ক্যাসিনো-বিরোধী অভিযানের সময় আলোচনায় আসা আওয়ামী লীগ নেতা (পরে বহিষ্কৃত) এনামুল হক এনু ও তার ভাই রুপন ভূঁইয়াকে মানিলন্ডারিং মামলায় ১০ বছর করে কারাদ- দিয়েছেন আদালত। অবৈধভাবে অর্জিত অর্থ গোপন ও পাচারের অভিযোগে করা মামলায় গতকাল বুধবার ঢাকার বিশেষ জজ আদালত-৬-এর বিচারক নূরে আলম ভূঞা এ রায় ঘোষণা করেন। রায়ে দুই আসামিকে ৬৪ কোটি ৬২ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে। জরিমানার অর্থ অনাদায়ে আরও ছয় মাস কারাভোগ করতে হবে তাদের।
সংশ্লিষ্ট আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) মো. সেলিম খান রায়ের বিষয়ে জানান, রায় ঘোষণার আগে এনু ও রুপনকে কারাগার থেকে আদালতে হাজির করা হয়। রায় শেষে সাজা পরোয়ানা দিয়ে তাদের কারাগারে পাঠানো হয়। একই মামলায় অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় অন্য আট আসামিকে বেকসুর খালাস দেওয়া হয়েছে। খালাস পাওয়া আসামিরা হলেনÑ সাইফুল ইসলাম, তুহিন মুন্সী, নবীর হোসেন শিকদার, জয়গোপাল সরকার, পাভেল রহমান, শহিদুল হক ভূঁইয়া, রশিদুল হক ভূঁইয়া ও মেরাজুল হক ভূঁইয়া শিপলু।
মামলার নথি অনুযায়ী, অবৈধ উপায়ে অর্জিত প্রায় ২৬ কোটি ৫৫ লাখ টাকা গোপনে সংরক্ষণ এবং উৎস গোপনের অভিযোগে ২০২০ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর ওয়ারী থানায় মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইনে মামলা করা হয়। মামলাটির বাদী ছিলেন র্যাব-৩-এর নায়েব সুবেদার রমজান আলী। তদন্ত শেষে ২০২১ সালের ৮ আগস্ট মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এনামুল হক এনু, রুপন ভূঁইয়াসহ মোট ১০ জনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন। পরে ২০২২ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর আদালত তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দেন। বিচার চলাকালে ১৩ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণ করা হয়। এর আগে একই আদালতে অর্থ পাচার প্রতিরোধ আইনের আরেক মামলায় ২০২৫ সালের ৩০ জানুয়ারি এনামুল হক এনু ও রুপন ভূঁইয়াকে সাত বছর করে কারাদ- দেওয়া হয়েছিল। সেই মামলায় তাদের ৩৪ লাখ ২৬ হাজার ৬০০ টাকা জরিমানাও করা হয়।
সূত্র জানিয়েছে, ঢাকা ওয়ান্ডারার্স ক্লাবের শেয়ারহোল্ডার এনু গেন্ডারিয়া থানা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি ছিলেন। তার ভাই রুপন ছিলেন থানা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক। দুই ভাইয়ের বিরুদ্ধে ওয়ান্ডরার্স ক্লাবে অবৈধভাবে ক্যাসিনো পরিচালনার মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ টাকা আদায় করে সম্পদের পাহাড় গড়ার অভিযোগ ছিল। এ ছাড়া পুরান ঢাকায় দলীয় ক্ষমতা ব্যবহার করে চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসী কর্মকা-েরও অভিযোগ ছিল। তখন ক্যাসিনো নিয়ন্ত্রণকারী হিসেবে এনু ও রুপনের নাম আসে। ২০১৯ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর এনু, রুপন, তাদের এক কর্মচারী এবং তাদের এক বন্ধুর বাসায় অভিযান চালায় র্যাব। সেই অভিযানে ওয়ারীর লালমোহন সাহা স্ট্রিটে এনু ও রুপনদের বাড়ি ‘মমতাজ ভিলা’য় লোহার সিন্দুক থেকে ২৬ কোটি ৫৫ লাখ ৬০০ টাকা; ৫ কোটি ১৫ লাখ টাকার এফডিআর; প্রায় এক কেজি ওজনের স্বর্ণালংকার; বিপুল পরিমাণ বিদেশি মুদ্রা এবং ছয়টি আগ্নেয়াস্ত্র জব্দ করা হয়।
র্যাবের পক্ষ থেকে সে সময় বলা হয়, ওয়ান্ডারার্স ক্লাবে জুয়ার আসর চালানোর টাকা নিয়মিত যেত এনু-রুপনের বাড়িতে। তারই একটি অংশ সেখানে সিন্দুকের ভেতরে পাওয়া গেছে। র্যাবের অভিযানের মধ্যে এনু ও রুপনের নাগাল পাওয়া না গেলেও ২০২০ সালের ১৩ জানুয়ারি কেরানীগঞ্জ থেকে তাদের গ্রেপ্তার করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। তখন থেকেই তারা কারাগারে আছেন। তাদের বাড়ি থেকে টাকা উদ্ধারের ঘটনায় র্যাব-৩-এর নায়েব সুবেদার রমজান আলী ওয়ারী থানায় এ মামলা দায়ের করেছিলেন। তদন্ত শেষে ২০২১ সালের ৮ অগাস্ট এনু, রুপন এবং তাদের আট সহযোগীকে আসামি করে অভিযোগপত্র জমা দেন সিআইডির ফাইন্যান্সসিয়াল ক্রাইম ইউনিটের ইন্সপেক্টর মেহেদী মাকসুদ। ২০২২ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দেন আদালত। মামলার বিচার চলাকালে ১৬ জন সাক্ষীর মধ্যে ১৩ জনের সাক্ষ্য শোনেন বিচারক। আসামিদের আত্মপক্ষ শুনানি, যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষে বুধবার দুই আসামির সাজার রায় এলো।
র্যাবের অভিযানের দিন এনুর কর্মচারী আবুল কালাম আজাদের বাড়ি থেকে উদ্ধার করা হয়েছিল ২ কোটি টাকা। ওই ঘটনায় ওয়ারী থানায় র্যাবের করা মামলায় ২০২২ সালের ২৫ এপ্রিল এনু-রুপনসহ ১১ জনকে সাত বছর করে কারাদ- দেন আদালত। এছাড়া বংশাল থানায় মানিলন্ডানিং প্রতিরোধ আইনের মামলায় ২০২৩ সালের ২৮ নভেম্বর এনু ও রুপনকে সাত বছর করে কারাদ- দেওয়া হয়। আর সূত্রাপুর থানার মানিলন্ডানিং প্রতিরোধ আইনের আরেক মামলায় ২০২৫ সালের ৩০ জানুয়ারি তাদের সাত বছর করে কারাদ- দেন ঢাকার ষষ্ঠ বিশেষ জজ আদালত। এবার তাদের বিরুদ্ধে চতুর্থ মামলার রায় এলো।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন