টানা বর্ষণ, পাহাড়ি ঢল ও উজান থেকে নেমে আসা পানিতে দেশের দক্ষিণ-পূর্ব, উত্তর-পূর্ব এবং উত্তরাঞ্চলীয় কিছু জেলা বন্যার কবলে পড়েছে। চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, বান্দরবান, রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জসহ একাধিক জেলায় লাখো মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। বন্যার কারণে অনেক স্থানে সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। ব্যাহত হচ্ছে বিদ্যুৎ ও বিশুদ্ধ পানির সরবরাহ। পরিস্থিতির শিকার বহু পরিবার আশ্রয় নিয়েছে আশ্রয়কেন্দ্রে। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, বন্যা ও ভূমিধসে অন্তত ৫১ জনের মৃত্যু এবং ১০ লাখের বেশি মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
এমন বৈরী পরিস্থিতিতে বন্যার্ত অঞ্চলগুলোতে উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে পানিবাহিত বিভিন্ন রোগের বিস্তার। এর কারণ হিসেবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বন্যার পানিতে ডুবে গেছে নলকূপ, টয়লেট, পুকুর ও জলাশয়। এ সময়ে পানিবাহিত রোগ টাইফয়েড, হেপাটাইটিস-এ ও ই, ত্বকের সংক্রমণ এবং চোখের বিভিন্ন রোগ দ্রুত ছড়ানোর আশঙ্কা বেড়ে যায়। এ ছাড়া বর্ষা মৌসুমে মশাবাহিত রোগের ঝুঁকিও বাড়ছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রতিদিনই শতাধিক নতুন ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হচ্ছে। মৃত্যুও ঘটছে। ফলে বন্যাকবলিত এলাকায় একদিকে পানিবাহিত রোগ, অন্যদিকে ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব স্বাস্থ্যব্যবস্থার জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, এমন সংকটে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে শিশু ও প্রবীণরা।
রূপালী বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলা-উপজেলার প্রতিনিধিদের পাঠানো তথ্যের ভিত্তিতে জানা যায়, উপকূলীয় ও বন্যাকবলিত বহু এলাকায় এরই মধ্যে দেখা দিয়েছে নিরাপদ পানির অভাব। বিশুদ্ধ পানির অভাবে অনেক মানুষ বাধ্য হয়ে নদী, খাল বা পুকুরের অপরিশোধিত পানি ব্যবহার করছেন, যা পানিবাহিত রোগের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে। এতে পাঁচ বছরের কম বয়সি শিশু, গর্ভবতী নারী, প্রবীণ ব্যক্তি ও দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্তরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছেন।
শিশুদের ক্ষেত্রে ডায়রিয়াজনিত পানিশূন্যতা খুব দ্রুত প্রাণঘাতী হতে পারে উল্লেখ করে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. বে-নজির আহমেদ রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, অন্যান্য বছরের বন্যার সঙ্গে এ বছরের বন্যার পার্থক্য হচ্ছেÑ এখন ডেঙ্গু এবং হামের সংক্রমণ ঊর্ধ্বমুখী। আমরা যত দূর জানতে পেরেছি, দেশের ৭টি জেলার মানুষ এ পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। জনসংখ্যার হিসাবে প্রায় ১০ লাখ। প্রায় ২ লাখ ৬৮ হাজার পরিবার পানিবন্দি অবস্থায় রয়েছে। এর মধ্যে চট্টগ্রাম বিভাগে সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি ও অবকাঠামোগত ক্ষতি হয়েছে। এর চেয়েও সবচেয়ে বড় ক্ষতি হচ্ছে স্বাস্থ্যগত ঝুঁকি। পানিবন্দি মানুষ বিশুদ্ধ পানির অভাবে বাধ্য হয়ে দূষিত পানি পান করছে। এতে ডায়রিয়া ও টাইফয়েডের জীবাণুর বিস্তার ঘটা স্বাভাবিক। আবার যেসব এলাকায় বন্যা হয়নি, যেমন রাজধানী, সেখানেও বৃষ্টি হচ্ছে। ফলে বৃষ্টির পানি জমে থাকছে এখানে-সেখানে। এতে ডেঙ্গুর সংক্রমণ বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে। আমার মতে, এখন শুধু ত্রাণ বিতরণ নয়, বন্যা মোকাবিলায় স্বাস্থ্যব্যস্থাকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে।
এ জন্য সরকারকে কী ব্যবস্থা নিতে হবে জানতে চাইলে আরেক জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেনিন চৌধুরী রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, যেভাবে বন্যার ভয়াবহতা বাড়ছে, এ ক্ষেত্রে আমাদের সুপারিশ থাকবেÑ প্রতিটি আশ্রয়কেন্দ্রে মেডিকেল টিম ও খাবার স্যালাইন সরবরাহ করতে হবে, যত বেশি পরিমাণে পারা যায়। এর বাইরে পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট ও ক্লোরিন বিতরণ, নিরাপদ স্যানিটেশন নিশ্চিত করা, জেলা পর্যায়ে দ্রুত রোগ নজরদারি, বিশুদ্ধ পানির বিকল্প ব্যবস্থা ও মোবাইল চিকিৎসকদল সার্বক্ষণিক প্রস্তুত রাখা। তিনি বলেন, দ্রুত প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে বন্যা-পরবর্তী সময়ে ডায়রিয়া, আমাশয় ও অন্যান্য সংক্রামক রোগ স্থানীয় প্রাদুর্ভাবে রূপ নিতে পারে। তাই উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রমের পাশাপাশি জনস্বাস্থ্য সুরক্ষাকেও সমান অগ্রাধিকার দিতে হবে।
চলমান বন্যা পরিস্থিতি মোকাবিলায় স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ইতিমধ্যে জরুরি নির্দেশনা হিসেবে দেশের সব বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক, সিভিল সার্জন এবং উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের জরুরি নির্দেশনা দিয়েছে। এ বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ^াস রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, আমরা বন্যা পরিস্থিতিতে জনস্বাস্থ্য রক্ষায় সব ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করেছি। এর মধ্যে বন্যাকবলিত এলাকায় জরুরি চিকিৎসাসেবা অব্যাহত রাখার পাশাপাশি প্রয়োজন হলে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ছুটি বাতিলের আদেশ দেওয়া হয়েছে। শুধু তাই নয়, জেলা, উপজেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ে ফোকাল পারসন নিয়োগ করার কথা বলা হয়েছে। এ ছাড়া বন্যার্ত এলাকায় পর্যাপ্ত ওষুধ, খাবার স্যালাইন (ওআরএস), বিশুদ্ধ পানি ও চিকিৎসা সরঞ্জাম পর্যাপ্ত মজুত রাখার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। আশ্রয়কেন্দ্রভিত্তিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতের লক্ষ্যেও আমরা কাজ করছি। তিনি বলেন, এ সময়টায় যেসব রোগ সবচেয়ে উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে, তার মধ্যে তীব্র ডায়রিয়া ও পানিশূন্যতা, আমাশয় ও অন্ত্রের সংক্রমণ, টাইফয়েড ও হেপাটাইটিস, ত্বকের ছত্রাক, ব্যাকটেরিয়াজনিত সংক্রমণ, চোখের প্রদাহ এবং সংক্রমণ অন্যতম। কিন্তু চলতি বছর আমাদের আরেকটি উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে হামের ঊর্ধ্বমুখী সংক্রমণ। আর ডেঙ্গুর চোখরাঙানি তো আছেই। সব মিলিয়ে স্বাস্থ্য বিভাগকে একটি কঠিন পরীক্ষার সম্মুখীন হতে হচ্ছে।
খবর অনুসারে, সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন এলাকায় ডায়রিয়া, তীব্র পানিশূন্যতা, আমাশয়, জন্ডিস (হেপাটাইটিস-এ/ই), টাইফয়েড এবং বিভিন্ন চর্মরোগে আক্রান্ত রোগীর ভিড় বাড়তে শুরু করেছে হাসপাতালগুলোতে। বন্যার পানি নেমে যাওয়ার আগেই নিরাপদ পানির সংকট, দূষিত নলকূপ ও স্যানিটেশন ব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় জেলা ও উপজেলা হাসপাতালগুলোতে রোগীর চাপ বেড়েছে। হাসপাতাল সূত্রগুলো জানায়, বহির্বিভাগ ও জরুরি বিভাগে সবচেয়ে বেশি আসছেন শিশু, বয়স্ক ও গর্ভবতী নারীরা। চিকিৎসকদের মতে, অধিকাংশ রোগী দূষিত পানি পান করা, বন্যার পানিতে দীর্ঘ সময় অবস্থান এবং স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণ করতে না পারার কারণে আক্রান্ত হচ্ছেন। এসব রোগের হাত থেকে রক্ষা পেতে স্বাস্থ্য বিভাগ বারবার সতর্ক করে বলছে, খাবার পানি অবশ্যই ফুটিয়ে পান করতে হবে। এ ছাড়া প্রতিবার খাবারের আগে ও টয়লেট ব্যবহারের পর সাবান দিয়ে হাত ধোয়া, ডায়রিয়া শুরু হলে দ্রুত ওরস্যালাইন খাওয়া এবং প্রয়োজন হলে হাসপাতালে যাওয়া, শিশুদের পানিশূন্যতার লক্ষণ দেখা দিলে দেরি না করে চিকিৎসা নেওয়া, বন্যার পানি সরে যাওয়ার পর টিউবওয়েল ও পানির উৎস জীবাণুমুক্ত করা। এদিকে রোগীর সংখ্যা আরও বাড়লে জেলা হাসপাতালগুলোয় শয্যা, স্যালাইন ও প্রয়োজনীয় ওষুধের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ ক্ষেত্রে স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা সম্ভাব্য বড় আকারের জনস্বাস্থ্য সংকট এড়াতে আগাম প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা জোরদারের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন।
বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, দেশের বিভিন্ন এলাকায় বন্যার পানি ধীরে ধীরে নেমে যাওয়ার পরপরই ডেঙ্গুর সংক্রমণ বাড়তে পারে। তারা বলছেন, বন্যার সময় প্রবহমান পানিতে এডিস মশার প্রজনন তুলনামূলক কম হলেও পানি নেমে যাওয়ার পর ঘরবাড়ি, নির্মাণাধীন ভবন, টব, পরিত্যক্ত পাত্র, টায়ার ও বিভিন্ন জায়গায় জমে থাকা পরিষ্কার পানিতে এডিস মশা দ্রুত বংশবিস্তার করে। ফলে বন্যা-পরবর্তী দুই থেকে চার সপ্তাহকে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ সময় হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কীটতত্ত্ববিদ ড. কবিরুল বাশার রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, বন্যার কারণে মানুষের বাস্তুচ্যুতি, আশ্রয়কেন্দ্রে অতিরিক্ত জনসমাগম এবং নিয়মিত মশক নিধন কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ায় ডেঙ্গু সংক্রমণের ঝুঁকি আরও বেড়ে যায়। তিনি বলেন, এডিস মশা সাধারণত পরিষ্কার স্থির পানিতে ডিম পাড়ে। বন্যার পানি সরে যাওয়ার পর বাড়ির আঙিনা, ছাদ, ফুলের টব, ড্রাম, বালতি, ফ্রিজের ট্রে, এসির পানি জমার ট্রে এবং বিভিন্ন পরিত্যক্ত পাত্রে জমে থাকা পানিতে অল্প কয়েক দিনের মধ্যেই লার্ভা থেকে পূর্ণাঙ্গ মশা তৈরি হতে পারে। তাই বন্যা শেষে জমে থাকা পানি দ্রুত অপসারণ এবং সম্ভাব্য প্রজননস্থল ধ্বংস করা অত্যন্ত জরুরি। এর জন্য স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান ও সিটি করপোরেশনগুলোকে বন্যা-পরবর্তী সময়ে জরুরি ভিত্তিতে এডিস মশার প্রজননস্থল চিহ্নিত করে লার্ভিসাইড প্রয়োগ, নিয়মিত ফগিং এবং জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম জোরদার করতে হবে। একই সঙ্গে হাসপাতালগুলোতে ডেঙ্গু রোগী শনাক্তকরণ, পরীক্ষার সুবিধা এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সরঞ্জাম প্রস্তুত রাখার কথাও বলেন তিনি।
বিশেষজ্ঞরা আরও বলছেন, ডেঙ্গুর সংক্রমণ এমনিতেই ঊর্ধ্বমুখী রয়েছে, তাই বন্যা-পরবর্তী সময়ে সপ্তাহে অন্তত এক দিন বাসা ও আশপাশে জমে থাকা সব পানি ফেলে দিতে হবে, পানির ট্যাংক, ড্রাম ও সংরক্ষণ পাত্র ঢেকে রাখতে হবে, দিনের বেলায়ও মশারি ব্যবহার করুন, বিশেষ করে শিশু, বয়স্ক ও অসুস্থ ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে, জ্বর, মাথা ব্যথা, চোখের পেছনে ব্যথা, শরীর ব্যথা বা র্যাশ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার পাশাপাশি প্রয়োজন হলে ডেঙ্গু পরীক্ষা করার তাগিদ দিয়েছেন তারা।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন