দেশজুড়ে ডেঙ্গুর ছোবল যখন ক্রমেই চওড়া হচ্ছে, তখন উত্তরবঙ্গের রংপুর অঞ্চলে পরিস্থিতি এখনো শান্ত। কিন্তু এই শান্ত পরিস্থিতি যেকোনো সময় রূপ নিতে পারে বড় বিপর্যয়ে- এমনটাই আশঙ্কা করছেন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। বর্ষা আসতেই দেশের বিভিন্ন স্থানে এডিস মশার যে জ্যামিতিক বিস্তার ঘটছে, তার আঁচ রংপুর অঞ্চলেও লাগার জোর আশঙ্কা রয়েছে। এ অবস্থায় কোনো রকম ঢিলেমি না দিয়ে, সম্ভাব্য মহামারি ঠেকাতে স্থানীয় প্রশাসন থেকে শুরু করে সাধারণ নাগরিক- সবাইকে এখনই আগাম সুক্ষাকবচ গড়ে তোলার তাগিদ দেওয়া হচ্ছে।
স্বাস্থ্য বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, রংপুর বিভাগে এখন পর্যন্ত ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা অন্যান্য বিভাগের তুলনায় বেশ কম। তবে বর্ষা মৌসুমের এই সময়ে যেকোনো মুহূর্তে পরিস্থিতির অবনতি হতে পারে। বিশেষ করে ঢাকা কিংবা অন্যান্য আক্রান্ত অঞ্চল থেকে যাতায়াতকারীদের মাধ্যমে স্থানীয়ভাবে এডিস মশার বংশবিস্তারের ঝুঁকি রয়েছে। বিশ্লেষকেরা বলছেন, দেশে ডেঙ্গুর ধরন বদলেছে। ডেঙ্গু একদিকে যেমন ভয়ংকর হয়ে উঠছে, তেমনি শহর ছাড়িয়ে ঝুঁকি বাড়িয়েছে প্রত্যন্ত অঞ্চলেও। কমবেশি সারা বছরই ডেঙ্গু আক্রান্তের খবর পাওয়া যাচ্ছে।
রংপুর বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালকের কার্যালয়ের তথ্যানুযায়ী, ২০২৩ ও ২০২৪ সালে দুই বছরে রংপুরের আট জেলায় ডেঙ্গু জ¦রে আক্রান্ত হয়ে সরকারি মেডিকেলে মারা গেছেন ১৪ জন। এর বাইরে বেসরকারি মেডিকেল ও বাড়িতেও মৃত্যু হয়েছে ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর।
পরিসংখ্যান বলছে, ২০২২ রংপুর বিভাগের আট জেলায় ডেঙ্গু জ¦রে মোট আক্রান্ত রোগী ছিল ২৬৫ জন। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি রোগী চিকিৎসা নিয়েছে দিনাজপুরের এম আব্দুর রহিম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ১৪৭ জন এবং রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৫৪ জন। এর বাইরে ঠাকুরগাঁও হাসপাতালে ১০ জন, নীলফামারী হাসপাতালে ৩২ জন, পঞ্চগড় হাসপাতালে নয়জন, লালমনিরহাটে সাতজন, কুড়িগ্রামে চারজন এবং গাইবান্ধায় দুজন।
২০২৩ সালে এই বিভাগে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ৫ হাজার ৪৯৪ জন। মৃত্যু হয়েছিল ১২ জনের। সবচেয়ে বেশি মৃত্যু ছিল দিনাজপুরেÑ পাঁচজন। এরপর রংপুরে চারজন, গাইবান্ধায় দুজন ও লালমনিরহাটে একজন। ওই বছর বেশি রোগী চিকিৎসা নিয়েছে রংপুরেÑ ১ হাজার ২৯৫ জন। এর মধ্যে স্থানীয়ভাবে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ছিল ৪৬০।
এ ছাড়া গাইবান্ধায় ১ হাজার ৪৪ জন, দিনাজপুরে ৮৮৩ জন, নীলফামারীতে ৭৬৫ জন, কুড়িগ্রামে ৭০৮ জন, লালমনিরহাটে ৩০৩ জন, ঠাকুরগাঁওয়ে ৩০৯ জন এবং পঞ্চগড়ে ১৮৭ জন।
তথ্য বলছে, ২০২৪ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ৭ ডিসেম্বর পর্যন্ত আট জেলায় মোট আক্রান্ত হয়েছে ১ হাজার ৪৭২ জন। এর মধ্যে বেশি রোগী দিনাজপুরে ৩৪৪ জন, নীলফামারীতে ৩০১, কুড়িগ্রামে ২১৭, গাইবান্ধায় ১৪৬, রংপুরে ১৯৭, লালমনিরহাটে ৬৩, ঠাকুরগাঁওয়ে ৭৭ এবং পঞ্চগড়ে ১১৮ জন। মৃত্যু হয়েছে দুজনের। এর মধ্যে গাইবান্ধায় ও নীলফামারীতে একজন করে।
২০২৫ সালে আট জেলায় ডেঙ্গু জ¦রে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ছিল ১ হাজার ১৮৭। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি রোগী ছিল দিনাজপুরে ২৫৬ জন। এরপর রংপুরে ২৪৪ জন, নীলফামারীতে ২০৭ জন, গাইবান্ধায় ১৬২ জন, ঠাকুরগাঁওয়ে ৯৯ জন, লালমনিরহাটে ৯৬ জন এবং কুড়িগ্রামে ৩৫ জন। ওই বছর কোনো রোগীর মৃত্যু হয়নি।
চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত বিভাগের আট জেলায় ৪৪ জন ডেঙ্গু জ¦রে আক্রান্ত হয়। এর মধ্যে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসহ জেলায় মোট ১১ জন, গাইবান্ধায় ১০ জন, লালমনিরহাট ও নীলফামারীতে আটজন করে, দিনাজপুরে চারজন এবং ঠাকুরগাঁওয়ে তিনজন। ওই সময় পর্যন্ত ৩৭ জন রোগী চিকিৎসা নিয়ে বাড়ি ফিরেছে এবং কোনো মৃত্যু হয়নি।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রংপুর বিভাগীয় উপপরিচালক ডা. ওয়াজেদ আলী বলেন, ‘রংপুরে ডেঙ্গু জ¦রে আক্রান্ত হয়ে গত দেড় বছরে কোনো মৃত্যুর ঘটনা ঘটেনি। আক্রান্ত রোগীর সংখ্যাও কমেছে। তবে এখনো পুরোপুরি ডেঙ্গু জ¦রের প্রাদুর্ভাব শুরু হয়নি। ডেঙ্গু যেন না হয়, সে জন্য পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, মশা নিধন, মশারি টানিয়ে ঘুমানোসহ বিভিন্ন সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘আর যদি ডেঙ্গু হয়েই যায়, তাহলে চিকিৎসাসেবার জন্য প্রতিটি জেলা ও উপজেলা হাসপাতালে প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। রক্ত পরীক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় কিট সরবরাহ স্বাভাবিক রয়েছে।’ মানুষের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং স্থানীয় প্রশাসন সক্রিয় ভূমিকা পালন করলে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা ও মৃত্যুর হার কমিয়ে আনা সম্ভব বলে মন্তব্য করেন এই কর্মকর্তা।
চিকিৎসকদের মতে, ডেঙ্গু প্রতিরোধে সচেতনতার কোনো বিকল্প নেই। বাড়ির আশপাশে ডাবের খোসা, টায়ার, ফুলের টব বা যেকোনো পরিত্যক্ত পাত্রে যেন তিন দিনের বেশি পানি জমে না থাকে, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। এদিকে, রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, রোগী বাড়লে ডেঙ্গু রোগীদের জন্য বিশেষ কর্নার বা আলাদা ওয়ার্ড চালু করার মতো প্রাথমিক প্রস্তুতি তাদের রয়েছে।
এ বিষয়ে রংপুর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক অ্যাডভোকেট মাহফুজ উন নবী চৌধুরী ডন জানান, ডেঙ্গুসহ মশাবাহিত রোগ প্রতিরোধে গত ২৫ জুন থেকে মাসব্যাপী বিশেষ মশক নিধন ও পরিচ্ছন্নতা কর্মসূচি শুরু হয়েছে। শহরের প্রতিটি ওয়ার্ডে এডিস মশার বিস্তার রোধ ও লার্ভা ধ্বংসের জন্য এই ক্রাশ প্রোগ্রাম পরিচালনা করা হচ্ছে।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন