× UCB Sticker Card
রবিবার, ০৫ জুলাই, ২০২৬

ফেসবুক


ইউটিউব


টিকটক

Rupali Bangladesh

ইনস্টাগ্রাম

Rupali Bangladesh

এক্স

Rupali Bangladesh


লিংকডইন

Rupali Bangladesh

পিন্টারেস্ট

Rupali Bangladesh

গুগল নিউজ

Rupali Bangladesh


হোয়াটস অ্যাপ

Rupali Bangladesh

টেলিগ্রাম

Rupali Bangladesh

মেসেঞ্জার গ্রুপ

Rupali Bangladesh


En Bn

এস এম মেহেদী হাসান,  মুক্ত লেখক ও সাংবাদিক

প্রকাশিত: জুলাই ৫, ২০২৬, ০৭:১৬ এএম

অবৈধ গ্যাস সংযোগের সাম্রাজ্য : কারা লুটছে রাষ্ট্রের সম্পদ?

এস এম মেহেদী হাসান,  মুক্ত লেখক ও সাংবাদিক

প্রকাশিত: জুলাই ৫, ২০২৬, ০৭:১৬ এএম

অবৈধ গ্যাস সংযোগের সাম্রাজ্য : কারা লুটছে রাষ্ট্রের সম্পদ?

গ্যাস শুধু একটি জ্বালানি নয়, এটি দেশের শিল্প, অর্থনীতি ও নাগরিক জীবনের অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। অথচ এই মূল্যবান সম্পদ বছরের পর বছর অবৈধ সংযোগ, চুরি এবং দুর্নীতির জালে বন্দি হয়ে রাষ্ট্রকে দিচ্ছে হাজার কোটি টাকার ক্ষতি।

বাংলাদেশে জ্বালানি সংকট এখন আর নতুন কোনো বিষয় নয়। শিল্প-কারখানা থেকে শুরু করে আবাসিক গ্রাহক, সিএনজি স্টেশন থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র, প্রায় সব ক্ষেত্রেই গ্যাসের চাহিদা সরবরাহের চেয়ে অনেক বেশি। রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে প্রতিদিন হাজার হাজার পরিবার রান্নার জন্য প্রয়োজনীয় গ্যাস না পেয়ে ভোগান্তিতে পড়ছে। শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোও উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার অভিযোগ করছে। অথচ একই সময়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে অবৈধ সংযোগের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ গ্যাস চুরি হয়ে যাচ্ছে।

সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন অনুসন্ধান এবং জাতীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এক উদ্বেগজনক চিত্র। রাজধানী ঢাকা ও আশপাশের জেলাগুলোতেই প্রায় এক লাখ গ্রাহক অবৈধভাবে গ্যাস ব্যবহার করছেন। এসব অবৈধ সংযোগের জন্য গড়ে তোলা হয়েছে প্রায় ৩০০ কিলোমিটার দীর্ঘ অবৈধ পাইপলাইন নেটওয়ার্ক। এই নেটওয়ার্কের মাধ্যমে প্রতিদিন প্রায় ১৫ লাখ ঘনফুট গ্যাস অবৈধভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে।

অবৈধ গ্যাসের বিস্তৃত নেটওয়ার্ক

তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির (টিজিটিডিসিএল) অনুসন্ধানে দেখা গেছে, অবৈধ গ্যাস সংযোগের বিস্তার রাজধানী ঢাকা ছাড়িয়ে আশপাশের বিভিন্ন জেলায় ছড়িয়ে পড়েছে। নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁ, আড়াইহাজার ও বন্দর; মুন্সীগঞ্জের গজারিয়া; নরসিংদীর পলাশ ও কাঞ্চন; গাজীপুরের কালীগঞ্জ ও কালিয়াকৈর; আশুলিয়ার বিকেএসপি এলাকা; রাজধানীর জিঞ্জিরা, উত্তরখান, দক্ষিণখান, ডেমরা, নন্দীপাড়া, গাবতলী বেড়িবাঁধ এবং সাভারের বিভিন্ন এলাকায় অবৈধ গ্যাস সংযোগের অস্তিত্ব পাওয়া গেছে।

এসব এলাকায় নি¤œমানের পাইপ বসিয়ে গড়ে তোলা হয়েছে গোপন গ্যাস নেটওয়ার্ক। আবাসিক ব্যবহারকারী ছাড়াও ক্ষুদ্র শিল্প, বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান এবং বিভিন্ন কারখানায় এসব চোরাই গ্যাস ব্যবহার করা হচ্ছে।

সংকটের মধ্যেও অব্যাহত গ্যাস চুরি

বাংলাদেশের দৈনিক গ্যাস চাহিদা প্রায় তিন হাজার ৮০০ এমএমসিএফডি (মিলিয়ন ঘনফুট), কিন্তু সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে প্রায় দুই হাজার ৬৩৫ এমএমসিএফডি। ফলে দৈনিক প্রায় এক হাজার ২০০ এমএমসিএফডির ঘাটতি রয়েছে।

এই সংকটের কারণে বৈধ গ্রাহকেরা নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস পাচ্ছেন না। শিল্প-কারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, আবাসিক এলাকায় রান্নার জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হচ্ছে। অথচ অবৈধ ব্যবহারকারীরা নির্দ্বিধায় চোরাই গ্যাস ব্যবহার করে চলেছেন।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, অবৈধ সংযোগের মাধ্যমে অপচয় হওয়া গ্যাস পুরোপুরি বন্ধ করা গেলে দেশের সব ইউরিয়া সার কারখানা চালানোর জন্য প্রয়োজনীয় গ্যাসের উল্লেখযোগ্য অংশের জোগান নিশ্চিত করা সম্ভব।

সিস্টেম লস নাকি গ্যাস চুরি?

পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের নভেম্বর পর্যন্ত আগের ১১ মাসে তিতাস গ্যাসের গড় সিস্টেম লস ছিল ৯ দশমিক ৩৬ শতাংশ। অন্যদিকে জালালাবাদ গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন সিস্টেম লিমিটেডের ক্ষেত্রে এ হার মাত্র শূন্য দশমিক ৬৫ শতাংশ।

আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী গ্যাস বিতরণে শূন্য দশমিক ২০ থেকে শূন্য দশমিক ৩০ শতাংশ পর্যন্ত সিস্টেম লস গ্রহণযোগ্য। সে তুলনায় বাংলাদেশের কিছু বিতরণ কোম্পানির ক্ষতির হার উদ্বেগজনক।

বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ বলেছেন, তিতাসের বড় নেটওয়ার্ক বিবেচনায় দুই শতাংশ পর্যন্ত প্রযুক্তিগত ক্ষতি অনুমোদন করা হলেও এর বেশি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, উচ্চ সিস্টেম লসের পেছনে শুধু পুরোনো পাইপলাইনের লিকেজ নয়, অবৈধ সংযোগ, মিটার টেম্পারিং এবং সংঘবদ্ধ গ্যাস চুরিও বড় কারণ।

কারা জড়িত এই সিন্ডিকেটে?

অভিযোগ রয়েছে, অবৈধ গ্যাস সংযোগের পেছনে স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তি, রাজনৈতিকভাবে ক্ষমতাবান কিছু মহল এবং গ্যাস বিতরণ কোম্পানির একশ্রেণির অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীর যোগসাজশ রয়েছে।

জ্বালানি মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, অবৈধ সংযোগ উচ্ছেদের জন্য জেলা ও উপজেলা প্রশাসনকে একাধিকবার চিঠি দেওয়া হলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে কার্যকর অভিযান পরিচালিত হয়নি। ফলে বছরের পর বছর ধরে এসব অবৈধ নেটওয়ার্ক বহাল রয়েছে।

জাতীয় পত্রিকাগুলোতে অতীতেও এমন খবর প্রকাশ হয়েছে যে, কিছু এলাকায় স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের যোগসাজশে রোহিঙ্গাদের জন্যও অবৈধ জন্ম নিবন্ধনের পাশাপাশি অবৈধ গ্যাস সংযোগ দেওয়ার অভিযোগ উঠেছিল। এসব ঘটনা দেখিয়েছে, রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার দুর্বলতা এবং দুর্নীতির সুযোগ নিয়ে কীভাবে সংঘবদ্ধ চক্র নিজেদের অবৈধ ব্যবসা বিস্তার করেছে।

অভিযান চলছে, কিন্তু প্রশ্ন রয়ে গেছে

গণমাধ্যমের এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০২৪ সালে মাত্র দুই মাসে তিতাস গ্যাস ৭ হাজার ৪টি অবৈধ গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্ন করেছে। এর মধ্যে ছিল ৯৭টি শিল্প সংযোগ, ৫৬টি বাণিজ্যিক সংযোগ এবং ৬ হাজার ৮৫১টি আবাসিক সংযোগ। একই সময়ে প্রায় ৪০ কিলোমিটার অবৈধ পাইপলাইন অপসারণ করা হয়।

এ ছাড়া তিতাস এক বছরে এক লাখ ১১ হাজারেরও বেশি অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করেছে।

তবে প্রশ্ন হলো, যদি এত বিপুল পরিমাণ অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা সম্ভব হয়, তা হলে নতুন করে এসব সংযোগ আবার কীভাবে স্থাপিত হচ্ছে?

জননিরাপত্তার জন্য ভয়াবহ হুমকি

অবৈধ গ্যাস সংযোগ শুধু রাষ্ট্রীয় সম্পদ চুরি নয়, এটি জননিরাপত্তার জন্যও ভয়াবহ হুমকি। বেশির ভাগ অবৈধ সংযোগে নি¤œমানের পাইপ ও যন্ত্রপাতি ব্যবহার করা হয়। ফলে যেকোনো সময় গ্যাস লিকেজ, অগ্নিকা- কিংবা বিস্ফোরণের ঝুঁকি তৈরি হয়। অতীতে দেশের বিভিন্ন এলাকায় অবৈধ গ্যাস লাইনের কারণে অগ্নিকা- ও বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে, যাতে প্রাণহানি ও ব্যাপক সম্পদের ক্ষতি হয়েছে।

হরিপুরের অবৈধ চুন কারখানায় আবারও অভিযান 

চলতি মাসের ২ জুলাই নারায়ণগঞ্জের বন্দরের হরিপুর এলাকায় দ্বিতীয়বারের মতো একটি অবৈধ চুন কারখানায় অভিযান চালায় তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষ। অভিযানে শুধু অবৈধ গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্নই করা হয়নি, চুন পোড়ানোর চুলাটিও গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়।

স্থানীয়দের অভিযোগ, রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে কারখানাটি পুনরায় চালু করা হয়েছিল। তবে চালুর পরদিনই তিতাসের অভিযানে তা আবার বন্ধ করে দেওয়া হয়।

এই ঘটনা দেখিয়ে দেয়, অভিযান পরিচালনার পাশাপাশি অবৈধ সংযোগের পেছনের প্রভাবশালী সিন্ডিকেটকে আইনের আওতায় না আনলে সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।

কী করা প্রয়োজন?

বিশেষজ্ঞদের মতে, অবৈধ গ্যাস সংযোগ বন্ধ করতে কয়েকটি জরুরি পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।

প্রথমত, গ্যাস বিতরণ ব্যবস্থার পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল নজরদারি এবং স্মার্ট মিটারিং চালু করতে হবে।

দ্বিতীয়ত, অবৈধ সংযোগের সঙ্গে জড়িত কর্মকর্তা-কর্মচারী, দালাল ও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে হবে।

তৃতীয়ত, পুরোনো ও ঝুঁকিপূর্ণ পাইপলাইন প্রতিস্থাপন করে সিস্টেম লস কমাতে হবে।

চতুর্থত, স্থানীয় প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং গ্যাস বিতরণ কোম্পানিগুলোর সমন্বিত অভিযানকে নিয়মিত ও কার্যকর করতে হবে।

বাংলাদেশ আজ জ্বালানি নিরাপত্তা, ডলার সংকট এবং শিল্প উৎপাদনের চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এই বাস্তবতায় অবৈধ গ্যাস সংযোগ কেবল রাষ্ট্রীয় সম্পদের চুরি নয়; এটি অর্থনৈতিক উন্নয়ন, শিল্পায়ন এবং জননিরাপত্তার বিরুদ্ধে এক নীরব ধ্বংসযজ্ঞ।

রাষ্ট্রের মূল্যবান সম্পদ রক্ষা করতে হলে অবৈধ গ্যাস সংযোগের অদৃশ্য সাম্রাজ্য ভেঙে দিতে হবে। অন্যথায় বৈধ গ্রাহকের দুর্ভোগ বাড়বে, আমদানি করা ব্যয়বহুল এলএনজির ওপর নির্ভরতা বাড়বে এবং রাষ্ট্রকে প্রতি বছর বিপুল আর্থিক ক্ষতির বোঝা বহন করতে হবে।

জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এখন প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা, কঠোর আইন প্রয়োগ এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে আপসহীন অবস্থান। কারণ গ্যাস চুরি বন্ধ করা মানে শুধু রাজস্ব সুরক্ষা নয়, বরং দেশের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা এবং ভবিষ্যৎ উন্নয়নের ভিত্তিকে শক্তিশালী করা।

রূপালী বাংলাদেশ

Link copied!