একসময় জুয়া মানেই ছিল কোনো নির্জন ঘর, গোপন আসর কিংবা নির্দিষ্ট কিছু মানুষের অবৈধ আড্ডা। আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর অভিযানে সেই আসর ভেঙে দেওয়া সম্ভব হতো। কিন্তু প্রযুক্তির দ্রুত বিকাশ জুয়ার সেই চিরচেনা রূপকে আমূল বদলে দিয়েছে। আজ জুয়ার আসর আর কোনো নির্দিষ্ট স্থানে বসে না। এটি স্থান করে নিয়েছে মানুষের হাতের মুঠোয় থাকা স্মার্টফোনে। একটি মোবাইল ফোন, ইন্টারনেট সংযোগ এবং কয়েকটি অ্যাপের মাধ্যমে যে কেউ মুহূর্তেই প্রবেশ করতে পারছে এক ভয়ংকর ভার্চুয়াল ক্যাসিনোর জগতে। ফলে অনলাইন জুয়া এখন শুধু একটি আইনশৃঙ্খলার সমস্যা নয়, এটি ক্রমেই জাতীয় অর্থনীতি, পারিবারিক স্থিতি, সামাজিক নিরাপত্তা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য বড় ধরনের হুমকিতে পরিণত হচ্ছে।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এই জুয়ার বিস্তার আর শহরকেন্দ্রিক নেই। রাজধানী থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত গ্রামের তরুণ, শিক্ষার্থী, চাকরিজীবী, এমনকি গৃহস্থ পরিবারের সদস্যরাও অনলাইন বেটিং, ভার্চুয়াল ক্যাসিনো, স্লট গেম কিংবা তথাকথিত ‘কালার প্রেডিকশন’-এর মতো প্রতারণামূলক খেলায় জড়িয়ে পড়ছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিভিন্ন মোবাইল অ্যাপকে কেন্দ্র করে প্রতিনিয়ত তৈরি হচ্ছে নতুন নতুন জুয়ার নেটওয়ার্ক। এগুলো শুধু অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার মাধ্যম নয়, বরং পরিকল্পিতভাবে মানুষের মনস্তত্ত্বকে কাজে লাগিয়ে তাদের আসক্ত করে তোলার এক সুসংগঠিত কৌশল।
এর ভয়াবহ প্রভাব ইতোমধ্যে দেশের অপরাধ পরিস্থিতিতেও দৃশ্যমান। সাম্প্রতিক সময়ে গ্রেপ্তার হওয়া বহু ছিনতাইকারী, চোর কিংবা প্রতারকের স্বীকারোক্তিতে উঠে এসেছে, অনলাইন জুয়ার লোকসান পুষিয়ে নিতেই তারা অপরাধের পথে পা বাড়িয়েছে।
পারিবারিক জীবনে এর প্রভাব আরও নির্মম। সংসারের সঞ্চয় শেষ হয়ে যাচ্ছে, সন্তানের পড়াশোনার টাকা জুয়ার টেবিলে হারিয়ে যাচ্ছে, স্ত্রীর গয়না বিক্রি হচ্ছে, এমনকি বাড়িঘর বন্ধক রাখার ঘটনাও বাড়ছে। এসবের পরিণতিতে বাড়ছে পারিবারিক কলহ, বিচ্ছেদ, সহিংসতা এবং মানসিক বিপর্যয়। একটি মানুষের আসক্তি ধ্বংস করে দিচ্ছে পুরো পরিবারকে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে শিশুরা, যারা অনিশ্চয়তা ও অস্থিরতার মধ্যে বেড়ে উঠছে।
সরকার সম্প্রতি অনলাইন জুয়া প্রতিরোধে নতুন আইন প্রণয়ন করেছে, যেখানে কঠোর শাস্তি, সম্পদ জব্দ, ডিজিটাল নজরদারি এবং প্রযুক্তিনির্ভর তদন্তের বিধান রাখা হয়েছে। এটি অবশ্যই সময়োপযোগী উদ্যোগ। কিন্তু কেবল কঠোর আইন করলেই সমস্যার সমাধান হবে, এমনটি ভাবার সুযোগ নেই। কারণ প্রযুক্তিনির্ভর অপরাধের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে অপরাধীরাও প্রতিনিয়ত নতুন কৌশল গ্রহণ করছে। বিদেশভিত্তিক সার্ভার, ভিপিএন, ক্রিপ্টোকারেন্সি এবং জটিল আর্থিক লেনদেনের কারণে এই চক্রকে শনাক্ত ও বিচারের আওতায় আনা সহজ নয়। ফলে আইন প্রয়োগের পাশাপাশি প্রয়োজন দক্ষ জনবল, আধুনিক প্রযুক্তি এবং বিভিন্ন সংস্থার সমন্বিত উদ্যোগ।
একই সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলোরও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। যেসব প্ল্যাটফর্মে প্রকাশ্যে অনলাইন জুয়ার বিজ্ঞাপন, প্রলোভন কিংবা রেফারেল লিংক ছড়িয়ে পড়ছে, সেগুলোর বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস, ব্যাংক এবং পেমেন্ট গেটওয়েগুলোকেও সন্দেহজনক লেনদেন শনাক্তে আরও কার্যকর ভূমিকা পালন করতে হবে। প্রযুক্তিগত নজরদারির পাশাপাশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সচেতনতামূলক কার্যক্রম, কাউন্সেলিং এবং পরিবারভিত্তিক সামাজিক প্রতিরোধও জোরদার করা জরুরি।
দ্রুত ধনী হওয়ার স্বপ্ন মানুষের স্বাভাবিক দুর্বলতা। আর সেই দুর্বলতাকেই পুঁজি করে অনলাইন জুয়ার চক্র বিস্তার লাভ করছে। তাই এই সংকট মোকাবিলায় শুধু পুলিশি অভিযান বা আদালতের রায় যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন রাষ্ট্র, পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম এবং নাগরিক সমাজের সম্মিলিত প্রতিরোধ। অন্যথায় হাতের মুঠোয় থাকা এই ‘পকেট ক্যাসিনো’ একদিন এমন এক সামাজিক মহামারিতে রূপ নেবে, যার মূল্য দিতে হবে পুরো জাতিকে।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন