হযরত শাহজালালের (র.) মাজারের ডেগকা- নিয়ে উত্তাল দেশ-বিদেশ। প্রায় ৭০০ বছর যাবৎ এই মাজার নিজস্ব পন্থায় পরিচালিত হয়ে আসার পর হঠাৎ করে সিলেটের বিদায়ি জেলা প্রশাসক সরোয়ার আলম মাজারে আসা ভক্ত- আশেকানদের দান করা ডেগ সিলগালা করে দেন। এমনকি জেলা প্রশাসনের ব্যবস্থাপনায় একটি অ্যাকাউন্ট খোলা হয়, যাতে নির্দিষ্ট একটা সময় পরপর টাকা গণনা করে সেখানে রাখা হবে। তার ভাষ্য ছিল, মাজারে দান করার টাকার স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা। তবে সাধারণ মানুষের মধ্যে এ নিয়ে একটি মিশ্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়। সবাই স্বচ্ছতা চান এটাই স্বাভাবিক। তবে অনেকে বলছেন, মাজারের সঙ্গে পাগলা মসজিদের তুলনা করা ঠিক নয়। এমনকি এটা জেলা প্রশাসকের কোনো কাজও নয়। কারণ যুগ যুগ ধরে তাদের খাদেম দিয়ে মাজার পরিচালিত হয়ে আসছে। প্রশ্ন তোলা হয়েছে, এতদিন সিলেটে দায়িত্ব পালন করলেও হঠাৎ করে কেনই বা তিনি কার ইঙ্গিতে এই তৎপরতা চালিয়েছিলেন! যা হোক, বিষয়টি নিয়ে আমি বিগত কয়েকদিন অনুসন্ধান করি।
সবকিছুর সূত্রপাত ২০১৫ সালের ‘আগামীর সিলেট’ নামক প্রকল্প থেকে। এই প্রকল্পটি যৌথভাবে শুরু হয় তৎকালীন সরকার এবং সিলেটের তৎকালীন মেয়র আরিফুল হক চৌধুরীর মাধ্যমে। ‘আগামীর সিলেট’ প্রকল্পের অনেক কার্যক্রমের মধ্যে একটি ছিল হযরত শাহজালাল (র.) এবং হযরত শাহপরানের (র.) মাজার উন্নয়ন প্রকল্প। তখন পর্যন্ত মেগা প্রকল্পের কোনো আলোচনা ছিল না।
এই প্রকল্পের প্রথম প্রস্তাব আসে পুকুর-সংলগ্ন ৬ তলাবিশিষ্ট ভবনের। তৎকালীন মন্ত্রী ড. এ. কে. আব্দুল মোমেনের প্রস্তাবে ছিল প্রায় ১০০টির বেশি টয়লেট ও বাথরুম, যা ৬ তলা ভবনের নিচতলায় নির্মাণের পরিকল্পনা ছিল। পাশাপাশি পরিকল্পনা ছিল একটি মহিলা ইবাদতঘরের, যা মাজারে ওঠার সিঁড়ির পাশেই অবস্থিত। প্রাথমিকভাবে ১০ কোটি টাকার বরাদ্দ আসে, যার দায়িত্ব ছিল এলজিইডির কাছে। পরে যখন তৎকালীন মন্ত্রী দেখেন কাজ ঠিকমতো এগোচ্ছে না, তখন দায়িত্ব দেওয়া হয় আস্থাভাজন মেয়র আরিফুল হক চৌধুরীর হাতে। সিলেট সিটি করপোরেশন জানায়, এই কাজ সম্পাদন করতে মোট ৩৫ কোটি টাকা প্রয়োজন এবং সেই বরাদ্দও অনুমোদিত হয়।
মজার বিষয় হলো, বর্তমানে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে যে ৩০ কোটি টাকার কথা বলা হচ্ছেÑ ২৫ কোটি সরকার দেবে এবং ৫ কোটি মাজার দেবেÑ এর কোনো লিখিত দলিল নেই, এমনকি কোনো মৌখিক চুক্তির রেকর্ডও এখন পর্যন্ত প্রকাশ করা হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। জেলা প্রশাসনের বৈঠকে বারবার সেই কাগজপত্র চাওয়া হলেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ তা এড়িয়ে গেছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। থাকার কথাও নয় বলে অনেকের ধারণা। যেহেতু এই অর্থ আগের সরকারই অনুমোদন করেছিল।
বলা জরুরি, মহিলাদের জন্য নতুনভাবে নির্মিত এক কক্ষবিশিষ্ট ভবনের কাজ শুরু হয় ২০২৩-২৪ সালের দিকে, যা এখনো সম্পন্ন হয়নি। জানা যায়, এই এক কক্ষবিশিষ্ট ভবন নির্মাণে সিলেট সিটি করপোরেশন এরই মধ্যে এক কোটিরও বেশি টাকা ব্যয় করেছে (যদিও এ তথ্য স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা যায়নি)। বিভিন্ন সূত্রের দাবি, সঠিক প্রকৌশল ও পরিকল্পনার অভাবে ভবনটি ৩ বার পর্যন্ত ভেঙে পুনর্নির্মাণ করা হয়েছে।
বারিধারী প্রথা এবং সরকারি হস্তক্ষেপ
সম্প্রতি একটি তালিকা ফাঁস হয়, যেখানে কয়েকটি পরিবারের নাম উঠে আসে। যতটুকু জানতে পেরেছি, সারকুম হাজী ইউসুফের (রহ.) বংশধররাই গত প্রায় ৭০০ বছর ধরে হযরত শাহজালালের (র.) মাজারের রক্ষণাবেক্ষণ করে আসছেন। বারিধারী অধিকার মোতাওয়াল্লি পরিবার মুঘল আমল থেকেই পেয়ে আসছেন বলে জানা যায়।
১৯৫০ সালের পর একটি মামলা হাইকোর্টের অধীনে থাকলেও বিভিন্ন সময়ে শুনানির পর সর্বশেষ রায় আসে ২০১৪ সালে। সেই রায়ে নজর-নিয়াজ কোন খাতে ব্যবহার হবে এবং খাদেমরা কতটুকু ভোগ করতে পারবেন, সে বিষয়ে উল্লেখ রয়েছে বলে জানা যায়। তবে রায়ের কপি সংগ্রহ করতে না পারায় বিষয়টি বিস্তারিত উপস্থাপন করা সম্ভব হয়নি।
যেহেতু স্বচ্ছতার বিষয়টি সামনে এসেছে, তাই আমি মনে করি মাজার কর্তৃপক্ষের সবকিছুই স্বচ্ছভাবে উপস্থাপন করা উচিত।
প্রশাসনের হস্তক্ষেপ
ধরে নিলাম, মাজারে প্রতি বছর ১৫ কোটি টাকা সংগ্রহ হয় এবং তিন কোটি টাকা ব্যয় হয়। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে যে ৩০০ পরিবারের কথা উল্লেখ করা হয়েছে, সেই হিসাবে ১২ কোটি টাকা ৩০০ পরিবারে বণ্টন করলে পরিবারপ্রতি প্রায় চার লাখ টাকা করে পড়ে। চার লাখ টাকা থেকেই বাংলাদেশে করযোগ্য আয়ের সীমা শুরু হয়।
টাকা-পয়সার যদি স্বচ্ছতা আসে এবং সরকার যদি সরাসরি হস্তক্ষেপও করে, তা হলে এই ১০-১২ কোটি টাকা ব্যবস্থাপনা করে সরকারের উল্লেখযোগ্য কোনো আর্থিক লাভের সম্ভাবনা দেখা যায় না। বরং অতিরিক্ত প্রশাসনিক দায়িত্বই বাড়বে। তা হলে হঠাৎ করে কেন এই হস্তক্ষেপÑ প্রশ্নটি থেকেই যায়।
টেন্ডার ব্যবসায়ী
২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর থেকে আজ পর্যন্ত ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সরকার থেকে শুরু করে বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি পর্যন্ত অনেক প্রকল্প নিয়ে আলোচনা হয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো হযরত শাহজালালের (র.) মাজারকে ঘিরে সম্ভাব্য ‘মেগা প্রকল্প’।
বিভিন্ন সূত্রে জানা যাচ্ছে, এই প্রকল্পের সম্ভাব্য মূল্য প্রায় এক হাজার কোটি টাকা। এই প্রকল্পে মাজারের উন্নয়নের পাশাপাশি নতুন মসজিদ কমপ্লেক্স, দেওবন্দধারার মাদ্রাসা, লাইব্রেরি, জাদুঘর এবং ভূগর্ভস্থ সড়ক ব্যবস্থাও থাকতে পারে বলে আলোচনা রয়েছে। কোথাও কোথাও বলা হচ্ছে এক হাজার কোটি টাকা, তবে পরিকল্পনা অনুযায়ী এর চেয়েও বেশি বরাদ্দ আসার সম্ভাবনার কথাও শোনা যাচ্ছে।
কওমি মতাদর্শ
২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর মাজার ভাঙার আন্দোলনের সামনের সারিতে ছিল। মাজারপন্থিদের মতাদর্শের সঙ্গে তাদের মতাদর্শের অমিল থাকায় তাদের অবস্থান তুলনামূলকভাবে আক্রমণাত্মক ছিল বলে অনেকের পর্যবেক্ষণ।
আমার ব্যক্তিগতভাবে দ্বীনি জ্ঞান সীমিত। তাই সবকিছু বুঝতে অপারগ হলেও আমার কাছে মনে হয়েছে, এই পরিস্থিতিতে কওমি ধারার একটি অংশ সুযোগ পেয়ে মাজারপন্থিদের ওপর চাপ সৃষ্টি করার চেষ্টা করেছে। মাজারের টাকা গণনা থেকে শুরু করে জেলা প্রশাসনের বিভিন্ন বৈঠকেও তাদের উপস্থিতি দেখা গেছে বলে বিভিন্ন সূত্রে দাবি করা হয়েছে।
জামায়াতে ইসলামী
অনেকেই এই বিষয়ে জামায়াতে ইসলামীকে টেনে আনলেও আমার অনুসন্ধানে দলটির কেন্দ্রীয়ভাবে সম্পৃক্ত থাকার মতো কোনো নির্ভরযোগ্য তথ্য পাইনি। তবে তৃণমূল পর্যায়ের কিছু জামায়াত-সমর্থককে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কওমি ধারার বক্তব্যের সঙ্গে মিল রেখে সক্রিয় দেখা গেছে।
আমার কাছে মনে হয়, মাজার কর্তৃপক্ষ সবকিছু স্বচ্ছতার মধ্যে নিয়ে আসুক। মাজার এবং কওমিÑ দুই পক্ষ একে অপরের বিষয়ে অযথা হস্তক্ষেপ না করুক এবং মেগা প্রকল্প হলে, সম্ভব হলে মাজারের দানের অর্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে বাস্তবায়নের বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে। এতে টেন্ডার-সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর আগ্রহ কমার সম্ভাবনা থাকতে পারে।
লেখক : সমাজকর্মী

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন