নগরের হারিয়ে যাওয়া খেলার মাঠগুলো একে একে ফিরতে শুরু করেছে। দীর্ঘদিন ধরে দখল আর পরিত্যক্ততার কারণে বন্ধ থাকা এসব মাঠকে পুনরুদ্ধার করে নতুনরূপে গড়ার উদ্যোগ নিয়েছে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন (চসিক)।
নগরবাসী বলেছে, চসিকের এই উদ্যোগ শুধু অবকাঠামো নয়Ñ এটি চট্টগ্রাম নগরীর হারানো শ্বাস ফিরিয়ে দেওয়ার এক নীরব প্রচেষ্টা।
চসিকের তথ্য মতে, শিশুদের খেলাধুলার জায়গা ফিরিয়ে দিতে, যুবসমাজকে মাদক থেকে দূরে রাখতে খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক কর্মকা- ও পারিবারিক বিনোদনের মাধ্যমে একটি মানবিক ও প্রাণবন্ত নগরী গড়ে তুলতে চায় চসিক। এমন ধারণা থেকেই চসিক মেয়রের নির্দেশে নগরীর মাঠগুলো চিহ্নিতকরণ, দখলমুক্তকরণ ও সংস্কারের কাজ এগিয়ে নিচ্ছে চসিক।
তথ্যসূত্র বলেছে, চট্টগ্রাম মহানগরীতে বড়-ছোট মিলিয়ে আনুমানিক ২০ থেকে ৩০টির মতো খেলার মাঠ ও খোলা মাঠ-সমমানের জায়গা রয়েছে। এসব মাঠের অধিকাংশই সারা বছর থাকে খেলার অনুপযোগী।
অপরদিকে চসিক পরিচালিত বিদ্যালয়ের মধ্যে ৬৫ শতাংশ বিদ্যালয়ে খেলার মাঠ নেই। বাকি ৩৫ শতাংশ বিদ্যালয়ে নামে মাত্র রয়েছে সংকীর্ণ মাঠ, যা খেলার অনুপযোগী।
প্রকৌশল বিভাগের তথ্যমতে, মহানগরীর ৪১টি ওয়ার্ডে বড় পরিসরে আধুনিক সুযোগ-সুবিধার সমন্বয়ে মাঠ তৈরির উদ্যোগ নিয়েছেন চসিক মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন। ইতোমধ্যে প্রথম পর্যায়ে নগরীর সাতটি মাঠের উন্নয়ন কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে। দ্বিতীয় পর্যায়ে বিভিন্ন ওয়ার্ডে আরও ১৯টি মাঠ সংস্কার করা হবে। এভাবে পর্যায়ক্রমে অন্যান্য ওয়ার্ডে ও অত্যাধুনিক খেলার মাঠ ও পার্ক নির্মাণ করবে চসিক।
এ বিষয়ে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, একটি শহরে খোলা মাঠ মানে শুধু খেলার জায়গা নয়, এটি শহরের ফুসফুস। মাঠ ও উন্মুক্ত স্থান বাড়লে মাদকমুক্ত, সুস্থ ও কর্মক্ষম প্রজন্ম গড়ার পাশাপাশি নগরের তাপমাত্রা, বায়ু চলাচল এবং পরিবেশগত ভারসাম্যেও ইতিবাচক প্রভাব পড়ে। চসিকের মাঠ নির্মাণের উদ্যোগ প্রশংসনীয়; তবে নির্মাণের চেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে মাঠ সংরক্ষণ ও সবার জন্য উন্মুক্ত রাখা।
মাঠ নির্মাণে সবচেয়ে বেশি নজর দিতে হয় সমতল ও মানসম্মত ঘাস/টার্ফ, উন্নত ড্রেনেজ ব্যবস্থা, গোলপোস্ট ও নেট, কর্নার ফ্ল্যাগ, ফ্লাডলাইট, দর্শক গ্যালারি, ছাউনিযুক্ত আসন, খেলোয়াড়দের ড্রেসিং রুম, শাওয়ার ও টয়লেট আর বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা।
একই সাথে আরও থাকতে হয় রেফারির কক্ষ, ফার্স্ট এইড/মেডিকেল রুম, অ্যাম্বুলেন্স প্রবেশের ব্যবস্থা, সিসিটিভি, নিরাপত্তাকর্মী, ডিজিটাল স্কোরবোর্ড, পাবলিক অ্যাড্রেস সিস্টেম, অনুশীলন মাঠ, জিম বা ফিটনেস জোন, পর্যাপ্ত পার্কিং স্পেস, সবুজায়ন ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা অন্যতম।
চসিকের প্রকৌশল বিভাগ বলছে, একটি আদর্শ খেলার মাঠের যা যা থাকা দরকার, তার অধিকাংশ থাকছে চসিকের নতুন করে নির্মাণাধীন মাঠ সমূহে।
চসিকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) ও সচিব আশরাফুল আমিন বলেন, ১ম পর্যায়ে উন্নয়ন চলমান মাঠগুলো হচ্ছেÑ ১৬নং চকবাজার ওয়ার্ডের মহসিন কলেজ মাঠ, ২৭নং আগ্রাবাদ জাম্বুরি মাঠ, ২৬নং বহুরূপী মাঠ, ১৭নং পশ্চিম বাকলিয়া মাঠ, ১১নং দক্ষিণ কাট্টলী ওয়ার্ডের বিডিআর মাঠ, হালিশহর বি-ব্লক মাঠ এবং ২৫নং এইচ-ব্লক মাঠে নির্মাণ কাজ শেষ পর্যায়ে রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, নগরের কিছু মাঠকে বাণিজ্যিককরণ করা হয়েছিল, কিছু মাঠ বিভিন্ন সংস্থার অধীনে ছিল এবং কয়েকটি বেদখলও ছিল। বেদখল মাঠগুলোকে দখলে নেওয়া ও বিভিন্ন সংস্থা থেকে অনুমতি নিয়ে চসিকের আয়ত্তে নেওয়াটাই চ্যালেঞ্জিং ছিল। ইতোমধ্যে আমরা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সাথে আলোচনার মাধ্যমে সেসব চ্যালেঞ্জ সফলভাবে সম্পন্ন করতে পেরেছি।
আশরাফুল আমিন বলেন, আগামীতে মাঠগুলো দখল ধরে রাখা এবং রক্ষণাবেক্ষণ করাই সব থেকে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এ লক্ষ্যে স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তি, বিভিন্ন ক্লাব, সামাজিক সংগঠনের সাথে সমন্বয় করে চসিক এবং তাদের জনবল দিয়ে কমিটি গঠন করে দেবে।
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন (চসিক) মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, আমি মেয়রের দায়িত্ব নেওয়ার পরই বলেছিলাম, এ শহরের কিশোর গ্যাং, মাদক-সন্ত্রাস দূর করার জন্য এবং যুব ও কিশোর সমাজের জন্য নগরীর ৪১টি ওয়ার্ডে ৪১টি খেলার মাঠ করে দিয়ে যাব। আমার নৈতিক দায়িত্ব থেকে ইতোমধ্যে জাম্বুরী মাঠ ও ফিরোজ শাহ মাঠসহ বেশ কিছু মাঠের সংস্কার করেছি।
মেয়র আরও বলেন, নগরীর অনেক মাঠে ওয়াকওয়ে আছে, সেগুলো সংস্কারের পাশাপাশি অনেক মাঠকে মিনি স্টেডিয়ামে পরিণত করে দেব। যেখানে ওয়াশরুমসহ প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা থাকবে। ধাপে ধাপে প্রতিটি ওয়ার্ডের মাঠের কাজ শুরু হবে। মূলত আমি চাই, আগামীর প্রজন্মকে ভাল কিছু দিয়ে যেতে। মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন আরও বলেন, খেলার মাঠ একটি সুস্থ ও সম্ভাবনাময় প্রজন্ম গড়ে তোলার ভিত্তি। প্রতিটি খেলার মাঠ একটি শিশুর স্বপ্ন, একটি তরুণের আত্মবিশ্বাস এবং একটি সুস্থ সমাজের প্রতীক। আমরা নগরীতে শুধু মাঠ নির্মাণ করছি না, আগামীর চট্টগ্রাম নগরীকে ক্লিন, গ্রিন আর হেলদি সিটি গড়ার প্রত্যয়ে চসিকে যে কর্মযজ্ঞ চলছে, এটি তারই অংশ। তাই নগরীর প্রতিটি মাঠ উন্নয়ন ও সংরক্ষণ আমাদের নৈতিক দায়িত্ব আর আমাদের অঙ্গীকার।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন