× UCB Sticker Card
বুধবার, ০৮ জুলাই, ২০২৬

ফেসবুক


ইউটিউব


টিকটক

Rupali Bangladesh

ইনস্টাগ্রাম

Rupali Bangladesh

এক্স

Rupali Bangladesh


লিংকডইন

Rupali Bangladesh

পিন্টারেস্ট

Rupali Bangladesh

গুগল নিউজ

Rupali Bangladesh


হোয়াটস অ্যাপ

Rupali Bangladesh

টেলিগ্রাম

Rupali Bangladesh

মেসেঞ্জার গ্রুপ

Rupali Bangladesh


En Bn

স্বপ্না চক্রবর্তী

প্রকাশিত: জুলাই ৮, ২০২৬, ০৬:৩৬ এএম

এলএনজি সরবরাহ কমায় গ্যাস সংকটের শঙ্কা

স্বপ্না চক্রবর্তী

প্রকাশিত: জুলাই ৮, ২০২৬, ০৬:৩৬ এএম

এলএনজি সরবরাহ কমায়  গ্যাস সংকটের শঙ্কা

দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার কারণে মহেশখালীতে অবস্থিত ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল (এফএসআরইউ) থেকে নির্ধারিত এলএনজি কার্গোর ডেলিভারি কার্যক্রম শুরু করা সম্ভব হয়নি। এর ফলে টার্মিনাল থেকে রিগ্যাসিফায়েড এলএনজি (আরএলএনজি) সরবরাহ দৈনিক প্রায় ৩০০ মিলিয়ন ঘনফুট (এমএমসিএফডি) কমে গেছে। বর্তমানে সেখান থেকে এলএনজি সাপ্লাই হচ্ছে ৭৪০ মিলিয়ন ঘনফুট। গত সোমবার থেকে গতকাল মঙ্গলবার পর্যন্ত চারবার এলএনজি কার্গো ভেড়ানোর চেষ্টা করেও পারেনি। আজ বুধবার ভোরে আবার চেষ্টা করার কথা থাকলেও বৈরী আবহাওয়ার কারণে তা কতটুকু সম্ভব তা জানে না কেউ। এদিকে হরমুজ প্রণালি ইস্যুতে কাতার থেকেও এলএনজি সরবরাহ অর্ধেক কমে গেছে। ফলে গ্যাস খাতে আবারও ধাক্কা খেতে যাচ্ছে সরকার। গ্যাস সংকটে বাসা-বাড়িতে যেমন জ¦লছে না চুলা, তেমনি শিল্প-কারখানায় ব্যাহত হচ্ছে উৎপাদন। কমে গেছে বিদ্যুতের উৎপাদনও।

গতকাল মঙ্গলবার পেট্রোবাংলা এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার কারণে মহেশখালীস্থ ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে (এফএসআরইউ) নির্ধারিত এলএনজি কার্গোর ডেলিভারি কার্যক্রম শুরু সম্ভব না হওয়ায় এফএসআরইউ থেকে আরএলএনজি সরবরাহ প্রায় ৩০০ এমএমসিএফডি হ্রাস পেয়েছে। উদ্ভূত পরিস্থিতির উন্নতি না হওয়া পর্যন্ত সারা দেশে সব শ্রেণির গ্রাহক প্রান্তে গ্যাসের স্বল্পচাপ বিরাজ করবে। এমন পরিস্থিতিতে গ্রাহকদের সাময়িক অসুবিধার জন্য আন্তরিকভাবে দুঃখ প্রকাশ করা হয়।

এদিকে গত সোমবার আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে পেট্রোবাংলার ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান আব্দুল মান্নান রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, ইরানের ওপর মার্কিন ও ইসরায়েলি সামরিক অভিযানের কারণে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জ্বালানি পরিবহন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। এই উদ্ভূত ভূ-রাজনৈতিক সংকটের জের ধরে বাংলাদেশে চলতি ২০২৬ সালের জন্য নির্ধারিত তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) সরবরাহ অর্ধেক কমিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে কাতার এনার্জি। তবে এই ঘাটতি পূরণে বাংলাদেশ বসে নেই। দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে খোলা বাজার থেকে বেশি দামে গ্যাস কেনা এবং অন্যান্য সরবরাহকারী দেশের সঙ্গে সরকার-টু-সরকার (জিটুজি) চুক্তিসহ বিকল্প উৎসগুলো অনুসন্ধান করা হচ্ছে। তিনি বলেন, দেশের জন্য যে অপশনটি সবচেয়ে অনুকূল বাণিজ্যিক শর্ত দেবে, সেটিই বেছে নেওয়া হবে। কাতার এনার্জি অবশ্য আশ্বস্ত করেছে যে সরবরাহ কমালেও তারা যথাসম্ভব জ্বালানি সরবরাহ সচল রাখার চেষ্টা করবে। প্রসংগত, গত বছর বাংলাদেশের আমদানীকৃত প্রায় ৭০ লাখ টন এলএনজির মধ্যে ৪১.৫ লাখ টনই এসেছে কাতার থেকে, যা দেশটিকে বাংলাদেশের শীর্ষ জ্বালানি সরবরাহকারীতে পরিণত করেছে। কাতার এনার্জির সঙ্গে পেট্রোবাংলার দুটি দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি রয়েছে, যার একটির আওতায় বার্ষিক ২৫ লাখ টন এবং অন্যটির আওতায় ১৮ লাখ টন এলএনজি পাওয়ার কথা।

বিশ্বের মোট এলএনজি সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়। যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে অত্যন্ত সীমিতসংখ্যক খালি এলএনজি ট্যাংকার এই প্রণালিতে প্রবেশ ও বের হতে পেরেছে। কাতার থেকে কিছু কার্গো এই প্রণালি পার হতে পারলেও তার কোনোটিই বাংলাদেশে পৌঁছায়নি। যার ফলে, অভ্যন্তরীণ গ্যাসের চাহিদা মেটাতে গত মার্চ মাস থেকে বাংলাদেশ স্পট মার্কেট থেকে রেকর্ড ৩৫টি কার্গো এলএনজি আমদানি করতে বাধ্য হয়েছে।

কাতার এনার্জির এই সাময়িক সরবরাহ হ্রাসের সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন ও শিল্প খাতে জ্বালানি ব্যবস্থাপনায় নতুন সংকট তৈরি হতে যাচ্ছে উল্লেখ করে জ¦ালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক শামসুল আলম রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, আমরা বারবার বলে আসছি আমদানিনির্ভরতা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। নিজেদের কূপগুলো খনন করে যদি গ্যাস পাওয়া যেত, তাহলে এমন সংকটে গ্রাহকদের দুর্ভোগ পোহাতে হতো না। কিন্তু সব সরকারই নিজেদের সক্ষমতা বাড়ানোর চেতে আমদানিতেই বেশি জোর দিচ্ছে। ফলে উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হচ্ছে। সম্প্রতি যেমন ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধের সময় খেসারত দিতে হয়েছে। এখন বৈরী আবহাওয়ার কারণে খেসারত দিতে হবে।

এদিকে গ্যাসের এই সংকটে ব্যাহত হচ্ছে শিল্প উৎপাদন। মূলত মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের সময় থেকেই চলছিল এ সংকট। এ রকম চলতে থাকলে ক্রেতারা ক্রয়াদেশ বাতিল করে চলে যাবেন উল্লেখ করে বিজিএমইএ-এর পরিচালক ফয়সাল সামাদ রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, আমদানি করা জ্বালানির ওপর বিশেষ করে এলএনজি ও অপরিশোধিত তেলের ওপর বাংলাদেশের উচ্চ নির্ভরতা বৈশ্বিক বাজারের অস্থিরতার প্রতি অর্থনীতিকে অত্যন্ত সংবেদনশীল করে তুলেছে। মধ্যপ্রাচ্য থেকে জীবাশ্ম জ্বালানি আমদানির ওপর নির্ভরতার কারণে আমাদের পোশাক খাতকে দুই দিন পর পর ঝুঁকির মধ্যে পড়তে হচ্ছে। জ্বালানির দাম বাড়লে পরিবহন ও উৎপাদন ব্যয় বাড়ে, যার প্রভাব প্রত্যক্ষভাবে পোশাক খাতে পড়ে।

তীব্র গ্যাস সংকটের কারণে রাজধানীর অধিকাংশ এলাকার বাসা-বাড়িতে জ্বলছে না চুলা। প্রতিদিনই তিতাসের অভিযোগ কেন্দ্রে আসছে হাজার হাজার অভিযোগ। গ্যাস সংকটে সবচেয়ে বেশি ভুগছেন রাজধানীর মোহাম্মদপুর, মিরপুর, বাসাবো, বনশ্রী, মুগদা, মগবাজার এবং পুরান ঢাকার বাসিন্দারা। এমনকি সংকট রয়েছে অভিজাত এলাকাখ্যাত ধানম-ি, গুলশানেও। গতকাল মঙ্গলবার বৈরী আবহাওয়ায় পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়ে পড়ে জানিয়ে  রাজধানীর মোহাম্মদপুরের বাসিন্দা সুরমা আক্তার বলেন, চুলায় আগুন নাই, তাই আজ রাইস কুকারে কোনোমতে চারটা ডাল-ভাত একসঙ্গে সিদ্ধ করে পুরো পরিবার মিলে খেয়েছি। টানা ৫ দিন ধরে এ অবস্থা। কবে এর থেকে মুক্তি পাব জানি না।

দিনে মাত্র ৪ ঘণ্টা চুলায় গ্যাসের চাপ থাকছে বলে অভিযোগ করেন বনশ্রী এলাকার ব্যাংককর্মী ঊর্মি আচার্য। তিনি বলেন, বাসায় ছোট ছোট দুটি বাচ্চা রয়েছে। চুলায় গ্যাসের চাপ এত কম যে তাদের খাবার পর্যন্ত বানাতে পারছি না। বড়রা না হয় বাইরের খাবার খেয়ে দিন পার করতে পারব। বাচ্চাদের কী খাওয়াব?

এ সংকট এক দিনে তৈরি হয়নি উল্লেখ করে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মানীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, বৈশ্বিক অস্থিরতার মধ্যে অপরিশোধিত তেলের দাম ইতিমধ্যে প্রতি ব্যারেল ১০০ ডলার ছাড়িয়েছে। তবে দেশের জ্বালানি তেলের দাম নিয়ন্ত্রণে সরকারের হাতে কিছু নীতিগত সুযোগ রয়েছে। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের মুনাফার বাইরে দেশে জ্বালানির ওপর প্রায় ২০ থেকে ২৫ শতাংশ পর্যন্ত বিভিন্ন ধরনের কর আরোপ করা হয়। প্রয়োজন হলে এসব কর কমিয়ে জ্বালানির দাম নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেন, বিদায়ি অন্তর্বর্তী সরকারের সময় জ্বালানি আমদানির ওপর থাকা ২ শতাংশ অগ্রিম আয়কর প্রত্যাহার করা হয়েছে, যা মূল্য নিয়ন্ত্রণে সহায়ক হয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সমন্বয় করে জ্বালানি তেলের দাম নির্ধারণের কথা থাকলেও স্থানীয় বাজারে তুলনামূলক দাম বেশি ছিল। এর ফলে গত কয়েক বছর বিপিসি উল্লেখযোগ্য মুনাফা করেছে। তাই সংকটকালে বিশ্ববাজারে তেলের দাম বাড়লেও আগের লাভের সঙ্গে সমন্বয় করার সুযোগ রয়েছে। যার সুবিধা নিতে পারে শিল্প-কারখানাগুলো। বর্তমানে দেশে ডিজেল, অকটেনসহ অন্যান্য জ্বালানির কয়েক সপ্তাহের মজুত রয়েছে বলে জানান মোস্তাফিজুর রহমান। তবে বাংলাদেশের বড় সমস্যা হলোÑ জ্বালানি তেলের কোনো স্থায়ী কৌশলগত মজুত নেই, যা অনেক দেশে রয়েছে।

এই পরিস্থিতি থেকে শিক্ষা নিয়ে বিদেশনির্ভর জ¦ালানি খাত থেকে বেরিয়ে দেশীয় উৎস থেকে অনুসন্ধান কার্যক্রম বাড়ানোর তাগিদ দিয়েছেন জ¦ালানি বিশেষজ্ঞরা। বাংলাদেশ কনজ্যুমার অ্যাসোসিয়েশনের (ক্যাব) জ¦ালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক শামসুল আলম রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, দেশীয় কূপগুলো খননে সরকার যে ১৮০ দিনের বিশেষ পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে, তা আরও জোরালো করতে হবে। তাহলে ভবিষ্যতে এ ধরনের সংকট আর আমাদের মোকাবিলা করতে হবে না। নইলে সরকারকে সামনে আরও বড় ধরনের ধাক্কা খেতে হবে।

রূপালী বাংলাদেশ

Link copied!