লালমনিরহাটের আদিতমারী উপজেলায় অতিদরিদ্রদের কর্মসংস্থান কর্মসূচির (ইজিপিপি) আওতায় একটি সরকারি খাল খনন প্রকল্পে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। গ্রামীণ জনপদের দরিদ্র মানুষের কর্মসংস্থানের লক্ষ্যে গৃহীত এই প্রকল্পে নিয়মের তোয়াক্কা না করে শ্রমিকের পরিবর্তে ব্যবহার করা হচ্ছে এক্সকাভেটর (ভেকু) মেশিন। এ ছাড়া ভুয়া নথিপত্র তৈরি করে অর্থ আত্মসাতের উদ্দেশ্যে শ্রমিকদের তালিকায় স্থানীয় বিএনপি নেতা, ব্যবসায়ী ও স্কুলশিক্ষকের মোবাইল নম্বর ব্যবহার করার তথ্য পাওয়া গেছে।
বরাদ্দ ৩৮ লাখ, কাজে শুধু ১৭ জন : তথ্য অনুসারে, উপজেলার সাপ্টিবাড়ী ইউনিয়নের ঝড়িরপাড় থেকে ভেলাবাড়ী ইউনিয়নের ঢুসেরডেরা পুল পর্যন্ত ১ দশমিক ৫ কিলোমিটার খাল খনন প্রকল্পের জন্য সরকার মোট ৩৮ লাখ টাকা বরাদ্দ দিয়েছে। নীতিমালা অনুযায়ী, এই প্রকল্পে ইউনিয়নভিত্তিক ৪৫ জন করে মোট ৯০ জন তালিকাভুক্ত শ্রমিকের কাজ করার কথা ছিল।
সরেজমিনে প্রকল্প এলাকা ঘুরে দেখা যায়, খালের তলদেশ যথাযথভাবে খনন না করে শুধু এক পাশের পাড় উঁচু করা হচ্ছে। ভেলাবাড়ী ইউনিয়ন অংশে মাত্র ১৭ জন শ্রমিককে কাজ করতে দেখা যায়। উপস্থিত শ্রমিকরা অভিযোগ করেন, তালিকায় নাম থাকা সত্ত্বেও অধিকাংশ ব্যক্তিই অনুপস্থিত। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, দুই ইউনিয়নের মোট ৯০ জন শ্রমিকের মধ্যে গড়ে ৩৫ থেকে ৪০ জন কাজে উপস্থিত থাকেন। বাকি ৫০ জন শ্রমিক পুরোপুরি অনুপস্থিত থাকলেও তাদের নামে নিয়মিত সরকারি বিল উত্তোলন করা হচ্ছে।
শ্রমিকের তালিকায় নেতা-ব্যবসায়ীর ফোন নম্বর : প্রকল্পের নথিপত্র (মাস্টাররোল) পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, অতিদরিদ্র শ্রমিক অনন্ত কুমার রায়ের নামের পাশে ভেলাবাড়ী ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি গোলাম কিবরিয়া রিপনের মোবাইল নম্বর (০১৭৪০৫৮৮৭০৫) বসানো হয়েছে। একইভাবে, শ্রমিক ইসাহাক আলীর নামের পাশে পুরাতন ভেলাবাড়ী এলাকার ব্যবসায়ী সোবহান আলীর মোবাইল নম্বর (০১৭১৮২৯২৭২৮) ব্যবহার করা হয়েছে। এ ছাড়া তালিকায় আরও বেশ কয়েকজন স্কুলশিক্ষক ও স্থানীয় ব্যবসায়ীর নাম ও ফোন নম্বর রয়েছে।
ফাঁকা চেকে সই নিয়ে অর্থ আত্মসাৎ : একাধিক শ্রমিক অভিযোগ করেন, প্রকল্পসংশ্লিষ্টরা কৌশলে প্রথমে তাদের জাতীয় পরিচয়পত্র সংগ্রহ করে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলেন। এরপর কাজ দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে চেকবইয়ে আগাম স্বাক্ষর নিয়ে রাখেন। শ্রমিক রঞ্জিত কুমার, বেলাল হোসেন ও মোহর আলী জানান, মাত্র ১৭ দিন কাজ করার পর স্থানীয় বিএনপি নেতা গোলাম কিবরিয়া রিপনের নির্দেশে তাদের ব্যাংকে ডেকে নেওয়া হয়। সেখানে একসঙ্গে ৩টি ফাঁকা চেকে স্বাক্ষর নিয়ে তাদের হাতে ৪ হাজার ৫০০ টাকা করে ধরিয়ে দেওয়া হয়। সরকারি নিয়ম অনুযায়ী প্রতিদিন ৫০০ টাকা হাজিরা হিসাবে বাকি টাকা দাবি করলে, তা পরে দেওয়া হবে বলে জানানো হয়। অনেক শ্রমিকের কাছ থেকে ফাঁকা চেকে সই নেওয়া হলেও এখন পর্যন্ত কোনো টাকাই দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে।
দায় এড়ানোর চেষ্টা ও পাল্টাপাল্টি বক্তব্য : শ্রমিক তালিকায় নিজের মোবাইল নম্বর থাকার বিষয়ে জানতে চাইলে ভেলাবাড়ী ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি গোলাম কিবরিয়া রিপন বলেন, ‘তালিকায় কে বা কারা আমার মোবাইল নম্বর দিয়েছে, তা আমার জানা নেই।’ তবে প্রকল্পের সাধারণ সম্পাদক ও নারী ইউপি সদস্য সাইদা বেগম সম্পূর্ণ ভিন্ন দাবি করেন। তিনি বলেন, ‘আমি নামমাত্র প্রকল্প সম্পাদক। সমস্ত কাজ দেখভাল করছেন ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি গোলাম কিবরিয়া রিপন। চেকে বা নথিপত্রে স্বাক্ষরের প্রয়োজন হলে তিনি এসে ধমক দিয়ে আমার কাছ থেকে স্বাক্ষর নিয়ে যান।’
একই সুর শোনা গেছে প্রকল্পের সভাপতি ও ইউপি সদস্য মোফাজ্জল হোসেন মোফার কণ্ঠেও। তিনি বলেন, ‘জোর করে প্রকল্পের মাস্টাররোলে আমার স্বাক্ষর নেওয়া হয়েছে। আমি সভাপতি হলেও আমাকে খাল খননের কাজ দেখাশোনার দায়িত্বে রাখা হয়নি।’
এ বিষয়ে আদিতমারী উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) মো. এনামুল হক বলেন, ‘নিয়ম মেনেই কাজ করানো হচ্ছে এবং কাজ দেখেই বিল দেওয়া হচ্ছে। তবে কোনো শ্রমিক যদি কাজের পুরো টাকা না পেয়ে থাকেন এবং এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট লিখিত অভিযোগ দেন, তবে তদন্ত সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন