ফুটবল বিশে^ এমন কিছু ম্যাচ থাকে, যেখানে শুধু দুটি দলই মুখোমুখি হয় না; মুখোমুখি হয় দুটি দর্শন, দুটি সংস্কৃতি এবং দুটি ভিন্ন যাত্রাপথ। ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালের প্রথম ম্যাচে ফ্রান্স ও মরক্কোর লড়াই তেমনই একটি খেলা। একদিকে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়ার অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ ফ্রান্স, অন্যদিকে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম অনুপ্রেরণার নাম হয়ে উঠেছে মরক্কো। চার বছর আগে কাতার বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে এই দুই দলের দেখা হয়েছিল। সেদিন ২-০ ব্যবধানে জয় পেয়েছিল ফ্রান্স, কিন্তু মরক্কো হারলেও বিশ্বজুড়ে কোটি মানুষের হৃদয় জয় করেছিল। এবার সেই স্মৃতি নিয়েই আবার মুখোমুখি হচ্ছে দুই দল। এবার দেখার পালা, মরক্কো কি প্রতিশোধ নিতে পারবে, নাকি ফ্রান্সের জয়ের পুনরাবৃত্তি ঘটবে।
দুই দলের পথচলা : চলতি বিশ্বকাপেও ফ্রান্স নিজেদের অন্যতম ফেভারিট হিসেবে প্রমাণ করেছে। গ্রুপ পর্বে ধারাবাহিক ভালো পারফরম্যান্সের পর নকআউট পর্বে সুইডেনকে ৩-০ গোলে হারিয়ে আত্মবিশ্বাসী তারা। এরপর রাউন্ড অব ১৬-তে শক্ত প্রতিরোধ গড়া প্যারাগুয়েকে ১-০ গোলে হারিয়ে শেষ আটে জায়গা নিশ্চিত করে দিদিয়ের দেশমের দল। ফ্রান্সের শক্তি শুধু তারকাখচিত আক্রমণে নয়, বরং রক্ষণ ও মাঝমাঠেও তাদের ভারসাম্য চোখে পড়ার মতো।
অন্যদিকে মরক্কোর যাত্রা আরও নাটকীয়। রাউন্ড অব ৩২-এ শক্তিশালী নেদারল্যান্ডসকে টাইব্রেকারে হারিয়ে তারা আবারও চমক দেখায়। এরপর রাউন্ড অব ১৬-তে কানাডাকে ৩-০ গোলে উড়িয়ে দিয়ে তারা প্রমাণ করে, ২০২২ সালের সাফল্য কোনো দুর্ঘটনা ছিল না। এই দলটি এখন বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম পরিণত ও আত্মবিশ্বাসী একটি দল।
হেড-টু-হেডে এগিয়ে কারা : পরিসংখ্যান বলছে, আন্তর্জাতিক ফুটবলে এখন পর্যন্ত ফ্রান্স ও মরক্কো ছয়বার মুখোমুখি হয়েছে। এর মধ্যে চারটি ম্যাচ জিতেছে ফ্রান্স এবং দুটি ম্যাচ ড্র হয়েছে। মরক্কো এখনো ফ্রান্সের বিপক্ষে জয়ের দেখা পায়নি।
তবে বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে অতীতের পরিসংখ্যান সবসময় ভবিষ্যতের ফল নির্ধারণ করে না। মরক্কো ইতোমধ্যেই স্পেন, পর্তুগাল, বেলজিয়াম ও নেদারল্যান্ডসের মতো ইউরোপীয় শক্তিকে বড় টুর্নামেন্টে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে নিজেদের সামর্থ্যরে প্রমাণ দিয়েছে।
তারকাদের দ্বৈরথ : এই ম্যাচের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ নিঃসন্দেহে কিলিয়ান এমবাপ্পে। বিশ্বের অন্যতম সেরা এই ফরোয়ার্ডের গতি, ড্রিবলিং ও গোল করার দক্ষতা যেকোনো ম্যাচের ভাগ্য বদলে দিতে পারে। তাকে থামানোর দায়িত্ব থাকবে মরক্কোর অধিনায়ক আশরাফ হাকিমির ওপর। ক্লাব ফুটবলে দীর্ঘদিন একসঙ্গে খেলা এই দুই বন্ধুর লড়াই হতে পারে ম্যাচের সবচেয়ে আকর্ষণীয় অধ্যায়।
ফ্রান্সের হয়ে উসমান দেম্বেলে, মাইকেল অলিজে ও ব্র্যাডলি বারকোলাও আক্রমণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবেন। অন্যদিকে মরক্কোর হয়ে ব্রাহিম দিয়াজের সৃজনশীলতা, আজ্জেদিন উনাহির মাঝমাঠ নিয়ন্ত্রণ এবং গোলরক্ষক ইয়াসিন বুনুর অভিজ্ঞতা দলের বড় শক্তি।
কৌশলের লড়াই : ফ্রান্স সাধারণত বল দখলে রেখে আক্রমণ গড়তে পছন্দ করে। দুই উইং ব্যবহার করে দ্রুত আক্রমণ তৈরি করা এবং এমবাপ্পের গতিকে কাজে লাগানো তাদের প্রধান কৌশল। পাশাপাশি মাঝমাঠে রাবিও ও মানু প্রতিপক্ষের আক্রমণ ভেঙে দ্রুত বল সামনে তুলতে পারদর্শী।
অন্যদিকে মরক্কো রক্ষণকে সুসংগঠিত রেখে সুযোগ পেলেই দ্রুত পাল্টা আক্রমণে ওঠে। হাকিমির ওভারল্যাপ, ব্রাহিম দিয়াজের সৃজনশীল পাস এবং রাহিমির ফিনিশিং তাদের আক্রমণের প্রধান অস্ত্র। প্রয়োজন হলে দীর্ঘ সময় রক্ষণ সামলে প্রতিপক্ষের ভুলের অপেক্ষা করতেও দ্বিধা করে না মরক্কো।
মানসিক লড়াইও কম গুরুত্বপূর্ণ নয় : ২০২২ সালের সেমিফাইনালের স্মৃতি মরক্কোর খেলোয়াড়দের মনে এখনো রয়েছে। তাই এই ম্যাচ তাদের জন্য প্রতিশোধের সুযোগও বটে। অন্যদিকে ফ্রান্স জানে, মরক্কোকে হালকাভাবে নেওয়ার সুযোগ নেই। বড় ম্যাচে মানসিক দৃঢ়তা, অভিজ্ঞতা এবং চাপ সামলানোর ক্ষমতা ফল নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখতে পারে।
সেমিফাইনালের টিকিট কার : ফ্রান্সের অভিজ্ঞতা, তারকাবহুল স্কোয়াড এবং বড় ম্যাচ জেতার অভ্যাস তাদের এগিয়ে রাখে। তবে মরক্কোর শৃঙ্খলাবদ্ধ ফুটবল, আত্মবিশ্বাস এবং দলগত সমন্বয় তাদের সমান ভয়ংকর প্রতিপক্ষ বানিয়েছে। বিশ্বকাপের ইতিহাস বারবার দেখিয়েছে, নকআউট পর্বে ছোট-বড় বলে কিছু থাকে না। ফলে এই কোয়ার্টার ফাইনাল শুধু একটি ম্যাচ নয়; এটি ইউরোপের ঐতিহ্যবাহী ফুটবল শক্তির সঙ্গে আফ্রিকার নতুন জাগরণের এক প্রতীকী লড়াই। ইতিহাস বলছে ফ্রান্স এগিয়ে, কিন্তু বর্তমান বলছে মরক্কোও কোনোভাবেই আর আন্ডারডগ নেই। তাই ফুটবলপ্রেমীরা অপেক্ষা করছেন এমন একটি ম্যাচের, যেখানে শেষ বাঁশি বাজা পর্যন্ত উত্তেজনা থাকবে তুঙ্গে। সেমিফাইনালের টিকিট কার হাতে উঠবে, তার উত্তর মিলবে মাঠের লড়াইয়ে।
ফ্রান্সের সম্ভাব্য একাদশ : মাইক মেনিয়াঁ; জুল কুন্দে, দায়ো উপামেকানো, উইলিয়াম সালিবা, লুকা দিন; মানু কোনো, আদ্রিয়াঁ রাবিও; উসমান দেম্বেলে, মাইকেল অলিজে, ব্র্যাডলি বারকোলা; কিলিয়ান এমবাপে।
মরক্কোর সম্ভাব্য একাদশ : ইয়াসিন বুনু; আশরাফ হাকিমি, ইসা দিয়প, শাদি রিয়াদ, নুসাইর মাজরাউই; আইয়ুব বুয়াদ্দি, আজ্জেদিন উনাহি; ব্রাহিম দিয়াজ, বিলাল এল খান্নুস, নিল এল আইনাউই; সুফিয়ান রাহিমি।
ইনজুরির কারণে ইসমাইল সাইবারির মাঠে নামা অনিশ্চিত। ফলে মাঝমাঠে কিছুটা পরিবর্তন দেখা যেতে পারে।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন