে, ইউরোপ বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে দ্রুত উষ্ণ হয়ে ওঠা মহাদেশ। বৈশ্বিক গড়ের তুলনায় সেখানে তাপমাত্রা প্রায় দ্বিগুণ গতিতে বাড়ছে। এর ফলে ভবিষ্যতে এমন চরম আবহাওয়া আরও ঘন ঘন দেখা দিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্তমান পরিস্থিতি শুধু একটি মৌসুমি দুর্যোগ নয়, বরং বৈশ্বিক জলবায়ু সংকটের সুস্পষ্ট সতর্কবার্তা। সময়মতো কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না হলে ভবিষ্যতে তাপপ্রবাহের ভয়াবহতা আরও বাড়বে এবং মানুষের জীবন, অর্থনীতি ও পরিবেশের ওপর এর প্রভাব হবে আরও গভীর।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন