× UCB Sticker Card
বৃহস্পতিবার, ০৯ জুলাই, ২০২৬

ফেসবুক


ইউটিউব


টিকটক

Rupali Bangladesh

ইনস্টাগ্রাম

Rupali Bangladesh

এক্স

Rupali Bangladesh


লিংকডইন

Rupali Bangladesh

পিন্টারেস্ট

Rupali Bangladesh

গুগল নিউজ

Rupali Bangladesh


হোয়াটস অ্যাপ

Rupali Bangladesh

টেলিগ্রাম

Rupali Bangladesh

মেসেঞ্জার গ্রুপ

Rupali Bangladesh


En Bn

ইকবাল হাসান ফরিদ

প্রকাশিত: জুলাই ৯, ২০২৬, ০৬:২৬ এএম

ঢাকার সড়কে ই-বাস বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন

ইকবাল হাসান ফরিদ

প্রকাশিত: জুলাই ৯, ২০২৬, ০৬:২৬ এএম

ঢাকার সড়কে ই-বাস  বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন

বৃষ্টিতে সড়কে ঢেউ খেলছে পানি। তার মধ্যেই রিকশা, ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা আর মানুষের ভিড়ে থেমে আছে একটি বাস। চালকের আসনে বসা মধ্যবয়সি মানুষটি অসহায় চোখে তাকিয়ে আছেন সামনে। পানির নিচে কোথায় গর্ত, কোথায় খোলা ম্যানহোল, তার কোনো হদিস নেই। বর্ষা এলেই রাজধানীর চেনা চিত্র এটি। অথচ এই জলাবদ্ধ, ভাঙাচোরা নগরীতেই এবার নামছে ৪০০টি পরিবেশবান্ধব বৈদ্যুতিক বাস (ই-বাস)।

সরকার বলছে, এটি দেশের গণপরিবহন ব্যবস্থার ইতিহাসে সবচেয়ে বড় আধুনিকায়নের উদ্যোগ। তবে প্রশ্নও কম নয়। যে শহরে সামান্য বৃষ্টিতেই সড়ক ডুবে যায়, যেখানে জলাবদ্ধ রাস্তায় বিদ্যুৎস্পর্শে প্রাণহানির ঘটনা ঘটে। সেখানে হাই-ভোল্টেজ ব্যাটারিচালিত বাস পরিচালনা কতটা নিরাপদ ও বাস্তবসম্মত?

জানা গেছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেটে ৪০০টি ইলেকট্রিক বাস যুক্ত করার ঘোষণা দেওয়া হয়। বিশ্বব্যাংক-সমর্থিত ‘বাংলাদেশ ক্লিন এয়ার প্রজেক্ট ফেজ-১’-এর আওতায় প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষ (ডিটিসিএ)। মোট ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় আড়াই হাজার কোটি টাকা। ২০৩০ সালের মধ্যে পর্যায়ক্রমে বাসগুলো নামানো হবে। প্রথম ধাপে ১৫০টি, পরে আরও ২৫০টি বাস চলবে রাজধানীর বিভিন্ন রুটে। ঢাকা এবং নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন রুটে চলবে এই ইলেকট্র্রিক বাস। বাসগুলো আমদানির জন্য চীনের সঙ্গে একটি সমঝোতা স্মারক সই হয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শুধু নতুন প্রযুক্তির বাস নয়, এই প্রকল্পের সঙ্গে জড়িয়ে আছে ঢাকার দীর্ঘদিনের পরিবহন সংকটের সমাধানের প্রতিশ্রুতিও। বিশৃঙ্খল সড়ক ব্যবস্থা, মালিক সমিতির প্রভাব, ভাড়া নৈরাজ্য, বেপরোয়া যাত্রী তোলার প্রতিযোগিতা এবং দুর্বল অবকাঠামো বদলে একটি শৃঙ্খলাবদ্ধ গণপরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তোলাই সরকারের লক্ষ্য।

জানা গেছে, এই প্রকল্পের মাধ্যমে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন আসছে পরিচালনা ব্যবস্থায়। বাসগুলো চলবে ‘বাস ফ্র্যাঞ্চাইজি’ ও ‘গ্রস কস্ট কন্ট্রাক্ট’ পদ্ধতিতে। অর্থাৎ যাত্রীসংখ্যার ঝুঁকি নেবে না অপারেটররা। সরকার প্রতি কিলোমিটারে নির্ধারিত অর্থ দেবে। ভাড়া নির্ধারণ ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনার দায়িত্বও থাকবে সরকারের হাতে। বাসের মালিকানা ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব থাকবে রাষ্ট্রায়ত্ত সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান ‘অ্যাসেটকো’র ওপর। তাদের কাজ হবে বাস কেনা, ব্যাটারি পরিবর্তন, ওয়ারেন্টি ও সম্পদ ব্যবস্থাপনা।

ডিটিসিএর এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, প্রকল্পের প্রতি সমর্থন আদায়ে বেসরকারি বাস মালিক ও পরিবহন সমিতির সঙ্গে একাধিক দফা আলোচনা হয়েছে। রাষ্ট্রায়ত্ত অপারেটরদের সম্মতি নিয়েই প্রস্তাবটি তৈরি হয়েছে বলে তিনি জানান। আর বেসরকারি অপারেটররাও নিয়ন্ত্রণ ও পুরোনো বাস প্রতিস্থাপনের পক্ষে মত দিয়েছেন বলে দাবি করেছেন তিনি। তবে ঢাকার পরিবহন খাতে সংস্কারের ইতিহাস মোটেও আশাব্যঞ্জক নয়। নগরবাসীর দীর্ঘদিনের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে বাস রুট র‌্যাশনালাইজেশন ও ভাড়া নৈরাজ্য রোধে চালু হয়েছিল ঢাকা নগর পরিবহন। কিন্তু বছরের পর বছর পেরিয়ে গেলেও পুরো রাজধানীকে এই ব্যবস্থার আওতায় আনা যায়নি। সীমিতসংখ্যক রুটে সীমিত বাস দিয়েই চলছে কার্যক্রম। আর নতুন রুট চালুর গতি রীতিমতো ধীর। এই ধীরগতির পেছনে দায়ী করা হয় বাস মালিক সমিতি ও রুটভিত্তিক নিয়ন্ত্রণে অভ্যস্ত প্রভাবশালী চক্রকে। যারা নতুন কোম্পানিভিত্তিক পরিচালনা কাঠামোয় নিজেদের প্রভাব হারানোর শঙ্কায় থাকে।

অন্যদিকে বিশ্লেষকরা বলছেন, ঢাকা নগর পরিবহন কিংবা গাজীপুর-ঢাকা বিআরটি প্রকল্পের অভিজ্ঞতাও খুব সুখকর নয়। রুট র‌্যাশনালাইজেশন নানা স্বার্থগোষ্ঠীর চাপে সীমিত পর্যায়েই আটকে গেছে। অন্যদিকে বিআরটি প্রকল্পে বাসের ধরন বারবার বদল, নকশা পরিবর্তন ও প্রশাসনিক জটিলতায় ব্যয় বেড়েছে কয়েক গুণ। শেষ পর্যন্ত নির্ধারিত বিশেষায়িত বাস ছাড়াই বিআরটিসির বাস দিয়ে সীমিত আকারে সেবা চালু করতে হয়েছে।

বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, নতুন ই-বাস প্রকল্পেও একই ধরনের রাজনৈতিক ও ব্যাবসায়িক চাপ বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে। তাদের মতে, ইলেকট্রিক বাসের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ প্রযুক্তি নয়, ঢাকার সড়ক। অপরিকল্পিত নগরায়ণে রাজধানীর প্রাকৃতিক খাল ও জলাধারের বড় অংশ হারিয়ে গেছে। ফলে সামান্য ভারি বৃষ্টিতেই কল্যাণপুর, মিরপুর, মোহাম্মদপুর, রামপুরা, বাড্ডা, উত্তরা, বিমানবন্দর সড়ক, যাত্রাবাড়ীসহ বিস্তীর্ণ এলাকায় জলাবদ্ধতা তৈরি হয়। ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে মিরপুরে জলাবদ্ধ রাস্তায় বিদ্যুৎস্পর্শে একই পরিবারের চারজনসহ পাঁচজনের মৃত্যু এখনো নগরবাসীর স্মৃতিতে তাজা।

এই বাস্তবতায় হাই-ভোল্টেজ ব্যাটারিচালিত বাস পরিচালনার ঝুঁকি নিয়ে এখনো কোনো পূর্ণাঙ্গ কারিগরি মূল্যায়ন প্রকাশ করা হয়নি। যদিও ই-বাসের ব্যাটারি পানিরোধী নকশায় তৈরি। তবু হাঁটুসমান পানি, খোলা ম্যানহোল ও ছেঁড়া বৈদ্যুতিক তারে ভরা ঢাকার সড়কে আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা মান কতটা কার্যকর থাকবে, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জলাবদ্ধতাপ্রবণ এলাকা এড়িয়ে রুট নির্ধারণ, উঁচু স্থানে চার্জিং স্টেশন নির্মাণ এবং বর্ষা মৌসুমের জন্য বিশেষ নিরাপত্তা প্রটোকল না থাকলে ঝুঁকি থেকেই যাবে।

অন্যদিকে ই-বাসের আরেক চ্যালেঞ্জ চার্জিং অবকাঠামো। প্রশ্ন উঠছে, ৪০০টি বাস চার্জ হবে কোথায়? এর আগে বিআরটিসির ইলেকট্রিক ডাবল-ডেকার বাস প্রকল্প চার্জিং স্টেশন, দক্ষ চালক ও কারিগরি জনবলের অভাবে এগোতে পারেনি। নতুন প্রকল্পেও কোথায় ডিপো হবে, কীভাবে চার্জিং নেটওয়ার্ক গড়ে উঠবে, বিদ্যুৎ সরবরাহ কতটা নিরবচ্ছিন্ন থাকবে কিংবা জলাবদ্ধতা থেকে এসব অবকাঠামো কীভাবে সুরক্ষিত রাখা হবে, সে বিষয়ে এখনো বিস্তারিত রোডম্যাপ প্রকাশ হয়নি।

বুয়েটের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ও পরিবহন বিশেষজ্ঞ মো. হাদিউজ্জামান বলেন, ‘বাংলাদেশের পরিবহন খাত দীর্ঘদিন ধরেই রাজনৈতিকভাবে স্পর্শকাতর ও বিশৃঙ্খল। শুধু ভাড়া বা ক্ষতিপূরণের কাঠামো পরিবর্তন করলেই সমস্যার সমাধান হবে না।’

তিনি আরও বলেন, ‘ইলেকট্রিক বাস শুধু কিনলেই হবে না। পর্যাপ্ত চার্জিং স্টেশন, দক্ষ জনবল ও বিশেষায়িত ওয়ার্কশপ তৈরি না হলে হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগও ব্যর্থ হতে পারে’।

সূত্রমতে, আরেকটি বড় উদ্বেগ রাজধানীর অনিয়ন্ত্রিত সড়কব্যবস্থা। লাইসেন্সবিহীন ব্যাটারিচালিত রিকশা, অবৈধ পার্কিং, ফুটপাত দখল এবং নির্দিষ্ট বাস-বে না থাকায় দ্রুতগতির ই-বাস পরিচালনা কঠিন হয়ে উঠতে পারে। বিশ্লেষকদের মতে, ৪০০টি ইলেকট্রিক বাস ঢাকার বায়ুদূষণ কমাতে নিঃসন্দেহে একটি যুগান্তকারী উদ্যোগ। কিন্তু শুধু নতুন বাস নামালেই রাজধানীর গণপরিবহন বদলে যাবে না। পরিবহন সিন্ডিকেটের প্রভাব, দুর্বল ড্রেনেজ, বিদ্যুৎ অবকাঠামোর সীমাবদ্ধতা, রক্ষণাবেক্ষণের ঘাটতি এবং প্রশাসনিক দুর্বলতা দূর করতে না পারলে এই প্রকল্পও অতীতের অনেক উচ্চাভিলাষী উদ্যোগের মতোই প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হতে পারে। 

যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. শামসুল হক বলেন, ‘বিশ্বের আধুনিক শহরগুলো বাসকে অগ্রাধিকার দেয়। কিন্তু ঢাকার রাস্তা ব্যক্তিগত গাড়ি ও রিকশায় দখল হয়ে আছে। ইলেকট্রিক বাস নামানোর আগে বাসের জন্য আলাদা লেন নিশ্চিত করতে হবে’।

এসব বিষয়ে ডিটিসিএর ট্রান্সপোর্ট ইঞ্জিনিয়ার কেএম তৌফিকুল হাসান রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, ‘প্রজেক্টটি পাস হওয়ার প্রক্রিয়ায় রয়েছে। প্রজেক্ট পাস হলে পূর্বাচলে ডিপো স্থাপন করা হবে। ওই ডিপোতে ৪৮৮টি বাস রাখা যাবে। সেখানে বাসগুলো চার্জিংয়ের ব্যবস্থা থাকবে। প্রাথমিকভাবে ৫টি রুটে চলবে ইলেকট্রিক বাস। এসব রুটে ১০টি চার্জিং স্টেশন থাকবে। প্রজেক্ট পাস হওয়ার পর আগে ডিপো এবং চার্জিং স্টেশনের কাজ হবে। তারপর বাস আনা হবে। তিনি জানান, যেসব রুটে ইলেকট্রিক বাস চলবে, সেই রুটে অন্য কোনো বাস রিকশা চলবে না।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ঢাকার রাস্তার জলাবদ্ধতার পরিস্থিতি বিবেচনায় রেখে বাসগুলোতে ব্যাটারি ইনস্টলিংয়ের ব্যবস্থা করা হবে। সেই ক্ষেত্রে ব্যাটারিবক্স ওয়াটারপ্রুফ রাখা হতে পারে অথবা বাসের ওপরের কোনো স্থানে ব্যাটারি স্থাপন করা হতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, কাগজে-কলমে মডেলটি যতই আকর্ষণীয় হোক, বাস্তবায়নের পথ মোটেও সহজ নয়।

এ ব্যাপারে ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষের ট্রাফিক এনফোর্সমেন্ট সমন্বয় অফিসার অ্যাডিশনাল ডিআইজি মো. সেলিম খান রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, ‘জলাবদ্ধতা ইলেকট্রিক বাসের জন্য নিশ্চয়ই ঝুঁকি। তবে যেসব সড়কে জলাবদ্ধতা হয় না, প্রথমত সেসব সড়কে ই-বাস পরিচালনা করা হবে। পাশাপাশি অন্যান্য সড়কে জলাবদ্ধতা নিরসনের প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘সড়কে শৃঙ্খলা ফেরানোর লক্ষ্যেই মূলত ইলেকট্রিক বাস নামানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এই প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে সড়কে শৃঙ্খলা ফেরার পাশাপাশি স্বস্তি ফিরবে নগরবাসীর’।

রূপালী বাংলাদেশ

Link copied!