একদিকে পিচ্ছিল কাদা, অন্যদিকে মাথার ওপর ভবনের ছাদ থেকে অঝোরে ঝরে পড়া বৃষ্টির ধারা। মাঝখানে দাঁড়িয়ে যেন দিকভ্রান্ত পথচারীরা। গাজীপুরের কালীগঞ্জ পৌরসভার প্রধান বাজারের বর্তমান চিত্র এখন এমনই। বর্ষার অঝোর ধারায় বাজারের অভ্যন্তরীণ সড়কগুলো বর্তমানে একটি ‘দুর্ভোগের করিডরে’ পরিণত হয়েছে। প্রতিদিন নিত্যপণ্য কিনতে আসা সাধারণ ক্রেতা, ব্যবসায়ী এবং পাশর্^বর্তী শিল্পপ্রতিষ্ঠানের হাজারো শ্রমিকের কাছে এই বাজার এখন আতঙ্কের নাম হয়ে দাঁড়িয়েছে।
গত বৃহস্পতিবার সকালে বাজারে কেনাকাটা করতে আসা শিক্ষার্থী আবু সালেক বাবু জানান, বাজারের ভেতরে ঢুকতেই বৃষ্টি শুরু হয়। কাদায় ভরা রাস্তা এড়াতে একপাশ দিয়ে হাঁটার চেষ্টা করলে দেখা দেয় নতুন বিপত্তি। পাশের ভবনের ছাদ থেকে রাস্তার ওপর নামানো পাইপ দিয়ে বৃষ্টির পানি সরাসরি পথচারীদেও শরীরে এসে পড়ছে। ফলে কাদায় পা ডোবানোর পাশাপাশি মাথার ওপর পানির ধারায় ভিজতে হচ্ছে ক্রেতাদের।
আবু সালেক আক্ষেপ করে বলেন, ‘এটি কালীগঞ্জের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক কেন্দ্র। অথচ এখানকার যাতায়াতব্যবস্থা এতটাই জরাজীর্ণ যে স্বাভাবিকভাবে হাঁটাই এখন দায়। পথচারীদের নিরাপত্তা বা সুবিধার কথা ভাবার যেন কেউ নেই।’
সরেজমিনে বাজারে দেখা যায়, সড়কজুড়ে কাদা, বড় বড় গর্ত এবং জমে থাকা পানির অস্বস্তিকর পরিবেশ। কয়েকদিন আগে পৌরসভার পক্ষ থেকে ইটের খোয়া ও বালি ফেলে সামান্য সংস্কারকাজ করা হলেও টানা বৃষ্টিতে তা কাদার সঙ্গে মিশে সড়কটিকে আরও পিচ্ছিল ও বিপজ্জনক করে তুলেছে। ফলে ভারী ব্যাগ নিয়ে চলাচল করা নারী, বৃদ্ধ ও শ্রমজীবী মানুষের দুর্ভোগ চরমে পৌঁছেছে। এই দুর্ভোগ থেকে মুক্তি পেতে স্থানীয়রা দীর্ঘদিন ধরে দাবি জানিয়ে আসছেন, কিন্তু মিলছে না কোনো সুরাহা।
স্থানীয় ব্যবসায়ীদের দাবি, কালীগঞ্জে নতুন নতুন শিল্প-কারখানা গড়ে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে এই বাজারের গুরুত্বও বহুগুণ বেড়েছে। কিন্তু অবকাঠামোগত উন্নয়ন না হওয়ায় ক্রেতারা ধীরে ধীরে এই বাজারমুখী হতে নিরুৎসাহিত হচ্ছেন।
কাপড় ব্যবসায়ী ফারুক দেওয়ান বলেন, ‘সাময়িক সংস্কার করে কর্তৃপক্ষ কেবল দায় সেরেছে। রাস্তার মাঝখান দিয়ে যাওয়া অসম্ভব, আবার পাশে গেলে ভবনের পাইপের পানি গায়ের ওপর পড়ছে। ব্যবসায়ীরা এখন ক্রেতা সংকটে ভুগছেন।’
ব্যবসায়ী মো. আলামিন হোসেন বলেন, প্রতি বর্ষায় বাজারটি যেন ধানখেতে পরিণত হয়। বছরের পর বছর পার হয়ে গেলেও কোনো স্থায়ী উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে না।
আরেক ব্যবসায়ী মিজানুর রহমান জানান, জলাবদ্ধতার কারণে ক্রেতা কমে যাওয়ায় ব্যবসায়ীরা বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন। বাজারের আধুনিক ড্রেনেজ ব্যবস্থা ও সড়ক এক সঙ্গে সংস্কার না করলে এই সমস্যা স্থায়ীভাবে দূর হবে না।
বর্ষা এলেই কালীগঞ্জ বাজারের এই পুরোনো ক্ষত আবারও সামনে আসে। স্থানীয়দের প্রশ্ন, গুরুত্বপূর্ণ এই বাণিজ্যিক এলাকায় আর কতকাল সাময়িক সংস্কারের নামে দায়সারা কাজ চলবে? নাগরিক সুবিধাবঞ্চিত মানুষগুলোর প্রত্যাশা, এবার যেন কাদা আর পানির যন্ত্রণা থেকে মুক্তি মেলে এবং কালীগঞ্জ বাজার টেকসই উন্নয়নের পথে হাঁটে।
এ বিষয়ে কালীগঞ্জ পৌরসভার সহকারী প্রকৌশলী মন্নুর আহমেদ বলেন, বর্ষার আগে সীমিত পরিসরে কিছু কাজ করা হয়েছিল। কিন্তু অতিবৃষ্টির কারণে পরিস্থিতি আবারও খারাপ হয়েছে। আমরা জনদুর্ভোগ কমাতে দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার চেষ্টা করছি।
পৌর নির্বাহী কর্মকর্তা (পিএনও) শ্যামল কুমার দত্ত জানান, সমস্যাটি প্রকৌশল বিভাগকে জানানো হয়েছে এবং দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
কালীগঞ্জ পৌর প্রশাসক এটিএম কামরুল ইসলাম বলেন, বাজারের এই সমস্যার বিষয়টি আমাদের নজরে আছে। বর্ষা শেষ হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা না করে পরিস্থিতি বিবেচনায় যত দ্রুত সম্ভব টেকসই সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হবে। বিশেষ করে আরসিসি সড়ক নির্মাণ এবং আধুনিক ড্রেনেজ ব্যবস্থার বিষয়টি আমাদের বর্তমান অগ্রাধিকার তালিকায় রয়েছে।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন