× UCB Sticker Card
রবিবার, ০৫ জুলাই, ২০২৬

ফেসবুক


ইউটিউব


টিকটক

Rupali Bangladesh

ইনস্টাগ্রাম

Rupali Bangladesh

এক্স

Rupali Bangladesh


লিংকডইন

Rupali Bangladesh

পিন্টারেস্ট

Rupali Bangladesh

গুগল নিউজ

Rupali Bangladesh


হোয়াটস অ্যাপ

Rupali Bangladesh

টেলিগ্রাম

Rupali Bangladesh

মেসেঞ্জার গ্রুপ

Rupali Bangladesh


En Bn

ওমর ফারুক

প্রকাশিত: জুলাই ৫, ২০২৬, ০৭:২৪ এএম

মেসিদের জয়ের রাতে কেপ ভার্দের মহাকাব্য

ওমর ফারুক

প্রকাশিত: জুলাই ৫, ২০২৬, ০৭:২৪ এএম

মেসিদের  জয়ের রাতে কেপ ভার্দের মহাকাব্য

ফুটবলের ইতিহাসে এমন কিছু রাত আসে, যেগুলোকে শুধু ফলাফল দিয়ে বিচার করা যায় না। স্কোরবোর্ড সেখানে কেবল একটি সংখ্যা,  প্রকৃত ইতিহাস লেখা হয় মানুষের স্মৃতিতে, আবেগে, বিস্ময়ে। এমন কিছু ম্যাচ আছে, যেখানে বিজয়ী দল ট্রফির দিকে এক ধাপ এগিয়ে যায়, কিন্তু পরাজিত দল জায়গা করে নেয় মানুষের হৃদয়ের সবচেয়ে নিরাপদ কোণে। মায়ামির সেই রাত ছিল তেমনই এক রাত, যেখানে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা জয় পেয়েছিল, কিন্তু ফুটবলের সবচেয়ে সুন্দর গল্পটি লিখেছিল কেপ ভার্দে। আর্জেন্টিনার বিপক্ষে খেলাই যাদের কাছে স্বপ্নপূরণের মতো, সেই কেপ ভার্দেই আজ কাঁপিয়ে দিল বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের।

শেষ বাঁশি বাজার পর স্কোরবোর্ড বলছিল, আর্জেন্টিনা ৩, কেপ ভার্দে ২। কিন্তু এই সংখ্যার ভেতরে লুকিয়ে ছিল এমন এক মহাকাব্য, যার প্রতিটি বাক্যে ছিল সাহস, প্রতিটি অনুচ্ছেদে ছিল আত্মবিশ্বাস, আর প্রতিটি মুহূর্তে ছিল অসম্ভবকে সম্ভব করার এক অবিশ্বাস্য চেষ্টা।

ম্যাচের আগে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন একজনই, লিওনেল মেসি। বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে তার আরেকটি জাদুকরী রাত দেখার অপেক্ষায় ছিল কোটি মানুষ। কেউ ভাবছিলেন তিনি নতুন কোনো রেকর্ড গড়বেন, কেউ ভাবছিলেন আরেকটি মাস্টারক্লাস উপহার দেবেন। কেপ ভার্দে যেন ছিল সেই নাটকের পার্শ্বচরিত্র, একটি ছোট্ট দ্বীপরাষ্ট্র, যারা প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপে এসেছে, যাদের নাম উচ্চারণ করতেও অনেকের কষ্ট হতো।

কিন্তু ফুটবল বারবার প্রমাণ করেছে, সবচেয়ে বড় নাটকগুলো লেখা হয় সেই চরিত্রদের দিয়েই, যাদের জন্য কেউ অপেক্ষা করে না।

মাত্র ছয় লাখ মানুষের দেশ। আটলান্টিক মহাসাগরের বুকে ছড়িয়ে থাকা কয়েকটি দ্বীপের সমষ্টি। ফিফা র?্যাঙ্কিংয়ে আর্জেন্টিনার চেয়ে ৬৩ ধাপ পিছিয়ে। ইতিহাস, পরিসংখ্যান, অভিজ্ঞতা, তারকাÑ সবকিছুতেই যোজন যোজন দূরত্ব। কাগজে-কলমে ম্যাচটি ছিল অসম লড়াই। অনেকেই এটিকে নকআউট পর্বের সবচেয়ে একপেশে ম্যাচ বলেও ধরে নিয়েছিলেন। কিন্তু মাঠে নামার পর যেন সব হিসাব উল্টে গেল।

ফুটবল মাঠের ঘাস কখনো র?্যাঙ্কিং দেখে না। বল কখনো জনসংখ্যা গোনে না। জার্সির তারকার সংখ্যাও তাকে প্রভাবিত করে না। সে কেবল দেখে কে কতটা সাহস নিয়ে খেলছে, কে কতটা বিশ্বাস নিয়ে দৌড়াচ্ছে, আর কে নিজের শেষ শক্তিটুকুও নিংড়ে দিতে প্রস্তুত। কেপ ভার্দে সেদিন ঠিক সেটাই করেছিল।

ম্যাচের প্রথম মিনিট থেকেই তারা বুঝিয়ে দিয়েছিল, তারা দর্শক হয়ে আসেনি। তারা ইতিহাসের অংশ হতে এসেছে। প্রতিটি বলের জন্য লড়াই করেছে, প্রতিটি ট্যাকলে নিজেদের শরীর ছুড়ে দিয়েছে, প্রতিটি আক্রমণে আর্জেন্টিনাকে মনে করিয়ে দিয়েছে, আজকের রাতটি সহজ হবে না।

কখনো কখনো মনে হচ্ছিল, বিশ্বচ্যাম্পিয়ন দলটি নয়, বরং প্রথমবার বিশ্বকাপ খেলতে আসা দলটিই ম্যাচের ছন্দ নিয়ন্ত্রণ করছে। স্টেডিয়ামে উপস্থিত হাজারো আর্জেন্টাইন সমর্থকের উল্লাসের মাঝেও কেপ ভার্দের প্রতিটি সফল পাস, প্রতিটি ট্যাকল, প্রতিটি সেভ ধীরে ধীরে নিরপেক্ষ দর্শকদের হৃদয় নিজের দিকে টেনে নিচ্ছিল।

মায়ামির গ্যালারিতে তখন অদ্ভুত এক অনুভূতির জন্ম হচ্ছিল। সবাই চেয়েছিল মেসি জিতুন। কিন্তু একই সঙ্গে সবাই চাইছিল কেপ ভার্দের এই অসম্ভব লড়াইয়েরও যেন একটি সুন্দর পরিণতি হোক। ফুটবলে এমন মুহূর্ত খুব কম আসে, যখন প্রতিপক্ষকে ভালোবেসে ফেলা যায়। সেদিন কেপ ভার্দে সেই অসম্ভব কাজটিই করেছিল।

এই ম্যাচটিকে যদি একটি উপন্যাস ধরা হয়, তবে তার সবচেয়ে উজ্জ্বল চরিত্র নিঃসন্দেহে ভোজিনিয়া। চল্লিশ বছর বয়সি এই গোলরক্ষক হয়তো কখনো ব্যালন ডি’অরের আলোচনায় আসবেন না। তার নামে বড় ক্লাবগুলোর আগ্রহের খবরও শোনা যাবে না। কিন্তু মায়ামির সেই রাতে তিনি এমন এক অধ্যায় লিখে গেলেন, যা বহু বছর পরও বিশ্বকাপের গল্পে ফিরে ফিরে আসবে। মেসি যখনই সামনে এসেছেন, তিনি যেন আরও বড় হয়ে উঠেছেন।

ওয়ান-অন-ওয়ান পরিস্থিতিতে বারবার নিজেকে ছুড়ে দিয়েছেন। ফ্রি-কিক থেকে আসা নিখুঁত শটও তার হাত এড়িয়ে যেতে পারেনি। একসময় মনে হচ্ছিল, গোলপোস্টের সামনে একজন গোলরক্ষক নয়, যেন দাঁড়িয়ে আছে এক অদৃশ্য প্রাচীর। মেসি একটি গোল পেয়েছিলেন ঠিকই, কিন্তু সেই গোলের পর ভোজিনিয়া যেন অন্য এক মানুষ হয়ে ওঠেন।

একের পর এক সেভ। একের পর এক বিস্ময়। একের পর এক অসম্ভবকে সম্ভব করা।

যে মানুষটিকে ফুটবলবিশ্ব প্রায় অলৌকিক শক্তির অধিকারী মনে করে, সেই লিওনেল মেসিকেও তিনি বুঝিয়ে দিলেন, আজকের রাতে আপনাকেও থামানো সম্ভব।

এই আটটি সেভ শুধু গোল বাঁচায়নি,  বিশ্বকাপের একটি গল্পও বাঁচিয়ে রেখেছে। আর সেই গল্পের নাম, কেপ ভার্দে।

যখন মনে হচ্ছিল ম্যাচটি আর্জেন্টিনার

নিয়ন্ত্রণে চলে যাচ্ছে, তখনই আবার ফিরে এসেছে কেপ ভার্দে। তারা দুবার সমতায় ফিরেছে। প্রতিবারই যেন আরও বেশি বিশ্বাস নিয়ে। যেন তারা নিজেদেরই বলছিল, ভয় পেও না, সামনে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন নয়, আরেকটি ফুটবল দল দাঁড়িয়ে আছে। এমন সাহসই তো খেলাধুলার সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য।

১০৩ মিনিটে সিডনি কাবরালের গোলটি যেন পুরো ম্যাচের প্রতীক হয়ে উঠল। বাঁ দিক থেকে বল নিয়ে ভেতরে কেটে আসা, তারপর ডান পায়ের অনিন্দ্যসুন্দর বাঁকানো শটÑ বল গিয়ে জড়িয়ে গেল দূরের ওপরের কোণে। এমিলিয়ানো মার্তিনেজের মতো গোলরক্ষকও শুধু তাকিয়ে রইলেন।

গোলটি শুধু ব্যবধান কমায়নি। সেটি ছিল এক ছোট্ট দেশের আত্মবিশ্বাসের উচ্চারণ। সেটি ছিল পৃথিবীকে বলা, আমরাও পারি।

গোলের পর গ্যালারিতে ছুটে গিয়ে কাছের মানুষকে জড়িয়ে ধরা কাবরালের উদ্?যাপন যেন পুরো জাতির আনন্দের প্রতীক হয়ে উঠেছিল। সেই মুহূর্তে হয়তো কেপ ভার্দের প্রতিটি মানুষ বিশ্বাস করছিল, স্বপ্ন দেখা কোনো অপরাধ নয়।

ম্যাচ শেষে সংবাদ সম্মেলনে কেপ ভার্দের কোচ বুবিস্তার চোখেমুখে পরাজয়ের বিষাদ খুব একটা দেখা যায়নি। বরং ছিল এক ধরনের তৃপ্তি। তিনি জানতেন, তার দল হারেনি। তার দল সম্মান জিতেছে। তিনি বলেছেন, তার খেলোয়াড়েরা নিজেদের সর্বোচ্চটা দিয়েছে। সাহসের সঙ্গে খেলেছে। দুবার পিছিয়ে পড়েও ফিরে এসেছে। বিশ্বের সামনে নিজেদের পরিচয় তুলে ধরেছে।

বিশ্বকাপে এসে কেপ ভার্দে শুধু ফুটবল খেলেনি। তারা পৃথিবীকে নিজেদের সম্পর্কে নতুন করে জানতে বাধ্য করেছে। তারা দেখিয়েছে, ছোট দেশ মানেই ছোট স্বপ্ন নয়। ছোট জনসংখ্যা মানেই ছোট সাহস নয়। একসময় উরুগুয়ের কিংবদন্তি লেখক এদুয়ার্দো গালিয়ানো লিখেছিলেন, ‘যখন সুন্দর ফুটবল হয়, আমি সৃষ্টিকর্তাকে ধন্যবাদ জানাই। সে খেলা কোন দল খেলল, তা আমি ভাবি না।’ মায়ামির সেই রাত যেন গালিয়ানোর কথাকে নতুন করে সত্য প্রমাণ করেছে।

দিন শেষে জয় পেয়েছে আর্জেন্টিনা। মেসি আরেকটি রেকর্ড যোগ করেছেন তার অনন্ত ক্যারিয়ারে। বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা কোয়ার্টার ফাইনালে উঠেছে। কিন্তু এই ম্যাচ শেষ হওয়ার পর পৃথিবীর নানা প্রান্তে যে গল্পটি সবচেয়ে বেশি বলা হয়েছে, সেটি কোনো রেকর্ডের নয়। সেটি ছিল একটি ছোট্ট দেশের গল্প। একটি দেশের, যারা হারার আগেই হার মানতে শেখেনি। একটি দলের, যারা বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের সামনে মাথা নত করেনি। বিশ্বকাপ ইতিহাসে এই ম্যাচের পাশে হয়তো চিরকাল লেখা থাকবেÑ আর্জেন্টিনা ৩-২ কেপ ভার্দে।

কিন্তু যারা সেই ১২০ মিনিট দেখেছেন, তারা জানবেন, সেদিন জিতেছিল মেসির আর্জেন্টিনা, কিন্তু ইতিহাস তৈরি করেছে কেপ ভার্দে।

কারণ কিছু কিছু পরাজয় আছে, যেগুলো বিজয়ের চেয়েও অনেক বেশি দীপ্তিমান। আর কিছু কিছু দল আছে, যারা ট্রফি ছুঁতে পারে না, কিন্তু ফুটবলের আত্মাকে ছুঁয়ে যায়।

২০২৬ বিশ্বকাপে কেপ ভার্দে ঠিক সেই কাজটিই করেছে।

রূপালী বাংলাদেশ

Link copied!