প্রকৃতির কাছে মানুষ অসহায় হতে পারে, কিন্তু রাষ্ট্র কখনো অসহায় হওয়ার সুযোগ পায় না। দুর্যোগের সময় রাষ্ট্রের সক্ষমতার প্রকৃত পরীক্ষা হয়, কত দ্রুত বিপন্ন মানুষের পাশে দাঁড়াতে পারে, কত দক্ষতার সঙ্গে উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারে এবং কতটা দূরদর্শিতার সঙ্গে ভবিষ্যৎ ঝুঁকি মোকাবিলার প্রস্তুতি নিতে পারে। চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ও বান্দরবানে চলমান ভয়াবহ বন্যা সেই পরীক্ষার সামনে আমাদের আবারও দাঁড় করিয়েছে।
টানা পাঁচ দিনের ভারি বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকা পানিতে তলিয়ে গেছে। চট্টগ্রামে গত ৪২ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাতের রেকর্ড সৃষ্টি হয়েছে। কয়েক লাখ মানুষ পানিবন্দি, হাজার হাজার পরিবার ঘরবাড়ি হারিয়ে আশ্রয়কেন্দ্রে কিংবা উঁচু স্থানে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছে। কোথাও বিশুদ্ধ পানির সংকট, কোথাও খাদ্যের অভাব, কোথাও বিদ্যুৎ ও যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন। কক্সবাজারে বন্যার পানিতে দুই শিশুর মৃত্যু এবং বান্দরবানে দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা পরিস্থিতির ভয়াবহতাকেই আরও স্পষ্ট করে তুলেছে।
সরকার এরই মধ্যে চাল, নগদ অর্থ এবং ত্রাণ বরাদ্দ দিয়েছে। জেলা প্রশাসন, সেনাবাহিনী, বিজিবি ও স্থানীয় প্রশাসন উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালনা করছে। এসব উদ্যোগ অবশ্যই প্রশংসার দাবিদার। কিন্তু বাস্তবতা হলো, ক্ষয়ক্ষতির ব্যাপকতার তুলনায় বরাদ্দ ও ত্রাণ এখনো পর্যাপ্ত নয়। যে উপজেলায় লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি, সেখানে কয়েক টন চাল বা সামান্য নগদ অর্থ দিয়ে সংকট মোকাবিলা সম্ভব নয়। দুর্গত মানুষের অভিযোগÑ অনেক পরিবার দিনের পর দিন একবেলা খাবারও পাচ্ছে না, এটি কোনোভাবেই উপেক্ষা করার মতো নয়।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ কেবল ত্রাণের পরিমাণ নয়, বরং তা দ্রুত ও সুষ্ঠুভাবে দুর্গত মানুষের হাতে পৌঁছে দেওয়া। যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন থাকলেও বিকল্প ব্যবস্থা, নৌযান, স্পিডবোট, সামরিক ও বেসামরিক উদ্ধার সরঞ্জাম এবং প্রয়োজনে আকাশপথÑ ব্যবহার করে খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি, ওষুধ ও শিশুখাদ্য পৌঁছে দিতে হবে। একই সঙ্গে গর্ভবতী নারী, শিশু, বয়স্ক ও অসুস্থ মানুষের জন্য বিশেষ চিকিৎসা সহায়তা নিশ্চিত করা জরুরি।
এই বন্যা আবারও আমাদের একটি পুরোনো সত্যের সামনে দাঁড় করিয়েছে। শুধু অতিবৃষ্টি নয়, পানি নিষ্কাশনের প্রাকৃতিক পথ দখল, খাল-নদী ভরাট, অপরিকল্পিত নগরায়ণ এবং জলপ্রবাহে বাধা সৃষ্টি করা স্থাপনা বন্যার ক্ষয়ক্ষতিকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে। প্রশাসনের কর্মকর্তারাও স্বীকার করেছেন, অনেক এলাকায় পানি দ্রুত নামতে পারছে না মূলত এসব কারণেই। অর্থাৎ এটি কেবল প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়, এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা ও উন্নয়ন পরিকল্পনার ঘাটতি।
এই চক্র ভাঙতে হলে এখনই কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদ, খাল-নদী পুনরুদ্ধার, স্লুইসগেট ও ড্রেনেজ ব্যবস্থার আধুনিকীকরণ এবং পাহাড়ি অঞ্চলে সমন্বিত পানি ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা বাস্তবায়নে আর কোনো গড়িমসি চলতে পারে না।
জলবায়ু পরিবর্তনের বাস্তবতায় বাংলাদেশে চরম আবহাওয়ার ঘটনা ক্রমেই ঘন ঘন ঘটছে। ফলে দুর্যোগকে আর সাময়িক ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি অভিযোজন পরিকল্পনা, আধুনিক পূর্বাভাস ব্যবস্থা, স্থানীয় সরকারকে আরও সক্ষম করে তোলা এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় কেন্দ্র ও মাঠ প্রশাসনের মধ্যে কার্যকর সমন্বয়।
আজ সবচেয়ে বড় প্রয়োজন মানবিকতার। দুর্গত মানুষ এই মুহূর্তে রাজনৈতিক বক্তব্য নয়, নিরাপদ আশ্রয়, পর্যাপ্ত খাবার, বিশুদ্ধ পানি এবং দ্রুত পুনর্বাসন চায়। সরকারের উচিত পরিস্থিতির গুরুত্ব বিবেচনায় জরুরি ত্রাণ বরাদ্দ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করা, প্রয়োজনে বিশেষ দুর্যোগ তহবিল চালু করে প্রতিটি দুর্গত পরিবারের কাছে দ্রুত সহায়তা পৌঁছে দেওয়ার জন্য সর্বাত্মক রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা কাজে লাগানো। কেননা, একটি দায়িত্বশীল রাষ্ট্রের পরিচয় তখনই স্পষ্ট হয়ে ওঠে যখন দুর্যোগের দিনে মানুষ রাষ্ট্রকে কাছে পায়।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন