আষাঢ়ের বৃষ্টি বাংলাদেশের মানুষের কাছে নতুন কিছু নয়। বর্ষা এ দেশের প্রকৃতির স্বাভাবিক ছন্দের অংশ। কিন্তু সেই স্বাভাবিক বর্ষণ যখন একটি রাজধানী শহরকে অচল করে দেয়, হাসপাতালের সেবা ব্যাহত করে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাঠদান ও পরীক্ষা স্থগিত করে, সচিবালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পর্যন্ত কোমরপানি মাড়িয়ে কর্মস্থলে যেতে বাধ্য করে, তখন সেটি আর কেবল প্রাকৃতিক ঘটনা থাকে না, সেটি হয়ে ওঠে নগর ব্যবস্থাপনার সক্ষমতার কঠিন পরীক্ষা।
সপ্তাহের প্রথম কর্মদিবসে রাজধানী ঢাকার যে চিত্র দেশবাসী দেখেছে, তা উদ্বেগজনক। রাজধানীর প্রধান সড়ক থেকে অলিগলি, সবখানেই জলাবদ্ধতা, ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানজট, গণপরিবহনের সংকট, ব্যবসা-বাণিজ্যে স্থবিরতা এবং সাধারণ মানুষের সীমাহীন দুর্ভোগ স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, প্রতিবছর একই সমস্যার পুনরাবৃত্তি আর কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। উন্নয়নশীল বাংলাদেশের রাজধানীর জন্য এটি মোটেই কাক্সিক্ষত বাস্তবতা নয়।
এই পরিস্থিতিতে সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকেও একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা এসেছে। প্রধানমন্ত্রী স্পষ্টভাবে বলেছেন, জলাবদ্ধতা মোকাবিলায় কোনো ধরনের গাফিলতি বরদাশত করা হবে না। এই নির্দেশনা কেবল একটি প্রশাসনিক বক্তব্য নয়, এটি সংশ্লিষ্ট সব সংস্থা, বিশেষ করে সিটি করপোরেশন, ওয়াসা, রাজউক, পানি উন্নয়ন বোর্ড এবং অন্যান্য দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানের জন্য একটি সুস্পষ্ট দায়িত্ববোধের আহ্বান। এখন প্রয়োজন এই নির্দেশনাকে মাঠপর্যায়ে কার্যকর কর্মপরিকল্পনায় রূপ দেওয়া।
আমরা মনে করি, এই সংকটকে কেবল তাৎক্ষণিক পানি নিষ্কাশনের মাধ্যমে সমাধান করা সম্ভব নয়। প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি ও সমন্বিত নগর পরিকল্পনা। রাজধানীর সব খাল ও প্রাকৃতিক জলাধারকে দখলমুক্ত ও পুনরুদ্ধার করতে হবে। ড্রেনেজ নেটওয়ার্ককে আধুনিক প্রযুক্তির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করে পুনর্গঠন করতে হবে। কোথায় কতটুকু পানি জমে, কোন এলাকায় পানি নিষ্কাশনের সক্ষমতা কত, কোথায় নতুন পাম্পিং স্টেশন প্রয়োজন, এসব বিষয়ে তথ্যভিত্তিক পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। একই সঙ্গে প্রতিটি সংস্থার দায়িত্ব নির্ধারণ করে নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে কাজ সম্পন্ন করার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে।
শুধু অবকাঠামো নয়, নাগরিক সচেতনতাও এই লড়াইয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। প্লাস্টিক ও কঠিন বর্জ্য যত্রতত্র ফেলে ড্রেন বন্ধ করে দেওয়ার প্রবণতা বন্ধ করতে হবে। এ ক্ষেত্রে কঠোর আইন প্রয়োগের পাশাপাশি সচেতনতামূলক কার্যক্রম আরও জোরদার করা প্রয়োজন। কারণ একটি পরিচ্ছন্ন ড্রেনেজ ব্যবস্থা রক্ষা করা সরকারের যেমন দায়িত্ব, তেমনি নাগরিকদেরও কর্তব্য।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো জবাবদিহি। বর্ষা শেষ হওয়ার পর নয়, বরং বর্ষাকাল চলাকালেই প্রতিটি সংস্থার কাজের মূল্যায়ন হওয়া উচিত। কোথায় অবহেলা হয়েছে, কোন প্রকল্প সময়মতো শেষ হয়নি, কোথায় দায়িত্বে গাফিলতি ছিলÑ এসব বিষয়ে নিরপেক্ষ তদন্ত এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। কারণ দুর্ভোগের দায় কেবল প্রকৃতির ওপর চাপিয়ে দিলে সমস্যার সমাধান হবে না।
আমরা বিশ্বাস করি, সরকার ইতোমধ্যে জলাবদ্ধতা নিরসনে বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করেছে এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোও মাঠে কাজ করছে। তবে বর্তমান বাস্তবতা বলছে, সেই উদ্যোগকে আরও কার্যকর, সমন্বিত ও ফলপ্রসূ করতে হবে। প্রধানমন্ত্রীর ‘জলাবদ্ধতা মোকাবিলায় কোনো গাফিলতি নয়’এই নির্দেশনা বাস্তবায়নের মধ্য দিয়েই নাগরিকরা আস্থা ফিরে পেতে চান। প্রশাসনের প্রতিটি স্তরে যদি এই বার্তা কঠোরভাবে অনূসৃত হয়, তাহলে রাজধানীর দীর্ঘদিনের এই দুর্ভোগ অনেকটাই লাঘব করা সম্ভব।
ঢাকা বাংলাদেশের মুখ। এই শহরের প্রতিটি কর্মদিবস দেশের অর্থনীতি, প্রশাসন ও নাগরিক জীবনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। তাই বর্ষার প্রতিটি ভারি বৃষ্টি যেন আর রাজধানীকে অচল করে না দেয়Ñ এটি এখন কেবল একটি নাগরিক প্রত্যাশা নয়, রাষ্ট্রীয় অগ্রাধিকারের বিষয়। পরিকল্পিত নগরায়ণ, কার্যকর ড্রেনেজ ব্যবস্থা, কঠোর তদারকি এবং জবাবদিহিনির্ভর প্রশাসনই পারে রাজধানীকে জলাবদ্ধতার অভিশাপ থেকে মুক্তির পথে এগিয়ে নিতে।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন