প্রত্যর্পণ চুক্তির আওতায় শেখ হাসিনাকে ভারত থেকে ফেরানো হলে তার আত্মসমর্পণের সুযোগ থাকবে না বলে জানিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রধান কৌঁসুলি আমিনুল ইসলাম। তিনি বলেছেন, সরকার ভারত সরকারের কাছে অনুরোধ জানিয়েছে তাকে ফেরত দেওয়ার জন্য। এখন প্রশ্নটা হচ্ছে, তিনি যদি ভারত সরকারের নিয়ন্ত্রণে থাকেন, তাহলে তো নিজে নিজে তার আসার কোনো সুযোগ নেই। হয় প্রত্যর্পণ চুক্তির (এক্সট্রাডিশন) আওতায় তাকে বাংলাদেশ সরকারের কাছে হ্যান্ডওভার করা হবে অথবা তাকে পুশব্যাক করবে।
গতকাল রোববার নিজ কার্যালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এ কথা বলেন। আমিনুল ইসলাম বলেন, শেখ হাসিনার দেশে ফিরে সরাসরি আত্মসমর্পণের কোনো আইনি সুযোগ নেই। প্রত্যর্পণ চুক্তির আওতায় ফিরলে তাকে গ্রেপ্তার হয়েই কারাগারে যেতে হবে।
মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে ফাঁসির রায় মাথায় নিয়ে ভারতে নির্বাসনে থাকা সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আগামী ডিসেম্বর নাগাদ দেশে ফিরে আদালতে আত্মসমর্পণের পরিকল্পনার কথা বলেছেন বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে। গত বৃহস্পতিবার রাতে টেলিফোনে দেওয়া প্রায় ঘণ্টাব্যাপী এক সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা বলেছেন, কেবল তিনি একাই নন, নির্বাসিত জ্যেষ্ঠ আওয়ামী লীগ নেতারাও তার সঙ্গে দেশে ফিরে আত্মসমর্পণ করবেন। এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে প্রধান কৌঁসুলি বলেন, নেতাকর্মীদের দিয়ে দেশকে অস্থিতিশীল করার জন্য এ বক্তব্য দিয়েছে শেখ হাসিনা। বরং সরকার কূটনৈতিকভাবে তাকে দেশে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। দেশে ফিরলে শেখ হাসিনার জামিনের কোনো সুযোগ আছে কি নাÑ এমন প্রশ্নের জবাবে আমিনুল ইসলাম বলেন, ‘আমাদের দেশে এখন পর্যন্ত মৃত্যুদ-প্রাপ্ত কোনো আসামির জামিন হয়েছে এরকম নজির নাই।’
দেশে ফেরার পর আইনি পদক্ষেপ কী হবেÑ এ প্রশ্নের উত্তরে প্রধান কৌঁসুলি বলেন, যদি শেখ হাসিনাকে কোনোভাবে বাংলাদেশে আনা হয় অথবা তাকে বাংলাদেশে পাওয়া যায়, তাহলে তো সংগত কারণেই যেহেতু তার বিরুদ্ধে মৃত্যুদ-াদেশ, তিনি প্রথমত জেলে যাবেন এবং জেলে যাওয়ার পর তিনি আপিল করতে পারবেন কি পারবেন না, সে বিষয়ে নিষ্পত্তি হবে।
নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পদক্ষেপ না নেওয়ায় শেখ হাসিনা আপিলের অধিকার খুইয়েছেন জানিয়ে প্রধান কৌঁসুলি বলেন, ‘সেকশন ২১-এর ৩ ধারায় পরিষ্কার করে বলছে, ৩০ দিনের পরে আর কোনো আপিল হবে না। যদি আপিল করার সুযোগ না থাকে, তাহলে সাজা বহাল থাকবে। যদি আপিল করা যায়, তাহলে আপিল নিষ্পত্তি সাপেক্ষে যা হয় তা হবে।’
সম্পদ বাজেয়াপ্ত হওয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘সেন্টেন্সের সঙ্গে কিন্তু তার সম্পত্তি যেগুলো আছে বাংলাদেশে, তার স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি, সেটাও বাজেয়াপ্ত করেছে। অতএব, তার ব্যাংকে যদি কোনো টাকা থাকে; তার যদি ইমুভেবল কোনো প্রপার্টি থাকে, তাহলে সেটা কিন্তু এখন রাষ্ট্রের অনুকূলে বাজেয়াপ্ত করা। এটার মালিকানা কিন্তু আর তার নাই।’
২০২৪ সালের ছাত্র আন্দোলন দমাতে প্রাণঘাতী দমন-পীড়নের নির্দেশ দেওয়ার অভিযোগে গত নভেম্বরে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল শেখ হাসিনাকে তার অনুপস্থিতিতেই মৃত্যুদ- দেন। জাতিসংঘের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সেই আন্দোলনে প্রায় ১৪০০ মানুষের মৃত্যু হয়েছিল। তবে নির্বাসনে থাকা শেখ হাসিনা হত্যার নির্দেশ দেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করে আসছেন। ভারত শেখ হাসিনাকে আশ্রয় দেওয়ায় দিল্লির সঙ্গে ঢাকার সম্পর্কের চরম অবনতি ঘটে। ঢাকা বারবার তাকে দেশে ফেরত পাঠাতে নয়াদিল্লির প্রতি আহ্বান জানিয়ে আসছে।
ট্রাইব্যুনালে চলমান অন্যান্য মামলার হালনাগাদ তথ্য তুলে ধরে প্রধান কৌঁসুলি বলেন, ২০১৩ সালের ৫ মে মতিঝিলের শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের মহাসমাবেশে সংঘটিত হত্যাকা- মামলার তদন্ত কার্যক্রম সম্পন্ন হয়েছে। আগামী ২১ জুলাই এ মামলার আনুষ্ঠানিক তদন্ত প্রতিবেদন ট্রাইব্যুনালে দাখিল করা হবে। এ ছাড়া ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থানে সংঘটিত নৃশংসতা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের ঘটনাসহ ট্রাইব্যুনালে চলমান প্রধান ১০টি মামলার তদন্তকাজ এখন একেবারে শেষ পর্যায়ে রয়েছে। দ্রুতই এগুলোর প্রতিবেদন আদালতে পেশ করা হবে বলে জানান আমিনুল ইসলাম। আওয়ামী লীগের শাসনামলের অন্যান্য অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, ১৯৭৫ সালে সর্বহারা পার্টির নেতা সিরাজ শিকদার হত্যাকা-সহ আওয়ামী লীগের শাসনামলে সংঘটিত অভিযোগগুলোও তদন্তাধীন রয়েছে।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন