× UCB Sticker Card
রবিবার, ০৫ জুলাই, ২০২৬

ফেসবুক


ইউটিউব


টিকটক

Rupali Bangladesh

ইনস্টাগ্রাম

Rupali Bangladesh

এক্স

Rupali Bangladesh


লিংকডইন

Rupali Bangladesh

পিন্টারেস্ট

Rupali Bangladesh

গুগল নিউজ

Rupali Bangladesh


হোয়াটস অ্যাপ

Rupali Bangladesh

টেলিগ্রাম

Rupali Bangladesh

মেসেঞ্জার গ্রুপ

Rupali Bangladesh


En Bn

সনেট দেব,  প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট

প্রকাশিত: জুলাই ৫, ২০২৬, ০৭:১৭ এএম

সমাজের অরাজকতা ও বিপর্যয়ের মূলে মাদক

সনেট দেব,  প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট

প্রকাশিত: জুলাই ৫, ২০২৬, ০৭:১৭ এএম

সমাজের অরাজকতা ও বিপর্যয়ের মূলে মাদক

আজকের বাংলাদেশে চোখ মেললেই দেখা যায় এক অদ্ভুত অস্থিরতা। পথে-ঘাটে অপরাধ, পরিবারে ভাঙন, শিক্ষাঙ্গনে বিশৃঙ্খলা, এবং তরুণ সমাজের ভয়াবহ অবক্ষয়। এই বহুমুখী সংকটের কেন্দ্রে যদি একটিমাত্র কারণ খুঁজতে হয়, তা হলে সেটি নিঃসন্দেহে মাদক। মাদকের সর্বনাশা ছোবল আজ শুধু কিছু মানুষের জীবন নষ্ট করছে নাÑ এটি গোটা সমাজ কাঠামোকে ভেতর থেকে ফাঁপা করে দিচ্ছে। পরিবার থেকে রাষ্ট্র, ব্যক্তি থেকে সমষ্টিÑ সবই আজ মাদকের বিষাক্ত থাবার শিকার।

জাতিসংঘের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশের মাদকাসক্তদের মধ্যে ৮৪ শতাংশ পুরুষ এবং ১৬ শতাংশ নারী। উদ্বেগের বিষয় হলো, নারী মাদকাসক্তের হার ক্রমশ বাড়ছে। মাদকসেবীদের মধ্যে ৪৩ শতাংশ বেকার এবং ৫০ শতাংশ কোনো না কোনো অপরাধের সঙ্গে জড়িত। সারা দেশে প্রায় সাড়ে তিন লাখ মানুষ মাদক কারবারের সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িত। প্রতিদিন কমপক্ষে ২০০ কোটি টাকার মাদক কেনাবেচা হচ্ছে এবং প্রতি বছর অবৈধ মাদক আমদানির জন্য ১০ হাজার কোটিরও বেশি টাকা বিদেশে পাচার হচ্ছে।

মাদক কোনো ব্যক্তিগত সমস্যা নয়Ñ এটি একটি সামাজিক বিপর্যয়। একজন মানুষ মাদকাসক্ত হলে তার পরিবার বিধ্বস্ত হয়, প্রতিবেশী ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং সমাজে ভয়ের পরিবেশ তৈরি হয়। মাদকাসক্তি মানুষের মধ্যে থাকা মানবিকতা, বিবেক ও ন্যায়-অন্যায়বোধ সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস করে দেয়। তখন সে আর মানুষ থাকে নাÑ হয়ে ওঠে হিংস্র, বিপজ্জনক এক সত্তা।

পত্রিকার পাতায় প্রতিদিন দেখা যায় এমন সব মর্মান্তিক সংবাদÑ নেশাগ্রস্ত ছেলে মা-বাবাকে খুন করেছে, মাদকের টাকা না পেয়ে স্বামী স্ত্রীকে আগুনে পুড়িয়ে দিয়েছে, আসক্ত বাবা নিজের সন্তানকে বিক্রি করে দিয়েছে নেশার টাকার জন্য। এগুলো কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়Ñ এগুলো মাদকের নিয়মিত ফসল। মাদক নেওয়ার অর্থ জোগাড় করতে কিশোর-তরুণরা চুরি, ছিনতাই, চাঁদাবাজি, এমনকি খুনের মতো জঘন্য অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। মাদক কারবারি ও সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্র এই আসক্ত তরুণদের অপহরণ, হত্যাসহ নানা অপরাধকর্মে ব্যবহার করছে।

মাদকসেবীর শরীর ও মন এক সঙ্গে ভেঙে পড়ে। ইয়াবা, আইস, হেরোইন বা কোকেনÑ যে মাদকই হোক না কেন, দীর্ঘমেয়াদে এগুলো মানুষের হৃদযন্ত্র, ফুসফুস, লিভার, কিডনি এবং মস্তিষ্ককে ধীরে ধীরে অকেজো করে দেয়। ইয়াবা সেবনে উচ্চ রক্তচাপ দেখা দেয়, মস্তিষ্কের ভেতরকার ছোট রক্তনালি ক্ষতিগ্রস্ত হয়, এমনকি ছিঁড়ে রক্তক্ষরণ হতে পারে। ইয়াবা, আইস, কোকেন ও ফেনসিডিল সেবনে স্ট্রোকের ঝুঁকি অনেক গুণ বেড়ে যায়। মাদকাসক্ত তরুণদের নিউরো-সংক্রান্ত জটিলতায় আক্রান্ত হওয়ার প্রবণতা অনেক বেশি। মানসিক দিক থেকেও ক্ষতি কম নয়। মাদকাসক্তি মানুষের আচরণে বৈকল্য, মেজাজে অস্থিরতা, অহেতুক রাগ ও আক্রমণাত্মকতা এবং বিষণœতার জন্ম দেয়। দীর্ঘদিনের আসক্তিতে স্মৃতিশক্তি কমে যায়, সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা নষ্ট হয়ে যায়।

তরুণদের মাদকের দিকে ঝুঁকে পড়ার কারণ একটি নয়, বহুমুখী। সমাজ ও পরিবারের নানা ব্যর্থতাই এর পেছনে দায়ী। প্রথমত, বেকারত্ব ও হতাশা। উচ্চশিক্ষা নিয়েও চাকরি না পাওয়া, স্বপ্ন ও বাস্তবতার মধ্যে বিশাল ফারাকÑ এই হতাশা তরুণদের মাদকের দিকে ঠেলে দেয়। দ্বিতীয়ত, পারিবারিক অশান্তি। বাবা-মায়ের মধ্যে কলহ, পারিবারিক ভাঙন এবং সন্তানের প্রতি যথাযথ মনোযোগের অভাব তাদের একাকিত্বের দিকে ঠেলে দেয়। এই একাকিত্ব পূরণ করতে তারা মাদকের আশ্রয় নেয়।

তৃতীয়ত, কুসঙ্গ ও বন্ধুদের প্রলোভন। গবেষণায় দেখা গেছে, প্রায় ৫৯ শতাংশ কিশোর-কিশোরী সঙ্গ দোষ ও বন্ধু-বান্ধবের প্রভাবে এবং ৩৬ শতাংশ কৌতূহলবশত মাদকের জগতে প্রবেশ করে। ‘একবার চেষ্টা করো, কিছু হবে না’Ñ এই মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে বন্ধুরা একে অপরকে মাদকের পথে নিয়ে যায়। চতুর্থত, মাদকের সহজলভ্যতা। শহর থেকে গ্রাম, স্কুলের বাইরে থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসÑ সর্বত্র মাদক সহজে পাওয়া যাচ্ছে। পঞ্চমত, ধর্মীয় ও নৈতিক মূল্যবোধের অভাব। ধর্মচর্চা ও নৈতিক শিক্ষার ঘাটতি তরুণদের মাদকের বিরুদ্ধে প্রতিরোধশক্তিকে দুর্বল করে দেয়।

মাদক ও অপরাধ একে অপরের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। মাদকাসক্তি অপরাধের জন্ম দেয় এবং অপরাধের আয় আবার মাদকে ঢালা হয়Ñ এভাবেই চলে এক ভয়াবহ বিষচক্র। মাদকের টাকা জোগাড় করতে আসক্ত তরুণরা প্রথমে পরিবারের কাছ থেকে চুরি করে, তারপর বাইরে। ছিনতাই, চাঁদাবাজি, ডাকাতিÑ একটির পর একটি অপরাধে তারা জড়িয়ে পড়ে। মাদক কারবারিরা এই আসক্ত তরুণদের খুন, অপহরণ ও সন্ত্রাসী কার্যক্রমে ব্যবহার করে।

রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে যে কিশোর গ্যাং সংস্কৃতির উদ্ভব হয়েছে, তার মূলে রয়েছে মাদক। গ্যাং সদস্যরা মাদক সেবন করে সাহস সঞ্চয় করে এবং হিংস্র কাজ করে। স্কুলে-কলেজে সহপাঠীকে মারধর, রাস্তায় মেয়েদের উত্ত্যক্ত করা, এমনকি ছুরিকাঘাতে হত্যার মতো ঘটনাগুলো মাদকের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। দেশের সামগ্রিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতিতে মাদকের অবদান অনস্বীকার্য। মাদক কারবার এখন নিষিদ্ধ জগতে অস্ত্রের পরেই সবচেয়ে লাভজনক। এই বিপুল মুনাফার কারণে মাদক কারবারিরা রাজনৈতিক, প্রশাসনিক ও পুলিশি সুরক্ষা পেয়ে থাকে বলে অভিযোগ রয়েছে। এর ফলে মাদক নির্মূল করা কঠিন হয়ে পড়ছে। সারা দেশে প্রায় ৩০ লাখ মাদক কারবারি সক্রিয় রয়েছে বলে অনুমান করা হয়।

মাদকের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এই লড়াই শুধু সরকারের নয়Ñ পরিবার, সমাজ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানকেও সমানভাবে এগিয়ে আসতে হবে। পরিবারই হলো মাদক প্রতিরোধের প্রথম ও প্রধান ঢাল। বাবা-মাকে সন্তানের দৈনন্দিন জীবনের খোঁজ রাখতে হবে। সে কার সঙ্গে মিশছে, কোথায় যাচ্ছেÑ এসব বিষয়ে সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হবে। পারিবারিক কলহ ও অশান্তি সন্তানের মানসিক স্বাস্থ্যকে ক্ষতিগ্রস্ত করে, তাই পরিবারে সুস্থ ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশ তৈরি করা জরুরি।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সাধারণ শিক্ষার পাশাপাশি মাদকের ভয়াবহ কুফল সম্পর্কে বাধ্যতামূলক শিক্ষা চালু করতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সময় ডোপ টেস্ট বাধ্যতামূলক করা এবং পড়াশোনাকালীন নিয়মিত ডোপ টেস্টের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। প্রতিটি হলে পরামর্শদাতা নিয়োগ দিতে হবে, যাতে শিক্ষার্থীরা মানসিক চাপ ও সংকটের সময় সহায়তা পেতে পারে। তরুণদের খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক ও সৃজনশীল কার্যক্রমে সক্রিয় রাখা মাদক প্রতিরোধে অত্যন্ত কার্যকর।

বাংলাদেশে মাদক নিয়ন্ত্রণের জন্য আইনি কাঠামো রয়েছে। ১৯৯০ সালে প্রণীত মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন এবং ওই বছরই প্রতিষ্ঠিত মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর দীর্ঘদিন ধরে কাজ করে যাচ্ছে। অধিদপ্তর তিনটি কৌশলে কাজ করেÑ চাহিদা হ্রাস, সরবরাহ হ্রাস এবং ক্ষতি হ্রাস। কিন্তু বাস্তবতা হলো, আইন থাকলেই যথেষ্ট নয়Ñ দরকার কার্যকর বাস্তবায়ন। মাদক মামলার দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য পৃথক আদালত গঠন, সীমান্তে কঠোর নজরদারি এবং মাদক কারবারিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা জরুরি।

সীমান্ত এলাকায় যারা দারিদ্র্যের কারণে মাদক পাচারে জড়িত হয়ে পড়েছেন, তাদের বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ করে দিতে হবে। বেকারত্ব কমাতে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা গেলে মাদকের চাহিদাও কমবে। প্রতিটি সরকারি হাসপাতালে মাদকাসক্তি চিকিৎসার সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে এবং দেশের বিভিন্ন স্থানে আরও বেশি নিরাময় কেন্দ্র স্থাপন করতে হবে। মাদক পাচার রোধে মিয়ানমার, ভারতসহ প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাড়ানো অপরিহার্য।

মাদক একটি সর্বগ্রাসী বিপদÑ এটি শুধু একজন মানুষের জীবন নষ্ট করে না, বরং পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের সমূহ ক্ষতি করে। সমাজে যে অরাজকতা, হিংসা, পারিবারিক ভাঙন ও নৈতিক অবক্ষয় দেখা যাচ্ছে, তার সবচেয়ে বড় কারণ মাদকÑ এ সত্য আজ আর অস্বীকার করার উপায় নেই। মাদকের বিষচক্র ভাঙতে হলে চাই সমন্বিত ও দৃঢ় প্রতিরোধ।

মনে রাখতে হবে, মাদকাসক্ত ব্যক্তি নিজেও একজন ভুক্তভোগী। তাকে ঘৃণা করা নয়, বরং তার প্রতি সহানুভূতির হাত বাড়িয়ে দিতে হবে। একই সঙ্গে যারা মাদকের ব্যবসা করছে, যারা এই বিষ সমাজে ছড়িয়ে দিচ্ছেÑ তাদের কঠোর আইনের আওতায় আনতে হবে। দল, মত, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে সবাইকে হাতে হাত রেখে মাদকমুক্ত সমাজ গড়ার স্বপ্ন নিয়ে এগিয়ে যেতে হবে। কারণ এই প্রজন্মকে যদি আমরা বাঁচাতে না পারি, তা হলে ভবিষ্যতের বাংলাদেশকেও বাঁচানো সম্ভব হবে না।

 

রূপালী বাংলাদেশ

Link copied!