বাম্পার ফলনেও মুখে হাসি নেই লক্ষ্মীপুরের কৃষকদের। উৎপাদন ভালো হলেও বাজারে ধানের দাম কম, পাশাপাশি ক্রেতা সংকটে ঘরে ঘরে জমে আছে ধানের স্তূপ। বিক্রি করতে না পারায় অনেক কৃষকের ঘরে রাখা ধানে পচন ধরেছে। কেউ কেউ ইঁদুরের হাত থেকে ধান রক্ষা করতে পারছেন না। এতে আর্থিক সংকটে পড়ে আসন্ন আমন মৌসুমের চাষাবাদ নিয়েও অনিশ্চয়তায় রয়েছেন তারা।
কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, চলতি বোরো মৌসুমে লক্ষ্মীপুর জেলার পাঁচটি উপজেলায় ৩৮ হাজার ৭৬৫ হেক্টর জমিতে ধানের আবাদ হয়েছে। এতে উৎপাদন হয়েছে প্রায় ২ লাখ ৪২ হাজার ১৫৮ টন ধান। তবে বিপুল উৎপাদনের বিপরীতে সরকারিভাবে ধান সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে মাত্র ৩ হাজার ৯৫৯ টন, যা মোট উৎপাদনের প্রায় ৬১ ভাগের এক ভাগ।
কৃষক ও সচেতন মহলের অভিযোগ, সরকারি খাদ্যগুদামে ধান বিক্রির সুযোগ সীমিত হওয়ায় প্রকৃত কৃষকদের বড় অংশ এর বাইরে থেকে যাচ্ছেন। এতে মধ্যস্বত্বভোগীরা লাভবান হচ্ছেন। তারা সরকারি ধান সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা বাড়ানো, প্রান্তিক কৃষকদের কৃষি কার্ডের আওতায় আনা এবং উৎপাদিত ধানের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ও খাদ্য নিয়ন্ত্রকের কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, লক্ষ্মীপুরে প্রায় ২ লাখ ৯০ হাজার কৃষক রয়েছেন। এর মধ্যে সদর উপজেলায় কৃষকের সংখ্যা প্রায় ১ লাখ। এ উপজেলায় ধান বিক্রির জন্য কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে খাদ্যগুদামে প্রায় ১ হাজার ৮০০ কৃষকের তালিকা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু সরকারি ধান সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে মাত্র ১ হাজার ৫৩০ টন। সরকারি নিয়ম অনুযায়ী একজন কৃষকের কাছ থেকে সর্বোচ্চ ৩ টন ধান সংগ্রহ করা যায়। সে হিসাবে সদর উপজেলার বরাদ্দ পূরণ করতে প্রায় ৫১০ জন কৃষকের ধান সংগ্রহ করলেই লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হয়ে যায়। ইতোমধ্যে সদর উপজেলা খাদ্যগুদাম কর্তৃপক্ষ প্রায় ৪২০ জন কৃষকের কাছ থেকে ১ হাজার ২৩১ টন ধান সংগ্রহ করেছে। কিন্তু এর বাইরে থাকা বিপুলসংখ্যক কৃষক বাজারে ধান বিক্রি করতে না পেরে বিপাকে পড়েছেন।
সদর উপজেলার দক্ষিণ টুমচর গ্রামের কৃষক আব্দুল হাশেম, মো. নিজাম, মো. নুরনবী, ফয়েজ আহমেদ ও দেলোয়ার হোসেন জানান, তাদের গ্রামে অন্তত ২০০ কৃষকের ঘরে ধানের বস্তা পড়ে আছে।
তারা বলেন, ‘এক মণ ধান উৎপাদনে প্রায় ৮০০ থেকে ৯০০ টাকা খরচ হয়েছে। কিন্তু এখন বাজারে সেই ধানের দাম বলা হচ্ছে ৬০০ থেকে ৭০০ টাকা। ধান ঘরে পড়ে থেকে বৃষ্টিতে ভিজছে, রোদে শুকাতে হচ্ছে। অনেক ধানে পচন ধরেছে।’
কৃষকদের অভিযোগ, সরকারি খাদ্যগুদামে ধান বিক্রির জন্য তালিকাভুক্ত হতে নানা সমস্যার মুখে পড়তে হচ্ছে। অনেকের কৃষি কার্ড না থাকায় সরকারি সংগ্রহ কর্মসূচিতে সুযোগ মিলছে না। ঘরে জায়গা না থাকায় ধানের বস্তা খোলা জায়গায় রাখতে হচ্ছে। ইঁদুর বস্তা কেটে ধান নষ্ট করছে।
তারা আরও জানান, ধান বিক্রি করতে না পারায় সার, বীজ, কীটনাশক, দোকানের বাকি ও ঋণের টাকা পরিশোধ করা সম্ভব হচ্ছে না। অনেকের সন্তানদের পড়াশোনার খরচ চালাতেও হিমশিম খেতে হচ্ছে।
সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা হাসান ইমাম বলেন, ‘সদরে প্রায় ১ লাখ কৃষক পরিবার রয়েছে। এর মধ্যে খাদ্যগুদামে ধান বিক্রির জন্য প্রায় ১ হাজার ৮০০ কৃষকের তালিকা দেওয়া হয়েছে।’
সদর উপজেলা খাদ্যগুদাম পরিদর্শক শহীন মিয়া বলেন, ‘কোনো সিন্ডিকেট নয়, কৃষি বিভাগের দেওয়া তালিকা অনুযায়ী কৃষকদের কাছ থেকে ধান সংগ্রহ করা হচ্ছে। একজন কৃষকের কাছ থেকে সর্বোচ্চ তিন টন ধান নেওয়ার নিয়ম রয়েছে। বরাদ্দ বাড়ানো গেলে আরও বেশি কৃষকের কাছ থেকে ধান সংগ্রহ করা সম্ভব হবে।’
সদর উপজেলা ধান ক্রয় কমিটির সভাপতি ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ক্যাথোয়াইপ্রু মারমা বলেন, ‘সদর উপজেলায় বরাদ্দ ১ হাজার ৫৩০ টনের মধ্যে এ পর্যন্ত ১ হাজার ২৩১ টন ধান সংগ্রহ করা হয়েছে। ধান সংগ্রহের সময়সীমা ৩১ আগস্ট পর্যন্ত রয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘নির্ধারিত কৃষকের তালিকা ও কৃষি কার্ডের ভিত্তিতেই ধান সংগ্রহ করা হচ্ছে। কৃষকের স্বার্থে ধান সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা বাড়ানোর বিষয়টি বিবেচনা করা হবে।’
জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের কার্যালয় সূত্র জানায়, লক্ষ্মীপুরে সরকারি ধান সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রার মধ্যে সদর উপজেলায় ১ হাজার ৫৩০ টন, রায়পুরে ১ হাজার ৩১ টন, রামগঞ্জে ৯৩১ টন, রামগতিতে ৩১৭ টন এবং কমলনগরে ১৫০ টন নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে সদরে ১ হাজার ২৩১ টন, রায়পুরে ১৮৫ টন, রামগতিতে ৮৩ টন, রামগঞ্জে ৮০৮ টন এবং কমলনগরে ১৫০ টন ধান সংগ্রহ করা হয়েছে। সরকার নির্ধারিত দাম প্রতি কেজি ৩৬ টাকা, অর্থাৎ প্রতি মণ ১ হাজার ৪৪০ টাকা দরে ধান সংগ্রহ কার্যক্রম চলছে। কৃষকদের দাবি, শুধু উৎপাদন বাড়ালেই হবে না, উৎপাদিত ধানের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে হবে। তা না হলে ভালো ফলনও কৃষকের জন্য আশীর্বাদের বদলে বোঝা হয়ে দাঁড়াবে।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন